যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেভাবে দাবার বোর্ড সাজিয়েছে ইরান ও চীন
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এপস্টিন সিন্ডিকেট বা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে দুটি সমান্তরাল পথে—একজন কূটনীতিক ও একজন সামরিক মুখপাত্রের মাধ্যমে।
এর অর্থ হচ্ছে চীন এই যুদ্ধকে চরম রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক হুমকি—উভয় হিসেবেই দেখছে।
চীনের সামরিক মুখপাত্র পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) একজন কর্নেল। তিনি কথা বলেন রূপকাশ্রয়ী। তিনিই স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধে আসক্ত’। দেশটির ইতিহাস মাত্র ২৫০ বছরের। এর মধ্যে তারা মাত্র ১৬ বছর শান্তির মধ্যে ছিল।
চীনের সামরিক মুখপাত্র স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন; এ ছাড়া পরিষ্কারভাবেই নৈতিক হুমকি হিসেবেও।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং মার্ক্সবাদ ও কনফুসীয়বাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংযোগ স্থাপনে দৃঢ়ভাবে মনোনিবেশ করেছেন।
রাজনৈতিক চিন্তাধারায় কনফুসিয়াসের প্রধান অবদান হলো ভাষার সুনির্দিষ্ট ব্যবহার। কেবল তিনিই একটি রাষ্ট্র শাসন করতে সক্ষম, যিনি সুনির্দিষ্ট রূপক ও নৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে কথা বলেন।
তাই চীন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের পছন্দমতো চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে সুচিন্তিতভাবে একটি সুসংগত নৈতিক ও আদর্শিক সমালোচনা গড়ে তুলছে। তারা জোর দিচ্ছে—এটি এমন একটি জাতির আক্রমণ, যারা তাদের নৈতিক দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলেছে।
গ্লোবাল সাউথ (বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলো) এ বার্তা পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে।
এর সঙ্গে রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র দেখাচ্ছে, চীন কীভাবে ইরানে যুদ্ধের নিয়মগুলোও বদলে দিয়েছে।
ইরানি গ্রিড (কৌশলগত নেটওয়ার্ক) এখন পুরোপুরি বাইদু স্যাটেলাইট–ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এটিই বুঝিয়ে দেয়, ইরান এখন কীভাবে নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের প্রতিটি পদক্ষেপ কীভাবে একটি চীনা প্রযুক্তিচালিত ডিজিটাল দেয়ালের (কক্ষপথে ৪০টির বেশি বাইদু স্যাটেলাইট) মুখোমুখি হচ্ছে। এর ফলে নির্ভুল লক্ষ্যে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হানা এবং জ্যামিং (সংকেত বিঘ্নিত করার) প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
চীন তাদের ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে ইরানকে দীর্ঘপাল্লার রাডার সরবরাহ করেছে, যা স্যাটেলাইট–ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত। এর মূল নির্যাস হলো, ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার সময় এখন অনেক কমে এসেছে।
রাশিয়া সমান্তরাল পথে সহায়তা করেছে। ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট এবং আইরিস-টির মতো পশ্চিমা ব্যবস্থাগুলো সম্পর্কে রাশিয়ার অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলো ইরানকে ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিয়েছে। এটি কেবল ড্রোন স্যাচুরেশন (বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার) কৌশল নয়; বরং এটি হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে ড্রোনের ঝাঁকের সমন্বয় করার রুশ পদ্ধতি রপ্ত করা। অপারেশন ট্রু প্রমিস ফোরের সর্বশেষ পর্যায়ে ঠিক এই ধ্বংসাত্মক প্রভাবই দেখা যাচ্ছে।
মূল লক্ষ্য পেট্রো-ইউয়ান
এবার হরমুজ প্রণালির সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালটির দিকে নজর দেওয়া যাক। এর প্রধান পদক্ষেপ হলো ইরান এখন কেবল তেলবাহী সেই ট্যাংকারগুলো চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, যেগুলোর পণ্যের লেনদেন পেট্রো-ইউয়ানে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ডলার নয়। কোনো ইউরো নয়। কেবল ইউয়ান।
