ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’ নিয়ে ইসরায়েল কেন এত ক্ষুব্ধ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুছবি: এএফপি ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন তাঁর উদ্যোগে গঠিত ‘শান্তি পর্ষদ’ (বোর্ড অব পিস) নিয়ে দাভোস অর্থনৈতিক ফোরামে বেশ মাতামাতি হোক। তবে ট্রাম্পের নতুন এ কূটনৈতিক উদ্যোগে ইসরায়েল রীতিমতো বিরক্ত। একে কার্যত গাজার আন্তর্জাতিকীকরণ হিসেবে দেখছে দেশটি। কারণ, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী এ পর্ষদ ফিলিস্তিনে গাজার অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থা তদারক করবে।

ট্রাম্প আগামীকাল বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় দাভোস ফোরামে নবগঠিত ‘শান্তি পর্ষদ’ উন্মোচনের পরিকল্পনা করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মতো ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এ পর্ষদে আছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের মার্ক রোয়ানও এ পর্ষদের সদস্য। এ ছাড়া মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ প্রথম বিশ্বনেতা হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন।

শান্তি পর্ষদের সনদে গাজার উল্লেখ নেই। তবে মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মারওয়া মাজিয়াদ মনে করেন, ট্রাম্প নিশ্চিতভাবে বিধ্বস্ত গাজাকে শান্তি পর্ষদের প্রথম ‘কার্যক্রম বাস্তবায়ন কেন্দ্র’ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

মাজিয়াদ বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) এই পর্ষদ গঠনের ধারণাটি প্রথমে গাজায়, তারপর ভেনেজুয়েলা ও ইউক্রেনে বাস্তবায়ন করতে চান। তিনি বিভিন্ন দেশে যাবেন এবং তাদের বলবেন পর্ষদে যোগ দিতে, না হলে যুদ্ধ বা সংঘাতের মুখোমুখি হতে হবে।’

মার্ক রোয়ান, স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের মতো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’–এ সদস্য হিসেবে আছেন।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আলোচক আরন ডেভিড মিলার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এতে গাজায় যুদ্ধবিরতি টেকসহ করার গুরুত্ব থেকে মানুষের মনোযোগ সরে যাবে।

মিডল ইস্ট আইকে ডেভিড মিলার বলেন, ‘এটি এমন সমাধান, যা আমাদের দরকার নেই।’

মিলার আরও বলেন, ‘গাজার ক্ষেত্রে এখন যেটা দরকার তা হলো—ট্রাম্প যেন ইসরায়েলের ওপর নিজের প্রভাব খাটান। আবার একইভাবে কাতার, তুরস্ক ও মিসর যেন হামাসের ওপর তাদের প্রভাব ব্যবহার করে।’

মিলারের মতে, ট্রাম্প যদি গাজায় নতুন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের নিয়ে আসেন, তবে সেটিকে নেতানিয়াহুর কাছে পরাজয়ের মতো মনে হবে।

মিলার বলেন, ‘যদি গাজার আন্তর্জাতিকীকরণ করা যায়, তবে ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের আন্তর্জাতিকীকরণ কেন নয়? আর এটাই নেতানিয়াহু একদমই চান না।’

শান্তি পর্ষদে ধনকুবের রোয়ানের পাশাপাশি সাইপ্রাসের বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি ব্যবসায়ী ইয়াকির গ্যাবেও জায়গা পেয়েছেন।

ট্রাম্পের ‘শান্তি পর্ষদ’ কী এবং কারা গাজা শাসন করবে

শান্তি পর্ষদে তুরস্ক ও কাতারের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁরা হলেন—কাতারের কূটনীতিক আলি আল-থাওয়াদি ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।

গত সোমবার নেতানিয়াহুর কার্যালয় বলেছে, ‘উপদেষ্টা পরিষদ গঠন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের কিছু মতবিরোধ রয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে কাতার হামাসের নেতা ও সদস্যদের আশ্রয় দিচ্ছে। আর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তাঁদের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রশংসা করেছেন। এ ছাড়া ফিদান ও আল-থাওয়াদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে সরাসরি কাজ করছেন।

সাবেক তুর্কি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফিদান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাকে আন্তর্জাতিকভাবে পুনর্বাসিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আর নেতানিয়াহু সিরিয়ায় নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে চাইছেন।

