বিক্ষোভকারীদের যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, জবাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার ইরানি সেনাবাহিনীর

বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। ৬ জানুয়ারি ২০২৬, তেহরান গ্র্যান্ড বাজারছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে নতুন করে হুমকি দেওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনী জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সেনাবাহিনী বলেছে, তারা কৌশলগত অবকাঠামো ও জনসম্পত্তি সুরক্ষায় সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ‘শত্রুর ষড়যন্ত্র’ নস্যাতে ইরানের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছে সেনাবাহিনী।

আজ শনিবার ইরানের কয়েকটি আধা সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল ও কিছু ‘শত্রুভাবাপন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ দেশের জননিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে ঘিরে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। কিন্তু তা দ্রুত সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। বিক্ষোভ এরই মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে এটিই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। সরকার কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করছে। বিক্ষোভকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘাতে এরই মধ্যে ৬৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

বিবৃতিতে সেনাবাহিনী বলেছে, সর্বোচ্চ কমান্ডারের নির্দেশনায় সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী আঞ্চলিক পর্যায়ে শত্রুর তৎপরতা যৌথভাবে নজরে রাখার পাশাপাশি দেশের কৌশলগত অবকাঠামো, জনসম্পত্তি ও জাতীয় স্বার্থ দৃঢ়তার সঙ্গে রক্ষা করবে।

আজ শনিবার ইরানের অভিজাত ইসলামি বিপ্লবী গার্ডও (আইআরজিসি) আলাদা করে সতর্কবার্তা জারি করেছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, আইআরজিসি জানিয়েছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অর্জন ও দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করা তাদের কাছে ‘শেষ কথা’।

আইআরজিসি সেনাবাহিনীর বাইরে আলাদাভাবে পরিচালিত হয়।

ওয়াশিংটনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত

আজ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আবার ইরানের জনগণের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। প্রাণঘাতী উপায়ে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টার অংশ হিসেবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার পর রুবিও এ মন্তব্য করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক্সে এক পোস্টে রুবিও লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে।

রুবিওর পোস্টের কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে নতুন করে হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘গুলি চালানো শুরু না করাটাই আপনাদের জন্য মঙ্গলজনক। কারণ, আপনারা শুরু করলে আমরাও গুলি চালাব।’

ইরানের রাজধানী তেহরানে শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেন। ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প বলেন, পরিস্থিতি ইরানের নেতৃত্বের জন্য ‘বেশ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মনে হচ্ছে। শান্তিপ্রিয় বিক্ষোভকারীরা নিহত হলে সামরিক হামলার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, কিছু শহরে সাধারণ মানুষ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছেন, যা কয়েক সপ্তাহ আগে কল্পনাও করা যেত না।’

ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর দুর্বল অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। ৩ জানুয়ারি থেকে তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ থেকে ধর্মীয় শাসনের অবসানের দাবি উঠেছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটিতে পশ্চিমা সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

রাজধানী তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে আগের রাতের মতো গত শুক্রবার রাতভর সহিংসতা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, তেহরানের পশ্চিমের করাজ শহরে এক পৌরসভা ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ‘দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রেস টিভির খবরে শিরাজ, কুম ও হামেদান শহরে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার ফুটেজ সম্প্রচার করা হয়। ইরানের বাইর থেকে সম্প্রচারিত ফার্সি ভাষার কয়েকটি টেলিভিশনের ভিডিওতে পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ ও উত্তরাঞ্চলের তাবরিজ শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে নতুন করে বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা গেছে।

‘ট্রাম্পের হাতে ইরানিদের রক্ত’

গতকাল প্রেস টিভিতে সম্প্রচারিত এক বার্তায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, ট্রাম্পের হাতে এক হাজারের বেশি ইরানির ‘রক্তের দাগ লেগে আছে’। তিনি সম্ভবত গত জুনে ইরান-ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলার একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার কথা ইঙ্গিত করেছেন।

ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে খামেনি বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে নিজেরাই নিজেদের রাস্তা নষ্ট করছেন।’

খামেনি নাগরিকদের সতর্ক করে বলেন, ‘আপনারা বিদেশি শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করবেন না। বিদেশিদের সঙ্গে যোগসাজশ আমি সহ্য করব না। যদি আপনি বিদেশিদের সঙ্গে সহযোগিতাকারী এজেন্ট হন, তাহলে ইরানের জনগণ ও সরকার আপনাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করবে।’

ট্রাম্পের সমালোচনা করে খামেনি বলেন, তাঁর হাতে ইরানিদের রক্ত লেগে আছে। তা সত্ত্বেও তিনি দাবি করেন, তিনি ইরানের জনগণের পাশে আছেন। তিনি দায়িত্বজ্ঞানহীন। তিনি সাধারণ মানুষকে নিয়ে কিছু ভাবেন না।

খামেনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা তাঁর (ট্রাম্পের) কথা হয়তো বিশ্বাস করতে পারেন। শুধু তাঁকে খুশি করতেই তাঁরা ডাস্টবিন জ্বালাচ্ছেন।

জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ এ নেতা বলেন, সচেতন থাকুন এবং ঐক্য বজায় রাখুন। জাতি যেকোনো শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে।

খামেনি বলেন, আপনারা জানেন, লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে ইরানে বিপ্লব হয়েছে। তাই অন্তর্ঘাত সৃষ্টিকারীদের কাছে এটি কখনো হার মানবে না।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল লেবানন সফরে গিয়ে অভিযোগ করেন, ইরানের চলমান বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে। তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে বিভক্ত ও সহিংস দাঙ্গায় রূপান্তর করতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আরাগচির দাবিকে ‘ভ্রান্ত ধারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

‘নানাভাবে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা’

তেহরান থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক তৌহিদ আসাদি বলেন, রাজধানী তেহরানসহ অন্যান্য শহরে বিক্ষোভের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আসাদি বলেন, শুরুতে বিক্ষোভ এলোমেলো ছিল। কিন্তু বিশেষভাবে রাজধানীতে গত দুই-তিন দিনে বিক্ষোভ বাড়ছে। গত বৃহস্পতিবার তেহরানের অনেক রাস্তায় বিক্ষোভ ‘সহিংসতায় রূপ নেয়’ বলে জানান তিনি।

সাংবাদিক আসাদি জানান, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ‘নানাভাবে’ কাজ করছে। নিরাপত্তা কঠোর করার পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য নতুন ভর্তুকি প্রকল্প চালু করা হয়েছে।

ইরানে ২০২২-২০২৩ সালে সর্বশেষ বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। তখন পুলিশি হেফাজতে মাসা আমিনি নামের এক তরুণীর মৃত্যুকে ঘিরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। পোশাকের বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।