সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: দেশটির আইন কী বলে, আদালতে কী ঘটে

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। সম্প্রতি দুই বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সৌদিতে এ বছরের প্রথম ৬ মাসে ৫৯ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড, বিদেশি নাগরিকদের ওপর এ সর্বোচ্চ সাজা কার্যকরের প্রভাব ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। নির্যাতনের অভিযোগ, আইনজীবী পাওয়ার সীমাবদ্ধতা ও আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশটির বিচারব্যবস্থা ও মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের পদ্ধতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির আইন কী বলে, আদালতে কী ঘটে তা নিয়ে আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানফাইল ছবি: রয়টার্স

সেপ্টেম্বর ২০২৫। সৌদি আরবের কারাগারে চার মিসরীয় বন্দী শুনলেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নাকি তাঁদের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন; মামলা নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। কারা কর্তৃপক্ষই তাঁদের এ আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু এর অল্প সময় পরই, কোনো আগাম খবর ছাড়া, চারজনেরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বাংলাদেশের পাঠকের কাছে এ চিত্র এখন ভালোভাবেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড সম্প্রতি কার্যকর হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের (ইএসওএইচআর)’ হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সৌদি আরবে অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এ দুজন সেই হিসাবের বাইরে। ওই ছয় মাসে কত বাংলাদেশির সাজা কার্যকর হয়েছে, তা জানা যায়নি।

সৌদি আরব বহু বছর ধরেই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশগুলোর একটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এবারও দেশটি বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, কোন আইনে, কার বিবেচনায় আর কেমন আদালতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ঠিক হয়? আর যুবরাজের বারবার দেওয়া সংস্কারের আশ্বাসই–বা গেল কোথায়? খোঁজা যাক সে উত্তর:

এক দশকে বেড়েছে প্রায় চার গুণ

প্রতীকী ছবিতে মৃত্যুদণ্ড
ছবি: অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া

২০২৫ সালে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে রেকর্ড ৩৫৬টি। এক বছর আগে, ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫, যা তখন ছিল গত এক দশকের সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালে, অর্থাৎ মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ হওয়ার পরের বছর, কার্যকর হয়েছিল ১৪৯টি; ২০২৪ সালের সংখ্যা তার দ্বিগুণের বেশি। ২০১৪ সালের ৯০টির তুলনায় এটি প্রায় গুণ।

২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই ১৮০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। অ্যামনেস্টি তখনই সতর্ক করেছিল, ওই গতিতে চললে বছরের মোট সংখ্যা ২০২৪ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি দাঁড়াতে পারে। বছর শেষে ৩৫৬ সংখ্যাটি সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে মোট ১ হাজার ৮১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তাঁদের প্রায় প্রতি তিনজনের একজনের সাজা হয়েছে শুধু মাদকসংক্রান্ত অপরাধে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি।

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইএসওএইচআর অন্তত ১০৮ জনের মৃত্যুদণ্ড রেকর্ড করেছে। সংস্থাটির হিসাবে বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনামলে মোট কার্যকর করা মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা ২ হাজারে পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী যেকোনো শাসনামলের তুলনায় এটি রেকর্ড।

২০২৫ সালে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে রেকর্ড ৩৫৬টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫, যা তখন ছিল গত এক দশকের সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালে, অর্থাৎ মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ হওয়ার পরের বছর, কার্যকর হয়েছিল ১৪৯টি; ২০২৪ সালের সংখ্যা তার দ্বিগুণের বেশি।

শেষ কথা বিচারকের

সৌদি আরবে সব অপরাধ ও শাস্তি নির্ধারণ করে, এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দণ্ডবিধি নেই। কোনটি অপরাধ, আর তার শাস্তি কী হবে, তা ঠিক করার ব্যাপক ক্ষমতা পান বিচারকেরা। তাঁরা এটি করেন ইসলামি আইন (শরিয়াহ) ও ফিকহের (শরিয়াহর বিধানগুলোর ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ সম্পর্কে ইসলামি আইনবিদদের বোঝাপড়া) নিজস্ব ব্যাখ্যায়। দেশটির শাসনব্যবস্থা অনুযায়ী, যেকোনো আইনের চূড়ান্ত উৎস পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ।

