ইরান শেখাচ্ছে কীভাবে টিকে থেকেও জেতা যায়

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোজতবা খামেনিছবি: কোলাজ

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মিয়ার্শহাইমারের একটা কথা এখন অনেকেই ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে বলছেন। তাঁর কথায়, কোনো সামরিক সংঘর্ষে অধিকতর দুর্বল দেশ যদি অধিক শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে যায়, তাহলে তার জন্য সেটি হবে স্ট্র্যাটেজিক বা রণকৌশলগত বিজয়। চলতি উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরান তেমন জয়ই লাভ করতে চলেছে।

কথাটা ভেঙে বলা যাক।

যুদ্ধ বন্ধ প্রশ্নে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিড়াল-ইঁদুর খেলা শুরু হয়েছে। তবে এই খেলায় কে বিড়াল আর কে ইঁদুর, সেটা খুব পরিষ্কার নয়। ইরানের ওপর ভয়াবহ বিমান হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বললেন, ইরান শেষ, তাঁর জয় হয়েছে। সে কারণে তিনি একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করছেন। জবাবে ইরান বলল, ‘রোসো, তোমরা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও আমরা যুদ্ধ থামাচ্ছি না।’ তারা দুম করে হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে জাহাজ চলাচল আটকে দিল, বলল যেতে হলে তার অনুমতি ও কর প্রদান করে যেতে হবে।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প হরমুজ মুখ বরাবর সামরিক অবরোধ বসালেন; বললেন, কোনো ইরানি জাহাজ যেতে পারবে না। অন্য দেশের জাহাজ যাতে নিরাপদে যেতে পারে, সে জন্য তারা সামরিক পাহারা দেবে। ইরান বলল, তেমন চেষ্টা করলে মার্কিন রণতরির ওপর সে হামলা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পাহারা বসিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক করবে, তাতে তেলের দাম কমবে। কিন্তু ইরানি ধমকের পরও একটি-দুটি জাহাজে হামলার পর কেউ আর সে–মুখী হলো না। ফলে তেলের দাম আরও বেড়ে গেল, সঙ্গে ট্রাম্পের বিপদও।

জবাবে ইরান বলল, ‘রোসো, তোমরা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও আমরা যুদ্ধ থামাচ্ছি না।’ তারা দুম করে হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে জাহাজ চলাচল আটকে দিল, বলল যেতে হলে তার অনুমতি ও কর প্রদান করে যেতে হবে।

যুদ্ধ বনাম শান্তি

ইরান শান্তি আলোচনায় রাজি, কিন্তু তার নিজের শর্তে। হরমুজ সে খুলে দেবে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। দুই দিন পর যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আবার হামলা করবে না, তেমন নিশ্চয়তাও দিতে হবে। পারমাণবিক বোমা ইরান বানাবে না, কিন্তু শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার তাকে দিতে হবে।

ইরানকে পরাস্ত করা মানে ইরানের সরকারের পতন, সেখানে মার্কিন পছন্দের নতুন সরকার। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে সফল না হয়ে ট্রাম্প একদিকে শান্তির প্রস্তাব, অন্যদিকে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধ বন্ধে ইরানের কোনো তাড়া আছে বলে মনে হয় না, কিন্তু ট্রাম্পকে একটা সম্মানজনক পথে এই যুদ্ধ বন্ধ করতেই হবে। যত তেলের দাম বাড়ছে, নিজ দেশে তাঁর জনসমর্থন ততই কমছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন, সেখানেও পাগলা ঘণ্টা বেজে চলেছে।

আরও পড়ুন

ট্রাম্পের জন্য অন্য ঝামেলাও আছে। মে মাসের মাঝামাঝি তিনি বেইজিং যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট সি-র সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের জন্য। ইরানে যুদ্ধ না থামিয়ে এই শীর্ষ বৈঠক তাঁর জন্য সুখের হবে না। জুন মাসে বিশ্বকাপ, যুক্তরাষ্ট্র এবার অন্যতম আয়োজক দেশ। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম না কমলে দর্শকসমাগম না–ও হতে পারে, সে ভাবনাও ট্রাম্পকে মাথায় রাখতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অতি ক্ষুদ্র ও দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও ইরান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে, এটি হলো তার সর্বশেষ উদাহরণ। সেদিকে আঙুল তুলেই কিছুদিন আগে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মেৎ৴স বলেছিলেন, ইরানের হাতে যুক্তরাষ্ট্র অপদস্থ হচ্ছে।

ইরানে যুদ্ধ না থামিয়ে এই শীর্ষ বৈঠক তাঁর জন্য সুখের হবে না। জুন মাসে বিশ্বকাপ, যুক্তরাষ্ট্র এবার অন্যতম আয়োজক দেশ। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম না কমলে দর্শকসমাগম না–ও হতে পারে, সে ভাবনাও ট্রাম্পকে মাথায় রাখতে হচ্ছে।

