ইসরায়েলের বেপরোয়া আচরণে কি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তিচুক্তি ভেস্তে যাবে
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকে সই করলেও নির্ধারিত শান্তি আলোচনা শুরু হয়নি। পরবর্তী দিনক্ষণও জানায়নি দুই দেশ। শুরুতেই এমন ধাক্কায় আলোচনার ভবিষ্যৎ ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইসরায়েল।
সমঝোতা স্মারকের তোয়াক্কা না করে লেবাননে নৃশংসতা বাড়িয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। দেশটিতে এক দিনেই অন্তত ৪৭ জনকে হত্যা করেছে তারা। শুক্রবার হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও লেবাননে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
ইসরায়েল যে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সমঝোতা নস্যাৎ করতে চাইবে—এমন শঙ্কার কথা আগে থেকেই বলছিলেন বিশ্লেষকেরা। ইসরায়েলি সরকারের কট্টর ইহুদিবাদী নেতারা চান লেবাননে হামলা চলুক। আসন্ন অক্টোবরের নির্বাচনে সুবিধা নিতে একই চাওয়া প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুরও। এ কারণেই ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পরও হামলা থামাতে রাজি হচ্ছে না ইসরায়েল।
ইসরায়েলের এমন আচরণে অনিশ্চয়তায় পড়েছে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা। গত বুধবার দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অন্যতম শর্ত লেবাননে হামলা বন্ধ করবে ইসরায়েল। এরপরও শুক্রবার লেবাননে ব্যাপক ইসরায়েলি হামলা চলে। এর জবাবে হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরান বলেছে, এর পরিণতি ইসরায়েলকে ভোগ করতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, লেবাননে হামলা বন্ধ করার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
লেবাননে হামলা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে ইতিবাচক খবর হলো তেহরান–ওয়াশিংটন সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়ছে। সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান এএক্সএস মেরিনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার থেকে এই জলপথ দিয়ে ২৫টি জাহাজ চলাচল করেছে। ১৮ এপ্রিলের পর এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা। এদিনও জ্বালানি তেলের দাম পড়তির দিকে ছিল।
তবে ইসরায়েলের ওপরই ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বলে মনে করেন মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাইনা খালেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল যদি হামলা চালিয়ে যায়, ইরানের দৃষ্টিতে তা হবে সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন। এখন এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে কি না, তার ওপর।
আলোচনা কেন স্থগিত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বুধবার সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এরপর একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য শুক্রবার থেকে বার্গেনস্টক অবকাশযাপন কেন্দ্রে দুই দেশের প্রতিনিধিদের আলোচনায় বসার কথা ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবারই হোয়াইট হাউস জানিয়ে দেয়, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছেন না। এই ঘোষণার পর সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিবৃতি দিয়ে জানায়, শুক্রবার আলোচনা হচ্ছে না। তবে আলোচনার জন্য তারা প্রস্তুত থাকবে। আর ইরান আলোচনা স্থগিতের খবর জানায় শুক্রবার। তাদের ভাষ্য, কয়েক দিনের মধ্যে বৈঠকের পরিকল্পনা চলছে।
সমঝোতা স্মারক মতে, দুই দেশের আলোচনা হওয়ার কথা ৬০ দিনের মধ্যে। প্রথম দিনের আলোচনা বিলম্বিত হওয়ার পেছনের কারণ না জানালেও হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে বলেছে, আলোচনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ামাত্রই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন জেডি ভ্যান্স ও মার্কিন প্রতিনিধিরা। কিন্তু এমন আলোচনা আয়োজন করা সহজ বিষয় নয়। পরবর্তী পদক্ষেপ জানিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট একটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলার কারণেই ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা স্থগিত হয়েছে।
এক দিনে ৪৭ জনকে হত্যা
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ২ মার্চ থেকে লেবাননে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। তারপর ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি এবং পরে একাধিকবার লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি হয়েছে। তবে লেবাননে হামলা ও দখলদারি থামায়নি ইসরায়েল। তেহরান–ওয়াশিংটন সমঝোতার পরও ইসরায়েল জানায়, লেবাননে দখল করা অঞ্চলগুলো ছাড়বে না তারা, হামলাও চলবে।
ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থামাটা জরুরিও। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়েছে। ট্রাম্প চান নির্বাচনের আগে যুদ্ধ থামিয়ে জয় দাবি করে নিজের ভাবমূর্তি উন্নত করতে।
ইসরায়েলের সেই বক্তব্যের প্রতিফলনই শুক্রবার দেখা গেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত দেশটির দক্ষিণাঞ্চল ও বেকা উপত্যকায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৯৭ জন।
এদিন সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়েছে হারুফ এলাকায়। সেখানে তিন নারীসহ নয়জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আল–দুয়েইর এলাকায় ছয়জন, হাবুশে সাতজন, আরব সালিমে তিনজন ও তাল আবিয়াদে তিনজন নিহত হয়েছেন। আল–শারকিয়াহ, কফারসির, আল–কাতরানি, নাবাতিয়েহ, দেইর আল–জাহরানি, কফার রুম্মান, আল–আব্বাসিয়া এলাকায়ও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
এমন হামলার মধ্যে হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে নতুন করে যুদ্ধবিরতিতে যেতে রাজি হয়েছে বলে রয়টার্সকে জানান যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ৪৫ মিনিটের মধ্যে অন্তত ১২টি হামলা চালায় ইসরায়েল। যদিও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ওই যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে এদিন হিজবুল্লাহর সঙ্গে লড়াইয়ের সময় চার ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, লেবাননকে ‘জ্বালিয়ে দিতে’ হবে।
‘গণহত্যাকারী গোষ্ঠী মানুষের জন্য হুমকি’
লেবাননে শুক্রবারের হামলা এবং ইসরায়েলি মন্ত্রীদের হুমকির পর নতুন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইরানের নেতারা। লেবাননকে জ্বালিয়ে দেওয়া নিয়ে বেন-গভিরের হুমকির পর আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এই গণহত্যাকারী গোষ্ঠী মানবজাতির জন্য হুমকি।
আর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, ইসরায়েলের এই যুদ্ধবাজি ‘গুরুতর’ পরিণতি ডেকে আনবে।
তেহরান–ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতির পর সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইরান যে সাময়িক হামলা চালিয়েছিল, তার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল লেবাননে ইসরায়েলের হামলা। তবে এবার আগের মতো পরিস্থিতি দেখা দেবে না বলে মনে করেন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বারবারা স্লাভিন। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ট্রাম্পের প্রশাসন এমন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে যে তারা ইসরায়েলকে বলতে পারবে, “আমরা একসঙ্গে চেষ্টা করেছি, তবে সফল হইনি। এখন যে নৌকাটা ভাসছে, তা ডুবিয়ে দিয়ো না।”’
ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থামাটা জরুরিও। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়েছে। ট্রাম্প চান নির্বাচনের আগে যুদ্ধ থামিয়ে জয় দাবি করে নিজের ভাবমূর্তি উন্নত করতে। ইরানের নেতারাও নিজেদের বিজয়ী মনে করছেন। যেমন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে সমঝোতায় রাজি করানোকে নিজেদের বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘বিজয়ী ইরানি জাতি বিশ্বের শয়তানদের হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছে। তাদের আধিপত্য চূর্ণ করে দিয়েছে। এই মহাকাব্য ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।’