ইসলামি আইনে অপরাধ তিন ভাগে বিভক্ত: হদ, কিসাস ও তাজির। হদ ও কিসাস—এ দুই শ্রেণির অপরাধে শাস্তি নির্ধারিত; এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ডও আছে। হদ নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি; যেমন কিছু ক্ষেত্রে চুরি, ব্যভিচার ও মদ্যপান। কিসাস প্রযোজ্য হয় প্রধানত খুন বা শারীরিক আঘাতের ক্ষেত্রে, প্রতিশোধমূলক শাস্তি হিসেবে। নির্দিষ্ট শর্তে ভুক্তভোগী বা নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা এ ক্ষেত্রে ক্ষমা করতে বা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করতে পারেন। তৃতীয় শ্রেণি তাজির এমন অপরাধ, যার শাস্তি হদ বা কিসাসে নির্ধারিত নেই। জনশৃঙ্খলা ও সমাজের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে, এমন সব কাজ এর আওতায় পড়ে। এখানে শাস্তি কী হবে, তা ঠিক করেন বিচারক নিজে।

মৃত্যুদণ্ডের রায়ে শরিয়াহর নির্ধারিত বিধান আর তাজিরের বিবেচনামূলক সিদ্ধান্ত মিলেমিশে থাকে। সবচেয়ে কঠোর ও অপূরণীয় শাস্তি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুদণ্ড এখানে বিচারকের বিবেচনার ওপরই ছাড়া। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তাজিরের আওতায় মৃত্যুদণ্ড ‘কদাচিৎ প্রয়োগ হয়’। তবে মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যান ভিন্ন ছবি দেখায়।

যুবরাজ বিচারব্যবস্থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানিয়েছেন। এ জন্য প্রসিকিউশনের ক্ষমতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েছেন রাজদরবারে। এ ছাড়া বিচারাঙ্গনে প্রভাব খাটাতে পারে এমন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়েছেন, আদালতজুড়ে বসিয়েছেন অনুগতদের।
আবদুল্লাহ আলাউদ, সৌদি গবেষক

কিছু লিখিত আইনেও নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং ২০০৫ সালের মাদকবিরোধী আইন প্রধান। মাদকবিরোধী আইনে কয়েকটি অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডকে মূল শাস্তি হিসেবেই রাখা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অস্পষ্ট ধারায় ‘জাতীয় ঐক্য বিপন্ন করা’র মতো অভিযোগেও লোকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যেসব অপরাধের শাস্তি কোনো আইনে নির্ধারিত নেই, সেখানে বিচারকেরা ফিরে যান শরিয়াহর ব্যাখ্যায়।

মৃত্যুদণ্ডের তালিকাও দীর্ঘ। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, শুধু খুন নয়; অস্ত্রের মুখে ডাকাতি, অপহরণ বা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত খুনেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। এর বাইরে রাষ্ট্রদ্রোহ, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকিনীবিদ্যা ও জাদুটোনা, ডাকাতি, নির্যাতন এবং খুনের চেষ্টার মতো অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়। মাদকের ক্ষেত্রে পাচার, দখলে রাখা, বিতরণ এমনকি সেবন পর্যন্ত এর আওতায়।

তবে আন্তর্জাতিক আইনে মৃত্যুদণ্ড শুধু ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেমন ইচ্ছাকৃত হত্যা। সৌদি সরকার জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দলকে বলেছে, তারা শুধু ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে’ই মৃত্যুদণ্ড দেয়।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ‘বিবেচনামূলক শাস্তির দণ্ডবিধি’ (পেনাল কোড ফর ডিসক্রিশনারি স্যাঙ্কশনস) নামে একটি নতুন আইনের খসড়ার ঘোষণা দেয়, যাতে তাজিরের অপরাধগুলো লিখিত রূপ পাবে। ফাঁস হওয়া খসড়া বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি বলছে, এতে মৃত্যুদণ্ড সীমিত হওয়ার বদলে আরও পাকাপোক্ত হচ্ছে। খসড়ায় খুন, ধর্ষণ, ‘ধর্মদ্রোহ’ ও ‘ধর্মত্যাগ’-এর অভিযোগে বিচারকেরা মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবেন। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো পাস বা কার্যকর করা হয়নি।

