‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হামাসের নেতাদের সঙ্গেই বৈঠক করলেন ট্রাম্প জামাতা কুশনার

মিসরের আলামেইন শহরে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির (মাঝে) সঙ্গে বৈঠক করেন জ্যারেড কুশনার (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)
ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার জন্য প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে হামাসের নেতাদের সঙ্গে মিসরে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক তাঁর দূত জ্যারেড কুশনার। ইসরায়েল অবশ্য ট্রাম্পের ঘোষিত ওই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে।

গতকাল রোববার আল-জাজিরাকে বৈঠকের বিষয়টি জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি একটি সূত্র। তিনি বলেন, বৈঠকে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতারা গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো কুশনারকে জানিয়েছেন। এ সময় কুশনার বলেছেন, গাজার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না।

ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা কমাতেই কুশনার ইসরায়েল ও মিসর সফর করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের এ পরিকল্পনাকে ইসরায়েলের জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরেক কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে বলেন, মিসরের আলামেইন শহরে হামাস ও কুশনারের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সেগুলো কীভাবে যাচাই করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

ওই কর্মকর্তা বলেন, পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজায় যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা, এ উপত্যকা পরিচালনার সব দায়িত্ব গাজার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর শুরু করা এবং ভবিষ্যতে গাজা প্রশাসনে হামাসের কোনো ভূমিকা না রাখা।

ওই সূত্র বলেছে, হামাসকে গাজার শাসনক্ষমতা এবং সব অস্ত্র ও সামরিক অবকাঠামো ছেড়ে দিতে হবে। গাজা আর কখনো ইসরায়েলের জন্য ‘সন্ত্রাসের’ উৎস হবে না।

বৈঠকে হামাসের রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হায়াও উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, বৈঠকে মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদ, কাতারের কূটনীতিক আলি আল-থাওয়াদি ও তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও ছিলেন।

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গঠিত শান্তি পর্ষদের (পিস বোর্ড) দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এবং পর্ষদের সদস্য সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও কুশনারের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেন।

ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা কমাতেই কুশনার ইসরায়েল ও মিসর সফর করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের এ পরিকল্পনাকে ইসরায়েলের জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।

ইসরায়েলকে গাজা পরিকল্পনা মানতে বাধ্য করার আহ্বান

গতকাল এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, বৈঠকে ট্রাম্পের পরিকল্পনা গ্রহণ করার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে তারা। গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী ও এর নিশ্চয়তাদাতা দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে এ কথা জানানো হয়েছে।

হামাস বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপের শর্তগুলো পুরোপুরি মেনে চলেছে। তবে ইসরায়েল এ ধাপ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বরং স্থল অভিযান বাড়িয়ে মানবিক সংকট আরও গভীর করেছে এবং প্রকাশ্যে পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হামাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলেছে। ওয়াশিংটন হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তবে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধের আশায় ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে হামাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।

হামাস মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো ও শান্তি পর্ষদের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে প্রথম ধাপের সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য করা, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধ করা, হত্যাকাণ্ড ও সামরিক অভিযান থামানো এবং ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে সম্মত হয়ে তা বাস্তবায়নের সময়সূচি তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হামাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চলেছে। ওয়াশিংটন হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবেও তালিকাভুক্ত করে রেখেছে। তবে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধের আশায় ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে হামাসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, হামাস নেতা খলিল আল-হায়া গতকাল মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন।

হামাসের সঙ্গে বৈঠকের পর মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন কুশনার।

মিসরের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় বলেছে, ওই বৈঠকে গাজা ছাড়াও দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আল-সিসি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন ও অভিন্ন স্বার্থের বিভিন্ন বিষয়ে চলমান সহযোগিতার প্রশংসা করেন। কুশনারও মিসরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের প্রশংসা করে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সিসির ভূমিকায় কৃতজ্ঞতা জানান।

গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত

ইসরায়েল গাজা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করায় গতকাল এর নিন্দা জানিয়েছেন মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তাঁরা ইসরায়েলের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রচেষ্টা ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

ইসরায়েল ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ বন্ধ করে দিলে এর পুরো দায় দেশটিকেই নিতে হবে বলে সতর্ক করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে পরিকল্পনাটি মেনে চলতে বাধ্য করতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানই দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারে। শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেকোনো ধরনের বাধা দ্রুত মোকাবিলার জন্য শান্তি পর্ষদের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আজ সোমবার কুশনার ও শান্তি পর্ষদের দূত ম্লাদেনভের নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। গাজায় হামাস যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড বন্ধে ওয়াশিংটনের দাবি তোলা নিয়ে ইসরায়েল উদ্বিগ্ন বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

গত মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ বন্ধে ওই পরিকল্পনা একটি বড় অগ্রগতি। তাঁর দাবি, ইসরায়েল ও হামাস উভয়েই এতে সম্মত হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে গাজায় হামলা কিছুটা কমিয়ে আনার পর গত কয়েক দিনে আবারও বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

পরিকল্পনায় গাজায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলি সেনারা গাজা থেকে সরে যাওয়ার পাশাপাশি হামাস অস্ত্র ত্যাগ করবে এবং পরে নতুন একটি বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীন গাজা পুনর্গঠন করা হবে—এমন কথা রয়েছে এটিতে।

হামাস বলেছে, যুদ্ধ আবার শুরু হওয়া ঠেকাতে তারা পরিকল্পনাটিতে সম্মত হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি টেকসই করতে হলে আগে ইসরায়েলকে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামলা বন্ধ করা।

আরও পড়ুন

চলতি মাসের শুরুতে গাজায় হামলা কিছুটা কমিয়ে আনার পর গত কয়েক দিনে আবারও বিমান হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

গতকাল খান ইউনিসে একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরের একটি আবাসিক ভবনেও বিমান হামলা হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৩ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে।

আরও পড়ুন