রুবিওর বক্তব্যকে আড়াল করতে ইরানে হামলার পক্ষে ট্রাম্পসহ মার্কিন প্রশাসনের ‘হাস্যকর’ যুক্তি

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কো রুবিওফাইল ছবি: রয়টার্স

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন শুরুর একটি প্যাঁচানো যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েল ইরানে হামলার পরিকল্পনা করছিল। এর ফলে তেহরান ওই অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনায় হামলা করার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। তাই ওয়াশিংটনকে বাধ্য হয়েই ইরানে আগাম হামলা চালাতে হয়েছে।

গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার করা এসব দাবি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবু এসব খোঁড়া যুক্তি পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

রুবিওর এ বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এই আগ্রাসন ওয়াশিংটনের নয়; বরং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর স্বার্থ রক্ষা করছে।

ইসরায়েলের ওপর ওয়াশিংটনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ, ১৯৪৮ সাল থেকে তারা ইসরায়েলকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের চলমান জাতিগত নিধনের সময় দেওয়া ২ হাজার ১০০ কোটি ডলারও অন্তর্ভুক্ত।

গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওর বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিন্ন সুর ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ শুরু করেছি। কারণ, আমরা ভেবেছিলাম, আমাদের ওপর হামলা হতে যাচ্ছে।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তারা (ইরান) ইসরায়েলে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তারা অন্যদের ওপরও হামলা করতে যাচ্ছিল।’

গত শনিবার প্রথম আগ্রাসনের পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তি দিয়ে আসছেন, ইরানের সামগ্রিক হুমকিই এই যৌথ হামলার যৌক্তিকতা প্রমাণ করে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থান সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইন—উভয়েরই পরিপন্থী। ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন স্থাপনায় ইরানের পরিকল্পিত হামলার বা পরমাণু ও ব্যালিস্টিক কর্মসূচি থেকে তাৎক্ষণিক কোনো হুমকির খুব সামান্যই প্রমাণ দিতে পেরেছে।

সোমবার রুবিও নিজেও তাঁর বক্তব্য থেকে সরে আসার চেষ্টা করেন। তিনি এবার দাবি করেন, তাঁর কথাগুলো প্রসঙ্গের বাইরে নেওয়া হয়েছে।

এর আগের মন্তব্যে রুবিও ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন সক্ষমতাসহ বড় ধরনের হুমকির কথা উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি মূল প্রশ্নে ফিরে আসেন, ‘এখনই কেন এই হামলা?’

রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা জানতাম, ইসরায়েল একটি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। আমরা জানতাম, এর ফলে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা হবে। আমরা জানতাম, তারা (ইরান) হামলা করার আগেই যদি আমরা হামলা না করি, তবে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে।’

বিস্ময়কর স্বীকারোক্তি

মঙ্গলবার প্রশাসনের বারবার অবস্থান পরিবর্তন ট্রাম্পের সমালোচক বা সমর্থকদের ক্ষোভ কমাতে পারেনি। এমনকি ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (এমএজিএ) শিবিরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এর নিন্দা জানিয়েছেন।

স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো কেলি গ্রিকো আল-জাজিরাকে বলেন, তিনি মূলত জনসমক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলিদের ফাঁদে পড়েছে।

গ্রিকো আরও বলেন, ‘ধারণাটি এমন যে ইসরায়েলিরা এটা করতই, তাই আমাদেরও করতে হয়েছে। যদি তা–ই হয়, তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ কোথায় এক আর কোথায় আলাদা, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আছে।’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় একটি যুদ্ধে টেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে অস্ত্র ও অর্থ দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হয় কীভাবে?’