আরও পড়ুন

বিচারক নিয়োগ দেন কে

দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’। এর সদস্য ১১ জন, প্রধান হন বিচারমন্ত্রী। বাদশাহ নবায়নযোগ্য চার বছরের মেয়াদে সদস্য নিয়োগ দেন। ২০০৭ সালের ‘বিচারব্যবস্থা-আইন’ অনুযায়ী এ পর্ষদ আদালত ও বিচারকদের কাজ তদারক করে। আর মৃত্যুদণ্ড, অঙ্গচ্ছেদ, পাথর ছুড়ে হত্যা কিংবা কিসাসের রায় পর্যালোচনার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের।

আইনে বিচারকদের স্বাধীনতার কথা বলা আছে, কিন্তু অ্যামনেস্টির মূল্যায়নে বিচারকেরা কার্যত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণেই থাকেন। বিচারক নিয়োগ হন রাজকীয় আদেশে। বিচারক পুরুষ হতে হবে—এমন কথা আইনে স্পষ্ট করে লেখা নেই; তবে দেশের সব বিচারকই পুরুষ।

সরকারি কৌঁসুলি দপ্তর ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী—দুটিই সরাসরি বাদশাহ ও যুবরাজের কাছে জবাবদিহি করে। সৌদি গবেষক আবদুল্লাহ আলাউদের ভাষ্য, যুবরাজ বিচারব্যবস্থাকে নিজের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানিয়েছেন। এ জন্য প্রসিকিউশনের ক্ষমতা (রাষ্ট্রীয়ভাবে মামলা তদন্ত ও আসামিকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রশাসনিক ও আইনি ক্ষমতা) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েছেন রাজদরবারে। এ ছাড়া বিচারাঙ্গনে প্রভাব খাটাতে পারে, এমন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়েছেন, আদালতজুড়ে বসিয়েছেন অনুগতদের।

নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি; যেমন কিছু ক্ষেত্রে চুরি, ব্যভিচার ও মদ্যপান। কিসাস প্রযোজ্য হয় প্রধানত খুন বা শারীরিক আঘাতের ক্ষেত্রে, প্রতিশোধমূলক শাস্তি হিসেবে। নির্দিষ্ট শর্তে ভুক্তভোগী বা নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা এ ক্ষেত্রে ক্ষমা করতে বা ক্ষতিপূরণ নিতে পারেন। তৃতীয় শ্রেণি তাজির; এখানে শাস্তি ঠিক করেন বিচারক নিজে।
সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ
ফাইল ছবি: রয়টার্স

অ্যামনেস্টির মতে, বিচারকদের ব্যাপক বিবেচনাক্ষমতা আর বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার অভাবের সুযোগে কর্তৃপক্ষ আদালতকে ব্যবহার করে সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির সমালোচকদের শাস্তি দিতে পেরেছে।

আসামিদের অধিকার অবশ্য কাগজে আছে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে রাজকীয় ফরমানে জারি হওয়া ফৌজদারি কার্যবিধি আইনে তদন্ত ও বিচার—দুই পর্যায়েই আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার আছে। আসামিদের ওপর নির্যাতন ও তাঁদের সঙ্গে অন্যান্য দুর্ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, বিচারপূর্ব আটকের সময়সীমা বাঁধা, দীর্ঘ আটকে বিচারিক পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক, আর মৃত্যুদণ্ডসহ সব রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে। বাস্তবে, অ্যামনেস্টির ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ডের মামলাতেও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে মানা হয়নি।

