ইসরায়েলের নির্বাচনে হারছে নেতানিয়াহুর জোট

ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। মঙ্গলবার তেল আবিবেছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট। দেশটির প্রধান তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলের বুথফেরত জরিপে (এক্সিট পোল) দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর জোট স্পষ্ট পরাজয়ের মুখে পড়েছে এবং তারা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই এসব জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, যদিও দল হিসেবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হতে চলেছে, কিন্তু তাদের জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন থেকে দূরে রয়েছে। ফলে নেতানিয়াহু ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হতে চলেছে।

ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘কান’ এবং বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ‘চ্যানেল ১২’ ও ‘চ্যানেল ১৩’-এর বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্টে (নেসেট) নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও কট্টর ধর্মীয় দলগুলোর জোট পেতে পারে ৫০টি আসন। পার্লামেন্টে তাদের আসন ছিল ৬৮টি।

তেল আবিবে ইয়াশার পার্টির প্রধান কার্যালয়ে বুথফেরত জরিপের ফলাফল দেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন দলের নেতা আইজেনকোটের সমর্থকেরা
ছবি: রয়টার্স

অপরদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ও ইহুদিবাদী বিরোধী জোট পেতে যাচ্ছে ৫২ থেকে ৫৩টি আসন (কান ও চ্যানেল ১৩-এর মতে ৫৩টি, চ্যানেল ১২-এর মতে ৫২টি)।

এছাড়া আরব দলগুলোর মোর্চা জয়েন্ট লিস্ট ও আরবদের আরেক দল ‘রা'আম’ মিলে পেতে চলেছে ১৭ থেকে ১৮টি আসন।

বুথফেরত জরিপের তথ্য আসার পর বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘কাউকে আপনাদের বিভ্রান্ত করতে দেবেন না: নেতানিয়াহুর ব্লক বিপর্যয়কর পরাজয় বরণ করেছে। পুরোপুরি ধস নেমেছে এবং জনগণ তাদেরকে ঘরে যেতে বলেছে।’

বুথফেরত জরিপ বলছে, নির্বাচনে একক দল হিসেবে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৪ থেকে ২৫টি আসন পেতে পারে। এর মধ্য দিয়ে দলটি গত কয়েক মাস ও সপ্তাহের সেই জরিপগুলোকে ভুল প্রমাণ করল, যেখানে লিকুদ পার্টি আইজেনকোটের দলের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। অন্যদিকে আইজেনকোটের মধ্যপন্থী দল ‘ইয়াশার’ পেতে পারে ২১ থেকে ২৩টি আসন (কান-এর মতে ২১, চ্যানেল ১২-এর মতে ২২ এবং চ্যানেল ১৩-এর মতে ২৩টি)। তবে লিকুদ এককভাবে জিতলেও সার্বিক জোটের সমীকরণে আইজেনকোটের শিবিরের কাছে পিছিয়ে পড়েছে নেতানিয়াহুর বলয়।

ভোট দেওয়ার পর ক্যামেরাবন্দী হন বিরোধী শিবিরের প্রধান নেতা গাদি আইজেনকোট
ছবি: এএফপি

রেকর্ড গড়ার পথে আরব দলগুলো

নেতানিয়াহুর জোটকে আটকে দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলো। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আরব দলগুলো অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ১৭ থেকে ১৮টি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে। এর মধ্যে শুধু আরবদের বিভিন্ন দলের মোর্চা ‘জয়েন্ট লিস্ট’ পেতে পারে ১০ থেকে ১১টি আসন। এছাড়া ইসলামপন্থী দল ‘রা'আম’ পেতে পারে ৭টি আসন।

আরব দলগুলো নেতানিয়াহুর কট্টর বিরোধী হলেও তারা ইহুদিবাদী বিরোধী জোটের আনুষ্ঠানিক অংশ নয় এবং সাধারণত তারা সরকারেও যোগ দেয় না। তবে কোনো জোটে না থেকেও তাদের এই রেকর্ডসংখ্যক আসন নেতানিয়াহুর ফেরার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বুথফেরত জরিপে বিরোধী জোট এগিয়ে থাকার আভাস পেয়ে তেল আবিবে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করছেন আইজেনকোটের সমর্থকেরা
ছবি: রয়টার্স