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আতঙ্কিত হয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি। ইরানের রাজধানী তেহরান, ২ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

আগের এক পোস্টে কেনেথ রথ বলেছিলেন, রুবিওর যুক্তি যুদ্ধ শুরুর জন্য কোনো ‘আইনি ভিত্তি’ হিসেবে ধর্তব্য নয়।

কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) সোমবার রুবিওর বক্তব্যকে একটি ‘বিস্ময়কর স্বীকারোক্তি’ বলে উল্লেখ করেছে।

এক বিবৃতিতে সিএআইআর বলেছে, রুবিও তা-ই ফাঁস করেছেন, যা শুরু থেকেই পরিষ্কার ছিল—‘ইরান আমাদের জাতির জন্য কোনো আসন্ন হুমকি ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেনি। আমরা ইসরায়েলের চাপে তাদের সুবিধার জন্যই হামলা করেছি।’
সংস্থাটি ট্রাম্পের যুদ্ধ করার ক্ষমতা খর্ব করতে কংগ্রেসকে ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুউশন’ বা যুদ্ধের ক্ষমতাসংক্রান্ত প্রস্তাব পাসের আহ্বান জানিয়েছে।

আসন্ন যুদ্ধক্ষমতা ভোট

আইনপ্রণেতারা চলতি সপ্তাহে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় জায়গাতেই এ–সংক্রান্ত প্রস্তাব উত্থাপনের অঙ্গীকার করেছেন। তবে রিপাবলিকান সদস্যদের বিরোধিতার মুখে এটি পাস হওয়া কঠিন হবে।

কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই ট্রাম্পের দলের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। বেশির ভাগ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন এবং প্রশাসনের দেওয়া কারণগুলোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্টের ভেটো (বাতিল করার ক্ষমতা) অগ্রাহ্য করতে এই প্রস্তাব পাসের জন্য উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে। তবে সমর্থকেরা মনে করেন, এটি আইনপ্রণেতাদের নিজেদের অবস্থান রেকর্ড করার সুযোগ করে দেবে।

গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে প্রগতিশীল মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্প প্রশাসনের এই আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি ছাড়াও অনেক আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

স্যান্ডার্স বলেন, ‘নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চেয়েছিলেন। ট্রাম্প তাঁকে সেটিই দিলেন।’

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধবাজ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুই দশকের বেশি সময় ধরে ইরানের সরকার পতনের ডাক দিচ্ছেন এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার কড়া বিরোধী। এই দীর্ঘ সময়ে নেতানিয়াহু বারবার দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

স্যান্ডার্স লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতি মার্কিন নাগরিকদের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। চরম উগ্র ডানপন্থী নেতানিয়াহু সরকারের মাধ্যমে নয়।’

প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেওয়া রিপাবলিকান প্রতিনিধি টমাস ম্যাসি পররাস্ট্রমন্ত্রী রুবিওর বক্তব্যকে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকা প্রথম) প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ম্যাসি এক্সে লিখেছেন, ‘এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে গ্যাস, মুদিপণ্য এবং প্রায় সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র জয়ী পক্ষ হলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারহোল্ডাররা।’

‘তাঁর বলা সবচেয়ে খারাপ কথা’

ট্রাম্পের এমএজিএ শিবিরের বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বলেছেন, রুবিওর বক্তব্য ইরানে হামলা নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে আরও উসকে দিচ্ছে।

‘ডেইলি ওয়ায়ার’-এর পডকাস্টার ম্যাট ওয়ালশ বলেন, ‘রুবিও সরাসরি আমাদের বলছেন, আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে আছি। কারণ, ইসরায়েল আমাদের বাধ্য করেছে। এটি মূলত তাঁর বলা সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ কথা।’

প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন যখন রুবিওর দাবি পুনরাবৃত্তি করেন, তখন তার জবাবে সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও ট্রাম্পের অ্যাটর্নি জেনারেল মনোনীত ম্যাট গেটজ বলেন, ‘এ সত্য কথাগুলো বলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে একজন আজ্ঞাবহ দাসের মতো দেখাচ্ছে।’

ট্রাম্পপন্থী দুই ভাই কিথ হজ ও কেভিন হজ মার্কিন প্রশাসনের এ পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছেন। এক্সে এই দুই ভাইয়ের ৩৫ লাখ অনুসারী রয়েছে।

এই দুই ভাই মঙ্গলবার পোস্ট করেছেন, ‘ইসরায়েলের জন্য যুদ্ধ করে মার্কিন নাগরিকদের মরতে পাঠানোর জন্য ট্রাম্পকে আমরা ভোট দেইনি। আমরা এ নিয়ে চুপ থাকব না।’