যেসব মামলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক অভিযোগ থাকে, সেগুলো যায় বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালতে। এ আদালত সম্পর্কে জাতিসংঘের যথেচ্ছ আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের মত, একে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল বলা যায় না।

আরও পড়ুন

ঘোষণা এক, বাস্তবতা আরেক

২০১৮ সাল থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষ একাধিকবার মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অ্যামনেস্টির পর্যবেক্ষণ, প্রতিবারই তারা হয় পিছু হটেছে, নয়তো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। ২০২২ সালের ৩ মার্চ ‘দ্য আটলান্টিক’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুবরাজ বলেছিলেন, একটিমাত্র শ্রেণি বাদে মৃত্যুদণ্ডের বাকি সবকিছুই তাঁরা তুলে দিয়েছেন। ওই শ্রেণির কথা পবিত্র কোরআনে লেখা আছে; এ নিয়ে কিছু করার নেই।

এ ছাড়া যুবরাজ বারবার প্রকাশ্যে আশ্বাস দিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড শুধু হত্যার ক্ষেত্রে থাকবে এবং শরিয়াহ যেসব অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বাধ্যতামূলক করেনি, যেমন মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ—সেসব ক্ষেত্রে তা তুলে নেওয়া হবে। অর্থাৎ তাজিরের ভিত্তিতে আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে না। অথচ সৌদি সরকারি সংবাদ সংস্থার ঘোষণাই বলছে, তাজিরের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে চলেছে।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে সৌদি আরবের মানবাধিকার কমিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে অলিখিত এ স্থগিতাদেশ ২০২৩ সালে উঠে যায়; তারপর আগে থেমে থাকা মামলাগুলোতেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু হয়।

স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের সময় অনেক আসামিকে নির্যাতন বা দুর্ব্যবহার করা হয়েছে; আর সেই স্বীকারোক্তিই পরে আদালতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

প্রায় অর্ধেক মৃত্যুদণ্ড বিচারকের বিবেচনায়

অ্যামনেস্টি ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি বিশ্লেষণ করেছে। দেখা গেছে, ৮৬২টি অর্থাৎ ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ মৃত্যুদণ্ডের ভিত্তি ছিল তাজির। এর মধ্যে ৫৯৭টি (৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ) শুধু মাদক অপরাধে আর ১৩৫টি (১৫ দশমিক ৭ শতাংশ) শুধু ‘সন্ত্রাস’-সংক্রান্ত অপরাধে।

সময়ের হিসাবে ছবিটা এমন—২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোটামুটি অর্ধেক মৃত্যুদণ্ড হদ বা কিসাসে, বাকি অর্ধেক তাজিরে। ২০১৯ সালে তাজিরের অংশ লাফিয়ে প্রায় ৭১ শতাংশে ওঠে; ওই বছর সরকারি সংবাদ সংস্থা ১৩০ জনের তাজির-মৃত্যুদণ্ডের খবর দেয়, যাঁদের ৮৪ জন শুধু মাদক অপরাধে।

২০২০ থেকে ২০২৩ সালে তাজিরের হার কমে, যার আংশিক কারণ মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের স্থগিতাদেশ হতে পারে বলে অ্যামনেস্টি মনে করে। ২০২৪ সালে আবার ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় তাজিরের ভিত্তিতে; আরও ১১ দশমিক ৩ শতাংশের ভিত্তি অজানা। ওই বছর শুধু মাদক অপরাধে তাজির-মৃত্যুদণ্ড ছিল ১২২টি, যা ২০১৫ সালের প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনেই তা হয় ১১৮টি।

‘সন্ত্রাসের’ সংজ্ঞা আর ভিন্নমতের দণ্ড

মাদকের পাশাপাশি দ্বিতীয় বড় ক্ষেত্র ‘সন্ত্রাস’। অ্যামনেস্টির মতে, সৌদি আরব ‘সন্ত্রাস’, ‘সন্ত্রাসী অপরাধ’ ও ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’-এর অত্যন্ত অস্পষ্ট সংজ্ঞা ব্যবহার করে এমন মামলায়ও মৃত্যুদণ্ড দেয়; যেখানে ইচ্ছাকৃত হত্যার ঘটনা নেই। উদ্দেশ্য, ভিন্নমত দমন।

