লেবাননেও যুদ্ধবিরতি, চুক্তির আশা বাড়ছে ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত একটি ভবনছবি: এএফপি

এবার লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশ সময় আজ শুক্রবার ভোররাত তিনটা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সরাসরি আলোচনায় বসার বিষয়ে অগ্রগতি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের আশাবাদ আরও বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনায় বসার অন্যতম শর্ত ছিল চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করা; কিন্তু ইসরায়েল তা নাকচ করে লেবাননে উল্টো হামলার তীব্রতা বাড়ালে যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।এদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। তবে দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। ইসলামাবাদেই এই বৈঠক হতে যাচ্ছে, এটা প্রায় নিশ্চিত।

গত সপ্তাহে ইসলামাবাদেই অনুষ্ঠিত প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। তারপরও যুদ্ধ আবার শুরু হওয়া ঠেকাতে নতুনভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো।

ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় ভোটাভুটির আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করায় অসন্তুষ্ট হন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। পরে আর মন্ত্রিসভায় এ নিয়ে ভোটাভুটি হয়নি। এ ছাড়া যুদ্ধবিরতি হলেও দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে না বলে দেশটির নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে।

লেবাননে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা

মূলত লেবাননে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ‘আমি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে চমৎকার আলোচনা করেছি। তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিকেল ৫টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সম্মত হয়েছেন।’

এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ‘স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচেষ্টার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান লেবাননের প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামও; আর ইসরায়েল হামলা বন্ধ করলে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার ঘোষণা দিয়েছেন লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম মুসাবি।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ১৯৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হন ৭ হাজার ১৮৫ জন।

এদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভায় ভোটাভুটির আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করায় অসন্তুষ্ট হন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। পরে আর মন্ত্রিসভায় এ নিয়ে ভোটাভুটি হয়নি। এ ছাড়া যুদ্ধবিরতি হলেও দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে না বলে দেশটির নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে।

গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির আওতায় ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা বন্ধ রেখেছে; কিন্তু লেবাননে হামলা চালিয়ে আসছিল ইসরায়েলি বাহিনী। সব কটি সেতু ধ্বংস করে দিয়ে তারা লিটানি নদীর দক্ষিণ অংশকে লেবানন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ১৯৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হন ৭ হাজার ১৮৫ জন।

যুদ্ধ বন্ধের আশা

লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণায় যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তির আশা বেড়েছে। গতকাল হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন না–ও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের বলতে পারি, আমরা বেশ ভালো করছি। আমি নিশ্চিত নই যে এর মেয়াদ বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন আছে কি না।’ যদিও তিনি একই সঙ্গে হুমকি দিয়েছেন, দুই পক্ষ কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে, তবে আবার যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আবার আলোচনায় বসানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত বুধবার তেহরানে পৌঁছান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। গতকাল তিনি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেন।

ইরানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, এ সফরের ফলে দ্বিতীয় দফার আলোচনা এবং দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির আশা বেড়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো মৌলিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল জানিয়েছে, উভয় পক্ষই আবার আলোচনায় বসতে ইচ্ছুক। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। যদিও আজ শুক্রবারের মধ্যে বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। বৈঠকের স্থান ইসলামাবাদই থাকছে বলে বুধবার জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।

চলমান কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের অংশ হিসেবে সৌদি আরব সফর শেষে গতকাল কাতার পৌঁছেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এরপর তাঁর তুরস্কে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

পাল্টাপাল্টি হুমকি অব্যাহত

পেন্টাগনের এক যৌথ ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরান যদি কোনো চুক্তিতে সম্মত না হয়, তবে মার্কিন বাহিনী যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ, ইরানের আর কোনো নৌবাহিনী নেই।

পাল্টা হুমকি দিয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসিন রেজাই বলেছেন, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ‘পুলিশের’ ভূমিকা পালন করতে চায়, তবে সেখানে মার্কিন জাহাজগুলো ডুবিয়ে দেওয়া হবে।