আসলে ২০২২ সালের ডিসেম্বরেই চীন ব্রেটন উডস বা পেট্রোডলার–ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সে সময় বেইজিং উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) অন্তর্ভুক্ত পেট্রো-রাজতন্ত্রগুলোকে সাংহাইয়ের শেয়ারবাজারে তেল ও গ্যাস লেনদেনের আমন্ত্রণ জানায়।
এখন ওপরের সবকিছুর সঙ্গে বেইজিংয়ে মাত্রই আলোচিত ও অনুমোদিত চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে যুক্ত করুন।
গভীর পদ্ধতিগত একটি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
বেইজিংয়ের পরিকল্পনাকারীরা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অর্জনের জন্য কিছু কঠোর লক্ষ্যমাত্রা এবং বাধ্যতামূলক সূচক নির্ধারণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশে ধরে রাখা; ডিজিটাল অর্থনীতিকে জিডিপির ১২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা; পরিবেশবান্ধব বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ২৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এবং ভূপৃষ্ঠের পানির গুণমান ৮৫ শতাংশে উন্নীত করা। সেই সঙ্গে উচ্চ মূল্যের পেটেন্ট বা মেধাস্বত্বের একটি বিশাল সমাহার গড়ে তোলার মতো আরও অনেক বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে এই মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর অর্থ হলো চীনারা অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাস্তুসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে এমনভাবে বিবেচনা করছে, যেন তারা একই সুস্থ দেহের একেকটি অঙ্গ। এভাবেই নগরায়ণ উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করে; গবেষণা ও উন্নয়নে প্রচুর বিনিয়োগ আরও বেশি করে পেটেন্ট তৈরি করে; পেটেন্টগুলো ডিজিটাল অর্থনীতিকে গতিশীল করে; আর পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সমাধানগুলো কৌশলগত স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করে।
সর্বশেষ এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চূড়ান্তভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, চীন কীভাবে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে আসন্ন প্রযুক্তিগত ভবিষ্যতের নেতা হওয়ার পরিকল্পনা করছে। আর এটি কেবল ২০৩০ সাল পর্যন্তই নয়, বরং এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বিস্তৃত।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় পেট্রোডলারকে চূর্ণ করা মূল ভূমিকা পালন করছে। ইরান এখন এটি চীনের সামনে একটি থালায় সাজিয়ে উপহার দিচ্ছে। তারা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশলগত সংকীর্ণ পথে (হরমুজ প্রণালি)—যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়—সেখানে পেট্রোডলারের পরিবর্তে পেট্রো-ইউয়ান চালু করছে।
ইরানের এ চাল সামরিক নয়; এটি আর্থিকভাবে পারমাণবিক, যা এই পুরো বিষয়কে আরও সহজ করে তুলেছে। আর তা হচ্ছে, ইরান ইতিমধ্যেই গ্লোবাল সাউথের বাকি দেশগুলোর অনুসরণের জন্য একটি মডেল বা আদর্শ তুলে ধরছে। তেহরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এখন আন্তসীমান্ত আন্তব্যাংক লেনদেনব্যবস্থার (সিআইপিএস) মাধ্যমে ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে।
গ্লোবাল সাউথ শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত সহজ এই মডেল গ্রহণ করে নিতে পারে। তেহরান বলছে না হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ। এটি কেবল বৈরী ‘এপস্টিন সিন্ডিকেট’ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের অনুসারীদের জন্য অবরুদ্ধ, যারা পেট্রোডলারে লেনদেন করে। নৌ চলাচলের পথগুলোকে বাস্তব সময়ে (রিয়েল টাইম) ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেহেতু গ্লোবাল সাউথ পেট্রো-ইউয়ানের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তাই ১৯৭৪ সাল থেকে চলে আসা আধিপত্যবাদী পেট্রোডলার–ব্যবস্থার মৃত্যু ঘটছে।
এতক্ষণে পৃথিবীর প্রত্যেক ব্যবসায়ীই জানেন, পেট্রোডলার কীভাবে কাজ করে। ১৯৭৩ সালের তেলের ধাক্কার পর, ১৯৭৪ সালে জিসিসি এবং ওপেক (তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট) একমত হয়েছিল, তেল কেবল মার্কিন ডলারে লেনদেন করা যাবে।