২০১৭ সালের সন্ত্রাস দমন আইনের অস্পষ্ট ধারা ব্যবহার করে বিচারকেরা ‘জাতীয় ঐক্য বিপন্ন করা’ কিংবা ‘জনশৃঙ্খলা ও সমাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা’র মতো অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ মতভিন্নতা প্রদর্শন, মানবাধিকার রক্ষা ও রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে প্রচারও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ বা ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে বলে অ্যামনেস্টির দাবি।

২০১১–২০১২ সালে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে বৈষম্যবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র হলে কর্তৃপক্ষ এতে অংশগ্রহণ বা সমর্থন দেওয়ায় সন্দেহভাজনদের ওপর দমন-পীড়ন চালায়। গ্রেপ্তার হন অনেক বিক্ষোভকারী, তাঁদের মধ্যে ছিল অপ্রাপ্তবয়স্করাও। শাস্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় মৃত্যুদণ্ড।

সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা
ছবি: রয়টার্স

এই ধারার অন্যতম আলোচিত নাম সৌদ আল-ফারাজ। এই ব্যবসায়ীকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আল-কাতিফের বিক্ষোভে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১১–২০১২ সালের ওই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য ২০২২ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তাঁর আটককে বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে গণ্য করেছিল।

শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করার অভিযোগে দণ্ডিত আরও ৪৯ জন এখন মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন বলে জানিয়েছে ইএসওএইচআর। এঁদের মধ্যে আছেন শেখ সালমান আল-আওদা ও শেখ হাসান আল-মালিকি। ২০১৮ সাল থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে এলেও আজ পর্যন্ত তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের তালিকাও দীর্ঘ। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, শুধু খুন নয়; অস্ত্রের মুখে ডাকাতি, অপহরণ বা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত খুনেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। এর বাইরে রাষ্ট্রদ্রোহ, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকিনীবিদ্যা ও জাদুটোনা, ডাকাতি, নির্যাতন এবং খুনের চেষ্টার মতো অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়। মাদকের ক্ষেত্রে পাচার, দখলে রাখা, বিতরণ এমনকি সেবন পর্যন্ত এর আওতায়।

চলতি বছরের হিসাব: ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের ৮৩টিতেই হত্যার সংশ্লিষ্টতা নেই

চলতি ২০২৬ সালে ইএসওএইচআরের নথিবদ্ধ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের ৮৪টি, অর্থাৎ ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, তাজিরের ভিত্তিতে কার্যকর হয়েছে। অপরাধের ধরন ধরলে মাদকসংক্রান্ত অপরাধে ৭১টি (৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ), হত্যায় ২৫টি (২৩ শতাংশ), রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় ৯টি (প্রায় ৮ শতাংশ) এবং অন্যান্য মামলায় ৩টি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ১০৮টি মৃত্যুদণ্ডের ৮৩টি এমন অপরাধে, যার সঙ্গে হত্যার সম্পর্ক ছিল না।

ইএসওএইচআর আরও জানিয়েছে, ১০৮টির ৯১টি (৮৪ দশমিক ২ শতাংশ) মামলা সম্পর্কে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তারা বা অন্য কোনো সংস্থা কোনো তথ্য জানতে বা নথিবদ্ধ করতে পারেনি।

আদালতে কী ঘটে

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথিবদ্ধ প্রতিটি মামলায় আসামিরা অভিযোগ করেছেন, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁদের নির্যাতন বা দুর্ব্যবহার করা হয়েছে; আর সেই স্বীকারোক্তিই পরে আদালতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

সংস্থাগুলোর ভাষ্য, সৌদি আরবে বেশির ভাগ মৃত্যুদণ্ড ও দোষী সাব্যস্তের ভিত্তি শুধুই জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তি। যাচাই বা পরীক্ষা করা মামলাগুলোতে দেখা গেছে, নির্যাতনের অভিযোগ কোনো অনুসন্ধান ছাড়াই খারিজ হয়ে গেছে।

