ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সামলাতে দ. কোরিয়া থেকে থাড ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ খবর দিয়েছে।
জর্ডানে থাকা থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার (টার্মিনাল হাই-অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ইরান ধ্বংস করেছে বলে খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের বিষয়টি সামনে এল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইরান।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ায় থাড মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এর প্রতিবাদও হয় দেশটিতে। প্রতিবাদকারীদের ভয় ছিল, এটি তাদের আরও বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। তা ছাড়া এটা ওই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছিল চীন।
থাড কী এবং কেন এটি সরিয়ে নেওয়া হতে পারে
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটন পোস্ট দুজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, থাড ব্যবস্থার কিছু অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন টানা ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইসরায়েলি ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান একের পর এক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, এমনই সময়ে এই খবর প্রকাশিত হয়।
ইরানের কাছে ঠিক কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তা স্পষ্ট নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তারা ৫০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এগুলোর বেশির ভাগই আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এত বিপুল পরিমাণ হামলা প্রতিহত করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুত কমে আসতে পারে বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন। এই পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান নিজেকে এমন এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রসহ মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় অংশকে জড়িয়ে ফেলবে।
আর এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। সেখানে থাড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি মূলত অনেক উঁচুতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্যই বিশেষভাবে তৈরি।
চলতি মাসের শুরুর দিকে বিভিন্ন খবরে দাবি করা হয়, ইরানের হামলায় জর্ডানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি থাড ব্যবস্থার ৩০ কোটি ডলার দামের রাডার ধ্বংস হয়েছে।
মার্কিন কোম্পানি লকহিড মার্টিনের তৈরি করা এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থায় ছয়টি লঞ্চার থাকে। প্রতিটি লঞ্চারে আটটি ইন্টারসেপ্টর এবং ক্ষেপণাস্ত্রসহ উৎক্ষপণ করা অস্ত্র শনাক্ত করার জন্য একটি রাডার–ব্যবস্থা যুক্ত থাকে।
এটি ‘হিট-টু-কিল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে পারে। এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপরে অনেক উঁচুতে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এটি বিশেষভাবে কার্যকর বলে বিবেচিত হয়েছিল। কারণ, এটি দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রযুক্ত ওয়ারহেডও ধ্বংস করা সম্ভব।
এই একেকটি ব্যবস্থার (যা ব্যাটারি নামেও পরিচিত) দাম প্রায় ১০০ কোটি ডলার। এটি পরিচালনা করতে প্রায় ১০০ জন কর্মীর প্রয়োজন হয়। বিশ্বজুড়ে আমেরিকা এমন মাত্র আটটি ব্যবস্থা পরিচালনা করে, যার দুটি রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে—জর্ডান ও ইসরায়েলে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের কাছে যৌথভাবে আরও তিনটি রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে থাড মোতায়েনকে একটি ‘সতর্কতামূলক পদক্ষেপ’ বলে ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা। তবে অন্য বিশ্লেষকেরা একে দেখছেন অন্যভাবে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন নিলসন-রাইট বিবিসিকে বলেছেন, এই পদক্ষেপ জোরালোভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহার করেছে। তাতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেটা পূরণে এখন সেখানে নতুন করে থাড ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, রাজধানী সিউলের দক্ষিণে অবস্থিত সেওংজু বিমানঘাঁটি থেকে ইতিমধ্যে থাড লঞ্চারগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউংও তাঁর দেশ মার্কিন অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানানোর কথা স্বীকার করেছেন।
তিনি মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে বলেছেন, ‘দেখা যাচ্ছে, মার্কিন বাহিনী কোরিয়ায় থাকা কিছু অস্ত্র যেমন আর্টিলারি ব্যাটারি ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে বলে সম্প্রতি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এর বিরোধিতা করলেও তবে বাস্তবতা হলো আমরা আমাদের অবস্থান পুরোপুরি চাপিয়ে দিতে পারি না।’
অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া
সম্ভাব্য এই ক্ষেপণাস্ত্র স্থানান্তরের বিষয়ে বেইজিংয়ের মন্তব্য জানতে চাইলে গত বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন তাঁদের পুরোনো অবস্থানেই অনড় থাকার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘কোরিয়া প্রজাতন্ত্রে (দক্ষিণ কোরিয়া) মার্কিন থাড ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে চীনের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।’
২০১৭ সালে যখন থাড স্থাপন করা হয়, তখন চীনই এর সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিল। প্রথমত, এটি ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে এবং বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিকা রেখেছে।
ওয়াশিংটন ও সিউল বলেছিল, উত্তর কোরিয়ার হামলা ঠেকানোর জন্যই এটা মোতায়েন করা হয়েছে। কিন্তু চীনের অভিযোগ ছিল, এই ব্যবস্থার রাডার এতটাই শক্তিশালী যে এর সাহায্যে চীনের ভেতরের অনেক দূর পর্যন্ত নজরদারি করা সম্ভব। ফলে চীনা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত করতে এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে, যা বেইজিংয়ের নিজস্ব প্রতিরোধ সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এর জবাবে চীন অনানুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্য বর্জন করে। তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় দলবদ্ধ ভ্রমণে ছয় বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং কে-পপ কনসার্টগুলোও বাতিল করে দেয়।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের অধ্যাপক ইয়ান চং বিবিসিকে বলেছেন, থাড ব্যবস্থাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে দেখে বেইজিং হয়তো কিছুটা খুশি হতে পারে। তবে যতক্ষণ না এটি স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ তারা একে নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখবে না।
উত্তর কোরিয়া এ বিষয়ে এখনো জনসমক্ষে কোনো মন্তব্য করেনি। এ বিষয়ে নিলসন-রাইট বলেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের ‘এই পরিবর্তনের সুযোগ নেওয়ার’ সম্ভাবনা কম। তবে অন্য পর্যবেক্ষকদের মতে, ছোটখাটো উসকানিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি দক্ষিণ কোরিয়াকে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, সেই ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
তবে অধ্যাপক ইয়ান চং বলেন, ‘এখানে একটি প্রশ্ন গুরুতর হিসেবে সামনে আসছে। তা হলো ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডারকে এতটা কমিয়ে দেবে কি না, যাতে অন্য কোথাও কোনো জরুরি পরিস্থিতি সামলানো তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।’