ট্যাকটিক্যাল বনাম স্ট্র্যাটেজিক

প্রতিটি যুদ্ধেরই দুটি দিক বা লক্ষ্য থাকে—প্রথমটি তাৎক্ষণিক কৌশলগত (ট্যাকটিক্যাল) এবং দ্বিতীয়টি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত (স্ট্র্যাটেজিক)। তাৎক্ষণিক কৌশলগত যুদ্ধে ইরান যে হেরে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে সে দেশের প্রায় ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুর ওপর দেদার হামলা চালিয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত। একই অবস্থা সেনা নেতৃত্বের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ক্ষণে ক্ষণে ‘জিতে গেছি, জিতে গেছি’ বলে আওয়াজ দিচ্ছেন, তা এই ট্যাকটিক্যাল জয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলগত লক্ষ্য, সেখানে আটকে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিছুতেই ইরানকে হারানো যাচ্ছে না। এর বড় কারণ, মুখোমুখি সমরে পাল্লা না দিয়ে ইরান অসম বা এসেমিট্রিক যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। এই অসম যুদ্ধে ইরানের একমাত্র অস্ত্র হরমুজ প্রণালি। তার ওপর নিয়ন্ত্রণ সে ছাড়বে না। মার্কিন ভাষ্যকার জন আলটারম্যান তো আগাম বলেই দিয়েছেন, ইরান নিজের শক্তির প্রমাণ পেয়ে গেছে। যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ সে ছাড়বে না।

হরমুজ নিয়ে যে ওস্তাদি চালটি ইরান দিল এবং দিয়ে যাচ্ছে, তা দেখেই পণ্ডিতকুল বলছেন, দেখ, কীভাবে যুদ্ধে হেরেও শুধু টিকে থেকে জিতে যাচ্ছে ইরান।

আসলে এই অসম যুদ্ধে ইরানের টিকে থাকার প্রধান কারণ, কষ্ট সহ্য করার অপরিসীম ক্ষমতা। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর ইরাকের সঙ্গে একটানা আট বছর যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা তার আছে। সেই প্রথম থেকেই দেশটির ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তবু সে টিকে রয়েছে। শুধু টিকে নয়, সে যুক্তরাষ্ট্রকে শেখাচ্ছে একুশ শতকে এসে ড্রোনের মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা যায়।

হরমুজ নিয়ে যে ওস্তাদি চালটি ইরান দিল এবং দিয়ে যাচ্ছে, তা দেখেই পণ্ডিতকুল বলছেন, দেখ, কীভাবে যুদ্ধে হেরেও শুধু টিকে থেকে জিতে যাচ্ছে ইরান।

যেভাবে বদলে যাবে মধ্যপ্রাচ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চূড়ান্ত বিজয় থেকে বঞ্চিত করে ইরান ইতিমধ্যে এক নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, এমন কথা বলা বোধ হয় অযৌক্তিক নয়। এই অঞ্চলের সে সবচেয়ে বড় দেশ, সামরিক শক্তিতেও সবার সেরা। ইরানকে ঠেকাতে উপসাগরীয় দেশগুলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক আঁতাত করেছিল, কেউ কেউ ইসরায়েলের সঙ্গে উষ্ণ করমর্দনও করেছিল। কোনোটাতেই কাজ হলো না, বরং ইরানের পাল্টা হামলায় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

এই অবস্থায় অব্যাহত কোন্দলের পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সহাবস্থানের পথ বেছে নেওয়ার কথা ভাবছে। সৌদি ভাষ্যকার ও আশরাক আল-আসসোয়াতের সাবেক সম্পাদক আবদেল রহমান আল-রাশেদ বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ সবার জন্য, বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য খুবই ক্ষতিকর। চলতি যুদ্ধ থেকে সে প্রমাণ মিলেছে। সুতরাং যুদ্ধের পথে না গিয়ে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সহাবস্থান’ অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সৌদি আরব দুই বছর আগে থেকেই চীনের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে একধরনের দাঁতাতের পথ অনুসরণ করছে। ইরানের হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও তারা যে পাল্টা হামলা করেনি, সে–ও এই সহাবস্থানের ইঙ্গিত।

অন্য আরেকভাবে ইরান এই যুদ্ধে জয়ী হিসেবে পুরস্কৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের মুখে ইরান একাই দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, সারা বিশ্বে নিজের জন্য বিশেষ সাধুবাদ সে ছিনিয়ে এনেছে। আল-জাজিরায় এক মন্তব্য প্রতিবেদনে সুপরিচিত আরব ভাষ্যকার ফয়সল আল-কাসেম লিখেছেন, এই একলা লড়াইয়ের মাধ্যমে ইরান তার কঠোর সমালোচকদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।

তবে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় লাভ এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রভাব খর্ব করা। আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিকভাবে এত দিন যে পরিমাণ মুখাপেক্ষী হয়ে ছিল, যুদ্ধের পর সে অবস্থা বদলাবে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি, বরং তাদের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি থাকার কারণে ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। এই অবস্থায় নিজের সুরক্ষার তাগিদেই এসব দেশ এক যুক্তরাষ্ট্রের হাত ধরার বদলে চীন ও রাশিয়ার মতো আরও দু-একটি দেশের হাত ধরার চেষ্টা করবে। একে আমরা মাল্টি-এলাইনমেন্ট বা বহুপক্ষীয় জোট সম্পর্ক বলতে পারি। ইরান আগে থেকেই এসব দেশের সঙ্গে আঁতাতে রয়েছে, ফলে আখেরে লাভ তারই।

# ৭ মে ২০২৬, নিউইয়র্ক