থাওয়াদি একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কাতারি কূটনীতিক। তিনি গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে দোহায় হামাসের মধ্যস্থতাকারী কর্মকর্তাদের ওপর হামলার জন্য নেতানিয়াহুকে কাতারের আমিরের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর কাতারের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে ক্ষমা চেয়েছিলেন নেতানিয়াহু। ওই সময় তোলা ছবিতে থাওয়াদিতে হোয়াইট হাউসে বসে থাকা অবস্থায় দেখা গেছে।

মাজিয়াদ মিডল ইস্ট আইকে বলেন, পর্ষদে তুরস্ক ও কাতারের অন্তর্ভুক্তি ইসরায়েলের জন্য উদ্বেগের। কারণ, এতে ভবিষ্যতে ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’–এর আওতায় তুর্কি ও কাতারি সেনাদের গাজায় পাঠানো হতে পারে।

এই বাহিনীকে গত নভেম্বরে জাতিসংঘ অনুমোদন দিয়েছে। তবে বাহিনীর আওতায় সেনাদের মোতায়েন কাজ এখনো শুরু হয়নি। কারণ, আরব ও মুসলিম দেশগুলো ইসরায়েলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজি নয়।

আরও পড়ুন

তুর্কি সেনাদের গাজায় পাঠানোর সম্ভাবনা কতটুকু

মারওয়া মাজিয়াদ বলেন, ‘আমি মনে করি আমরা তুর্কি ও কাতারি বাহিনীকে মোতায়েন দেখার আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। দুই দেশই সেনা পাঠাতে ইচ্ছুক। এটা ভালো। এ সময় তারা মিসরীয়দের সঙ্গে কোনো সমস্যা ছাড়াই কাজ করতে পারবে।’

গাজা ‘শান্তি পর্ষদের’ আরেক সদস্য হলেন মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান জেনারেল হাসান রাশাদ।

সোমবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘গাজা অঞ্চলে তুর্কি বা কাতারি কোনো সেনা থাকবে না।’

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আলোচক মিলার বর্তমানে কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসে কর্মরত। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু মূলত তাঁর দেশের মানুষদের উদ্দেশ করে এ বক্তব্য দিয়েছেন।

মিলার বলেন, কাতারি ও তুর্কিদের পর্ষদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ট্রাম্প দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।

তবে মিলারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে অনেক বিরোধ তৈরি হয়েছে ঠিকই, তবে তা ছোটখাটো সমস্যা—সত্যিকারের ফাটল নয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু
ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

জাতিসংঘের সাবেক দূত নিকোলাই মালাডেনভকে গাজায় ‘উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে হোয়াইট হাউস। তিনি শান্তি পর্ষদ এবং গাজা প্রশাসনের জাতীয় কমিটির মধ্যে মূল সংযোগকারী হিসেবে কাজ করবেন।

গাজা প্রশাসনের জাতীয় কমিটি হলো এমন একটি কমিটি, যেটি প্রযুক্তিগতভাবে গঠিত। মূলত, গাজা উপত্যকাকে পরিচালনার জন্য ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের নিয়ে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

২০২০ সালে কুশনার যখন আব্রাহাম অ্যাকর্ডস–এর আলোচনায় অংশ নেন, তখন মালাডেনভ তাঁর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। আরব ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা এর আগে মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ওই আব্রাহাম অ্যাকর্ডস–এর আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে।

আরও পড়ুন

একসময় হামাসের কাছ থেকেও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন মালাডেনভ। তিনি ব্যাপকভাবে একজন দক্ষ কূটনীতিক হিসেবে সুপরিচিত।

গত অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গাজায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ এখন বিভক্ত। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি অংশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইসরায়েল। আর বাকি অংশ হামাসের নিয়ন্ত্রণে।

মিলার মনে করেন, মাঠ পর্যায়ে কঠোর কূটনীতি না চালালে দাভোসে যত বড় আলোচনাই হোক না কেন, তা বাস্তবতাকে পাল্টাতে পারবে না।

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের একটি উদ্ধৃতিকে সামনে টেনে মিলার বলেন, ‘সিজার বলেছিলেন যে গল অঞ্চল তিন ভাগে বিভক্ত। ঠিক তেমনি গাজা দুটি ভাগে বিভক্ত। এই বিভাজন আরও শক্তপোক্ত হতে যাচ্ছে।’