তেল রপ্তানিকারকদের অবশ্যই তাদের ডলারের মুনাফা আবার মার্কিন ট্রেজারি বন্ড এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে হয়। এটি রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে মার্কিন ডলারের ভূমিকাকে শক্তিশালী করে, আমেরিকার প্রযুক্তিগত বিনিয়োগে অর্থায়ন করে, তাদের ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল-মিলিটারি কমপ্লেক্স’ এবং তাদের ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ অর্থের জোগান দেয়। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এটি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধেয় ঋণের অর্থায়ন করে।
ব্রিকস সদস্য হিসেবে চীন, রাশিয়া ও ইরান বর্তমানে বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্মুখসারিতে রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পেট্রোডলারকে এড়িয়ে চলা।
এটা শুধু তেলের নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়—ইরানে এই এলোমেলো, পরিকল্পনাহীন ‘অভিযান’–এর (ট্রাম্পের ভাষায় ‘এক্সকারশন’) যে কথিত কারণ দেখানো হচ্ছে, তার চেয়েও অনেক বড় কিছু।
সব ব্যবহারিক উদ্দেশ্যেই মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাগুলো ইতিমধ্যেই এক ‘বিরাট ব্যর্থতা’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে; বরং এর বিপরীতে যে পাল্টা আঘাত আসছে, তা সম্পূর্ণ নতুন এক স্তরের।
আইআরজিসি যেভাবে এখন সান জুর রণকৌশল নিয়েছে
হরমুজ প্রণালিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলো ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সংশোধিত সান জুর রণকৌশল। একটি সংযোগ করিডর হরমুজ প্রণালি এবং একটি মুদ্রা ইউয়ান—উভয়ই এখন সাম্রাজ্যবাদী বিনাশের মারণাস্ত্র। পারমাণবিক বোমার আর প্রয়োজনই–বা কী?
এখানে ঝুঁকির বিষয় হচ্ছে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, যা ২০৩০ সালের অনেক পর, শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় এবং তারও পর পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। আমরা এখন বাস্তব সময়েই যা দেখছি, তা হলো পারস্যবাসীর একধরনের দাবা খেলা—যেখানে তারা খুব দক্ষ। তবে এর মধ্যে চীনের ‘ওয়েইচি’ (ইংরেজিতে ‘গো’) খেলার উপাদানও রয়েছে।
‘গো’ একটি প্রাণবন্ত খেলা। এই খেলায় ব্যবহৃত ছোট পাথরগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তখন তারা বোর্ডজুড়ে একটি সুনির্দিষ্ট আকার তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। আমাদের ক্ষেত্রে এটি হলো ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক দাবার বোর্ড। এর পুরোটা জুড়েই রয়েছে সঠিক অবস্থান গ্রহণ, ধৈর্য, তিল তিল করে সুবিধা সঞ্চয় করা এবং সুনিপুণ কৌশল পরিচালনা।
এটাই সেই ‘গোপন রহস্য’, কেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন চীনকে চূড়ান্ত চালটি দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। বেইজিং বছরের পর বছর ধরে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে এই দাবার বোর্ড সাজিয়েছে। একগুচ্ছ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, ব্রিকস এবং এসসিওতে (সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন) মূল ভূমিকা পালন করা, নতুন সিল্ক রোড নির্মাণ করা, বিকল্প লেনদেনব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা এবং তাদের কূটনীতিকে শক্তিশালী করা—এর সবই ছিল সেই বোর্ডের অংশ।
‘গো’ খেলাটি অত্যন্ত যুক্তি মেনে খেলতে হয়। আপনি যদি বোর্ডটি ঠিকভাবে সাজাতে পারেন, তবে আপনার ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। খেলাটি তখন নিজেই নিজের গতিতে এগোতে থাকে। আমরা এখন ঠিক সেই পর্যায়েই আছি। আর এ কারণেই সেই সাম্রাজ্যবাদী হুমকিদাতারা, তার চাটুকার, সহায়তাকারী এবং অনুগত রাষ্ট্রগুলো আজ স্তম্ভিত ও পাথর হয়ে গেছে। তারা সবাই আজ নিজেদেরই ঔদ্ধত্যের চোরাবালিতে বন্দী।
লেখক: পেপে এসকোবার দ্য ক্রেডলের কলামিস্ট, এশিয়া টাইমসের এডিটর অ্যাট লার্জ এবং ইউরেশিয়া–বিষয়ক একজন স্বাধীন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক।