ইরানে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভ থেকে এখন সরকার পতনের ডাক দেওয়া হচ্ছে। আন্দোলন দমনে মাঠে নামানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুই পক্ষের সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন।
ইরানের বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবন, মেট্রো স্টেশন, ব্যাংক ছাড়াও বাস, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে সরকার। ইন্টারনেট না থাকায় পরিস্থিতির পুরো চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসছে না বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বার্তা সংস্থা।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সপ্তাহে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর এবার ইরানে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে বিক্ষোভকারীরা ট্রাম্পের পক্ষে কাজ করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর সরকারের পক্ষেও গতকাল বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার ১৩তম দিনে বিক্ষোভ ইরানের ৩১টি প্রদেশের সব কটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরানসহ শতাধিক শহরের রাস্তায় নেমেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের মধ্যে আছেন শিক্ষার্থী, তরুণী ও নারীরাও।
ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এবং বিদেশ থেকে ফোনকল না ঢোকায় বিক্ষোভে হতাহতের তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আট শিশুসহ অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর)। আর গত ১৩ দিনে বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ২ হাজার ২৭০ জনকে।
ইরানে এবারের বিক্ষোভকে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বলা হচ্ছে। এর আগে ২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাসা আমিনি নিহত হওয়ার পর বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল দেশটি। তখন সাড়ে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০ হাজার জনের বেশি ইরানিকে। ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল ২০০৯ সালে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে।
বিক্ষোভের পেছনে কী
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় রয়েছে ইরান। এতে দেশটির অর্থনীতি আগে থেকেই নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। এরই মধ্যে গত বছরের জুন মাসে ১২ দিন ধরে চলে ইসরায়েল-ইরান সংঘাত। ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্রও। সংঘাত চলাকালে ইরানের বিভিন্ন শহর ও পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এতে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে দেশটি।
এর জেরে ইরানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশের বেশি। বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। এক বছর ধরে মার্কিন ডলারের তুলনায় দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মানেও পতন চলমান। অর্থনীতি ছাড়া ইরানিদের ক্ষোভের আরেকটি কারণ হলো সরকারের অনেক কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ। ইরানিরা মনে করছেন, ক্ষমতাধরেরা ইরানের সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন।
চলমান বিক্ষোভ আরও জোরদার করার ডাক দিয়েছেন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনে রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃহস্পতিবার বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘পুরো বিশ্ব আপনাদের ওপর নজর রাখছে। রাস্তায় নেমে আসুন।’ শুক্রবার রাত আটটা থেকে টানা বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
পরে গতকাল রাতে আরেক পোস্টে সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রেজা পাহলভি। ইরানের মানুষকে সহায়তা করতে দেশটিতে ‘হস্তক্ষেপের জন্য’ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি। তবে এর আগেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, রেজা পাহলভির সঙ্গে তিনি দেখা করবেন না। রেজা পাহলভিকে সমর্থন দেওয়া সঠিক হবে কি না, তা-ও নিশ্চিত নন তিনি (ট্রাম্প)।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে দেশটিতে চলমান বিক্ষোভের জন্য পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন নামের একটি সংগঠনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সংগঠনটি এমকেও নামে পরিচিত। ইসলামি বিপ্লবের পর বিরোধী এই সংগঠন বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এখন তারা আবার সংগঠিত হয়েছে বলে দাবি তেহরানের।
মেট্রো স্টেশন-টেলিভিশন ভবনে আগুন
