কোনো চুক্তি ছাড়াই কি আসলে ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চান ট্রাম্প
ট্রাম্প বললেন, শিগগিরই ইরান ছাড়বে যুক্তরাষ্ট্র
কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের আরও হামলা, কাতারের উপকূলে তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত
তেহরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা দেখছেন রুবিও
ইরান সংকট নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে। ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে, তেহরানের নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং কোনো চুক্তি ছাড়াই এই সংঘাত কমিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা এসব মন্তব্য তাদের পরিবর্তনশীল এবং কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী বক্তব্যেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমানে পঞ্চম সপ্তাহে চলা এই যুদ্ধ কীভাবে এবং কখন শেষ হতে পারে, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলছে।
গতকাল মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা শিগগিরই চলে যাব।’ তিনি বলেন, এই প্রস্থান ‘দুই সপ্তাহের মধ্যে, হতে পারে দুই সপ্তাহ বা তিন সপ্তাহের মধ্যে।’
যুক্তরাষ্ট্র যাকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বলছে, তা শেষ করতে সফল কূটনীতি কোনো পূর্বশর্ত কি না, এমন প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘তা নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানকে কোনো চুক্তি করতে হবে না। না, আমার সঙ্গে তাদের চুক্তি করার প্রয়োজন নেই।’
এর আগে ওয়াশিংটন হুমকি দিয়েছিল, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির ১৫ দফা শর্ত মেনে না নিলে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। ওই সব শর্তের মধ্যে ছিল—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে হবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প স্থানীয় সময় আজ বুধবার রাত ৯টায় (বাংলাদেশ সময় আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা) ‘ইরান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হালনাগাদ তথ্য’ জানাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ফক্স নিউজের ‘হানিটি’ প্রোগ্রামে বলেছেন, কোনো এক সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন এই যুদ্ধের ‘শেষ সীমা’ দেখতে পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘এটি আজ নয়, কালও নয়, তবে এটি আসছে।’
কাতারের উপকূলে ট্যাংকারে আঘাত, বাহরাইন ও কুয়েতে আগুন
এত সব আলোচনার মধ্যেও আজ ভোরে পাল্টাপাল্টি হামলার খবর পাওয়া গেছে। কুয়েতের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোনের আঘাতে তেলের ট্যাংকে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। বাহরাইন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানের হামলায় তাদের একটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় আগুন লেগেছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, কাতারের রাজধানী দোহার কাছে অজানা বস্তুর আঘাতে একটি তেলবাহী জাহাজের তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্রুদের সবাই নিরাপদ আছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আজ ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর তেহরানের বেশ কিছু এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করা ছিল।
ইরানের বন্দর আব্বাসের বৃহত্তম প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ‘শহীদ হাক্কানি বন্দর’ রাতে বিমান হামলার শিকার হয়েছে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন ডেপুটি গভর্নর আহমাদ নাফিসি। তিনি একে বেসামরিক স্থাপনার ওপর ‘অপরাধমূলক’ হামলা বলে উল্লেখ করেছেন।
মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলো বারবার ইরানের হামলার শিকার হচ্ছে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি ইরান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। একে তারা দর–কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে উদ্বেগ বাড়ছে।
আজ এশিয়ায় লেনদেন শুরু হলে তেলের বাজার শান্ত থাকলেও শেয়ার ও বন্ড বাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে। ট্রাম্পের মন্তব্যের পর জাপানের বাইরে এশিয়া-প্যাসিফিক শেয়ার সূচক ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জাপানের নিক্কেই ৩ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। গতকাল ওয়াল স্ট্রিটেও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ২ দশমিক ৯ বেড়েছে।
মার্কিন বার্তাগুলো কোনো আলোচনা নয়: ইরান
তেল ও জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মার্কিন নাগরিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি ট্রাম্প এবং তাঁর রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন বিশ্বাস করে, ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য অর্জিত না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের উচিত দ্রুত ইরানের যুদ্ধ থেকে সরে আসা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বলপ্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাহায্য করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমিরাত এই পদক্ষেপের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব চাইছে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু কৌশলগত দ্বীপ দখলের পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার কথা বললেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তিনি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের কাছ থেকে সরাসরি বার্তা পাচ্ছেন, তবে সেগুলো কোনো ‘আলোচনা’ নয়। কাতারভিত্তিক আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, বন্ধুদের মাধ্যমে আসা এসব বার্তায় মূলত হুমকি বা দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করা হচ্ছে।
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গতকাল ওই অঞ্চলের মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর নতুন হামলার হুমকি দিয়েছে। তারা মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যাপল, ইনটেল, আইবিএম, টেসলা ও বোয়িংয়ের মতো ১৮টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়েছে, যারা তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে। কোম্পানিগুলোর প্রতি এই হুমকির বিষয়ে ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ নিয়ে তিনি চিন্তিত নন।
ট্রাম্প গতকাল যুক্তরাজ্যসহ সেই সব ন্যাটো সদস্যদেশের সমালোচনা করেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে সহায়তা করেনি। রুবিও বলেন, ‘ন্যাটো এখন একমুখী রাস্তা হয়ে গেছে।’
রুবিও বলেন, ইউরোপ চায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করুক, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দরকারে তারা এগিয়ে আসছে না। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যুদ্ধ শেষ হলে এই সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।
যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আজ জানিয়েছে, তারা যুদ্ধের শুরু থেকে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আট শতাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। তারা দাবি করেছে, ইয়েমেন থেকে ইসরায়েলের দিকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল, যা তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রতিহত করেছে।
ইয়েমেনের ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতি বিদ্রোহীরাও সম্প্রতি এই আঞ্চলিক যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। এ ছাড়া এই যুদ্ধ ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত লেবানিজ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে পুরোনো সংঘাতকে আবার চাঙা করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈরুত এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় আজ অন্তত ৭ জন নিহত এবং ২৪ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে, তারা হিজবুল্লাহর দুই শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। তবে তাঁরা নিহত হয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করেনি। এই হামলার বিষয়ে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।