অন্যান্য দলগুলোর কে কত আসন পেতে যাচ্ছে

বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, নির্বাচনে আসন পাওয়ার দিক দিয়ে তৃতীয় স্থানে থাকতে পারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের দল ‘বি'য়াচাদ’। তারা ১২ থেকে ১৪টি আসন (কান ও চ্যানেল ১৩-এর মতে ১৪টি, চ্যানেল ১২-এর মতে ১২টি) পেতে পারে।

জরিপের আভাস অনুযায়ী, অন্যান্য দলের মধ্যে বামপন্থী দল ডেমোক্র্যাটস ১০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে আভিগডর লিবারম্যানের দল ইসরায়েল বেইতেইনু পেতে পারে ৮টি আসন। এছাড়া উগ্র ডানপন্থী দল ওতজমা ইয়েহুদিত ৭টি আসনে জয়ী হতে পারে। আর কট্টর রক্ষণশীল ধর্মীয় দল শাস ও ইউনাইটেড টোরাহ জুদাইজম এবং বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম—এই তিনটি দলের প্রতিটি ৬টি করে আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মাইকে কথা বলছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ছবি: এএফপি

কয়েক মাস ধরে নির্বাচনের ন্যূনতম ভোটের কাছাকাছি থাকা দুটি ছোট দল পার্লামেন্টে ঢুকতে পারছে না। এগুলো হলো—ইয়োয়াজ হেনডেলের জোটনিরপেক্ষ দল ‘রিজার্ভিস্ট-ইকোনমিক পার্টি’ এবং ওফার উইন্টারের ডানপন্থী ‘পিপল অব ইসরায়েল’। উভয় দলই নেসেটে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ৩.২৫ শতাংশ ভোট পেতে ব্যর্থ হবে বলে তিনটি জরিপেই আভাস দেওয়া হয়েছে।

সরকার গঠন নাকি ফের নির্বাচন?

স্পষ্ট কোনো একক বিজয়ী না থাকার এই বিষয়টি অবশ্য আগে থেকেই অনুমিত ছিল। এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট—উভয় নেতাই নিজেদের বিজয়ী দাবি করে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ চাইতে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের শরণাপন্ন হতে পারেন। নেতানিয়াহু দাবি করবেন তিনি একক বৃহত্তম দলের নেতা, আর আইজেনকোট দাবি করবেন তাঁর জোট সবচেয়ে বড়।

বড় পর্দায় আইজেনকোটের ছবির সামনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা নাড়িয়ে সমর্থন জানাচ্ছেন ইয়াশার পার্টির কর্মী-সমর্থকেরা
ছবি: রয়টার্স

সবচেয়ে বড় দল হওয়ায় নেতানিয়াহু হয়তো প্রথম সুযোগ পেতে পারেন। ফলে আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে দলগুলোর মধ্যে জোট গড়ার তীব্র দর-কষাকষি দেখা যাবে। তবে কোনো পক্ষই যদি শেষ পর্যন্ত ৬১টি আসনের সমর্থন জোগাড় করতে না পারে, তবে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ইসরায়েলিদের আবারও ভোটকেন্দ্রে ফিরতে হবে। আর এমনটি ঘটলে তা ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের সেই রাজনৈতিক সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, যখন দেশটিতে পাঁচবার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নতুন সরকার না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

এদিকে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট গণনা শুরু করেছে। তারা সারা রাত ধরেই সরকারি হিসাব জানাবে। বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাসের সঙ্গে প্রকৃত ফলাফলে অনেক সময়ই কিছু পার্থক্য থাকে। নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাতভর প্রতি ৩০ মিনিট পরপর এই বুথফেরত জরিপের তথ্য হালনাগাদ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।