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, দেশটির মেট্রো স্টেশন, ব্যাংক ছাড়াও বাস, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে বিক্ষোভকারীদের আগুন দিতে দেখা গেছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ইসফাহান শহরে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘আইআরআইবি’ ভবনে আগুন দিতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও ইরানের জাতীয় পতাকা ছিঁড়ে ফেলেছেন বিক্ষোভকারীরা।
গতকাল বিক্ষোভকারীদের সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। যেমন ইসফাহানে শত শত মানুষের বিক্ষোভ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনিকে ইঙ্গিত করে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল, ‘স্বৈরশাসক নিপাত যাক’। আবার রেজা পাহলভির পক্ষে বাবল শহরে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল, ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’। তেহরানে বড় বিক্ষোভ থেকে গলা মিলিয়ে বলা হচ্ছিল, ‘এটা শেষ লড়াই। পাহলভি ফিরবে।’
ইসফাহানে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন ৩১ বছর বয়সী এক তরুণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে। ৫০ বছর ধরে এই সরকার দেশ শাসন করছে। এর ফল দেখুন। আমরা দরিদ্র, একঘরে আর হতাশ হয়ে পড়েছি। চাই না আমাদের দেশে আবার বিদেশি হামলা হোক। আমরা শান্তি চাই। সারা বিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক চাই।’
ইরানের এই বিক্ষোভ গত বুধবার সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল বলে জানিয়েছে নরওয়েভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইচআর। তাদের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন দেশজুড়ে অন্তত ১৩ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন। সংস্থাটির পরিচালক মাহমুদ আমিরি মোগাদ্দাম বলেন, ‘এই থেকে বোঝা যায় দিন দিন বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন আরও সহিংস ও চরম হয়ে উঠছে।’
গতকাল ইরানের প্রেস টিভির প্রকাশিত ভিডিওতে দেশটির খোররামবাদ ও আরদাবিল শহরে সরকারের পক্ষে সমাবেশ হতে দেখা গেছে। এতে শত শত মানুষ যোগ দেন। এ সময় অনেকের হাতে ছিল সর্বোচ্চ নেতা খামেনির ছবি। সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের কারও কারও হাতে থাকা পোস্টারে যুক্তরাষ্ট্রের পতন চেয়ে স্লোগান লেখা দেখা যায়।
নেই ইন্টারনেট, ফ্লাইট স্থগিত
বিক্ষোভ দমনে ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয় বৃহস্পতিবার রাতে। এরপর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দেশটি ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নেটব্লকস’। এতে সমস্যার মুখে পড়েছে ইরানের ব্যাংকিং খাত। ইন্টারনেট না থাকায় ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোর অনলাইন সংস্করণেও হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হচ্ছে না।
ইরানে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নের ঘটনা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করছেন আমির রশিদি। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান মিয়ান গ্রুপের এই কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ইরানে এমন ঘটনা তিনি কখনো দেখেননি। যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা কাজ করছে না। এমনকি সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সংযোগেও বাধা দিচ্ছে সরকার।
বিক্ষোভের মধ্যে নিরাপত্তার খাতিরে গতকাল ইরানে ফ্লাইট স্থগিত করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এয়ারলাইনস। তেহরানের সঙ্গে পাঁচটি ফ্লাইট স্থগিত রেখেছিল টার্কিশ এয়ারলাইনস। সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুবাই থেকে ইরানের বিভিন্ন শহরে অন্তত ১৭টি ফ্লাইটও যাত্রা করেনি। কাতারের হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দোহা–তেহরান রুটে দুটি ফ্লাইটও গতকাল বাতিল করা হয়।
‘ট্রাম্পের হাতে ইরানিদের রক্ত’
ইরানে বিক্ষোভ যখন চরম পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছেন খামেনি। এর কারণও রয়েছে। ইরানে বিক্ষোভের প্রথম দিকে ২ জানুয়ারি উসকানি দিয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, দেশটিতে হামলা চালাতে ‘প্রস্তুত’ যুক্তরাষ্ট্র। পরে গতকাল এক অনুষ্ঠানে আলাপচারিতার সময় তিনি আবার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি তাদের (ইরান) জানিয়ে দিয়েছি যে তারা যদি মানুষ হত্যা শুরু করে, যা তারা দাঙ্গার সময় প্রায়ই করে থাকে, তাহলে আমরা তাদের ওপর খুব কঠোরভাবে আঘাত হানব।’
ট্রাম্পের হুমকির পর টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ মুখে দেশবাসীর প্রতি ‘ঐক্যের’ ডাক দেন। ‘ট্রাম্পের হাত ইরানিদের রক্তে রঞ্জিত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ট্রাম্পের হয়ে বিক্ষোভকারীরা সরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালাচ্ছে। ইরানিরা যদি ‘বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধাদের’ মতো আচরণ করে, তা তেহরান সহ্য করবে না।