সৌদ আল-ফারাজের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। মিথ্যা স্বীকারোক্তি লিখতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে বারবার নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁকে এমনভাবে মারধর করা হয়েছে যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়; তিনি যৌন সহিংসতার শিকার হন; তাঁর স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের হুমকিও দেওয়া হয়। শিশুসন্তানকে কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখিয়ে স্ত্রীকেও স্বামীর বিরুদ্ধে বিবৃতিতে সই করানো হয়। বিচার চলাকালে তিনি নির্যাতনের বিস্তারিত অভিযোগ তোলেন এবং বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালত, সরকারি কৌঁসুলি, সৌদি মানবাধিকার কমিশন ও সরাসরি যুবরাজের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। কোনো তদন্ত শুরু হয়নি; আদালতও তাঁর স্বীকারোক্তি গ্রহণযোগ্য কি না, তা যাচাই করেননি।

জালাল আল-লাব্বাদকে অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকার সময় আল-কাতিফে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, মিথ্যা বিবৃতিতে সই করাতে তাঁকে বিদ্যুতের শক, শ্বাসরোধ ও মারধরের মতো নির্যাতন করা হয়েছে, রাখা হয়েছে দীর্ঘ সময় একা। শৈশবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পাঁচ তরুণসহ একাধিক মামলায় নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তিই বিচারে দণ্ডের একমাত্র প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

এমন জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তির পথ সহজ করে একাকী ও বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা আটকের ঘটনা। সৌদ আল-ফারাজ ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২০ মাসের বেশি একাকী আটক ছিলেন এবং পুরো সময় তাঁর বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। জালাল আল-লাব্বাদ দুই দফায় মোট ৯ মাস নির্জন কারাবাসে ছিলেন। আবদুল্লাহ আল-দেরাজি তিন মাস বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগহীন ছিলেন, পরিবার জানত না তিনি কোথায়। ইউসুফ আল-মানাসিফের পরিবার গ্রেপ্তারের পর পাঁচ মাস তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। জাওয়াদ কুরেইরিস তদন্তের সময় আইনজীবী ও পরিবার—দুইয়ের সঙ্গেই যোগাযোগের সুযোগ পাননি। হাসান জাকি আল-ফারাজ তিন মাস, ফারহাত আবু আল-সাউদ চার মাস একাকী ছিলেন।

নির্জন কারাবাসের সময় মোহাম্মদ লাব্বাদকে একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তি ধাতব তার দিয়ে পিটিয়েছেন, যৌনাঙ্গসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে লাথি মেরেছেন, গলায় পা দিয়ে চেপে শ্বাস রোধ করেছেন; তাঁর ওপর ওয়াটারবোর্ডিং চালানো হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় হাত-পায়ে কড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে।

জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার বারবার বলেছেন, শুধু স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। ওয়ার্কিং গ্রুপের ভাষ্য, জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তি গোটা বিচারপ্রক্রিয়াকেই কলুষিত করে এবং ন্যায্য বিচারের মৌলিক নীতিকে গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন করে।

আরও পড়ুন

কাঠগড়ায় বেশি প্রবাসীরা

এ বিচারব্যবস্থার ভার সবার ওপর সমানভাবে পড়ছে না। সৌদি আরবের প্রায় ৩ কোটি ৫৩ লাখ মানুষের মধ্যে প্রবাসী/বিদেশি প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ, অর্থাৎ ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ ২০২৪ সালে শুধু মাদক অপরাধে কার্যকর ১২২টি মৃত্যুদণ্ডের ৯২টিই (৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ) বিদেশির।

২০২৫ সালে মাদক অপরাধে কার্যকর করা ২৪০টি মৃত্যুদণ্ডের অন্তত ১৮৮টি বিদেশির। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ১০৮ জনের ৫৯ জন (প্রায় ৫৪ শতাংশ) বিদেশি; বাংলাদেশ, সৌদি আরবসহ ১৭টি দেশের নাগরিক রয়েছেন তাঁদের মধ্যে।

জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি ২০২৩ সালের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হারে ‘উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি’ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড স্থগিতাদেশের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের দুই বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ারও সৌদি সরকারকে যৌথ চিঠিতে জানান, বিদেশিদের বিরুদ্ধে মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বৈষম্যমূলক প্রয়োগের আশঙ্কা তাঁদের আছে।

সাজা কার্যকরের অপেক্ষায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীরা

সৌদি আরবের কারাগার ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের অবস্থা বিশেষভাবে খারাপ। এর মধ্যে রয়েছে গাদাগাদি করে থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, চিকিৎসাসহ প্রশাসনিক অবহেলার মতো বিষয়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাবুক কারাগারের বন্দীদের রাখা হয়েছিল ঠাসাঠাসি, নোংরা ও বাতাস চলাচলহীন কক্ষে। ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন বন্দী অনশনও শুরু করেন। তাঁদের প্রতিবাদ ছিল পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বিধিনিষেধ এবং চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরের সময় হাতকড়া পরিয়ে খালি পায়ে হাঁটানোর মতো অবমাননাকর আচরণের বিরুদ্ধে।

সৌদি আইনে বন্দী বা তাঁর পরিবারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগাম খবর দেওয়ার স্পষ্ট বিধান নেই; মরদেহ হস্তান্তরেরও নিশ্চয়তা নেই। বাস্তবে পরিবারগুলো বড়জোর ২৪ ঘণ্টা আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা প্রিয়জনের কাছ থেকে এ বিষয়ে জানতে পারে। একই ধরনের অপরাধে দণ্ডিত বিদেশি বন্দীদের একসঙ্গে নির্জন ওয়ার্ডে সরিয়ে নেওয়াকে এই বন্দীরা আসন্ন মৃত্যুদণ্ডের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন।

২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া তিনজনের ক্ষেত্রে অ্যামনেস্টি দেখেছে, তাঁদের মরদেহ পরিবারকে ফেরত দেওয়া হয়নি, কবর কোথায় তা–ও জানানো হয়নি।

যাঁরা মনে করেন তাঁদের মামলা এখনো পর্যালোচনায় রয়েছে, তাঁদের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়েছে। জর্ডানের হুসেইন আবু আল-খায়েরকে সৌদি কারা কর্তৃপক্ষ পুনর্বিচারের প্রস্তুতি হিসেবে আইনজীবী নিয়োগ করতে বলেছিল। এর অল্প পরই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

২০২১ সালের জুনে আবু আল–খায়ের পরিবারকে জানিয়েছিলেন, তাঁকে বলা হয়েছে ‘সাজা স্থগিত হয়েছে, রাজকীয় নির্দেশে মাদক অপরাধে কিছু বন্দীকে ক্ষমার প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা পর্যালোচনা করছে’। তাঁর আশপাশের কয়েকজনের সাজা বদলালেও তিনি আটক থেকে যান। ২০২৩ সালের মার্চে, কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই, তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

এ রকম আশ্বাস আর আকস্মিক মৃত্যুদণ্ডের পরিণতি যে শুধু বন্দীদের ওপরই পড়ে, তা নয়। লেখার শুরুতে উল্লেখ করা চার মিসরীয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এটাই; যুবরাজের স্থগিতাদেশের আশ্বাসের পর হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড। এ মিথ্যা আশ্বাস বন্দী ও তাঁদের পরিবারের তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইএসওএইচআরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বন্দীরা জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুদণ্ডের আতঙ্কে বাস করছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাঁরা দেখেছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের কিছুদিনের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা রেখে এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে হঠাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের সুপারিশ ও আন্তর্জাতিক দায়

২০২৪ সালে জাতিসংঘের এক সর্বজনীন পর্যালোচনায় সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে অন্তত ৩৫টি সুপারিশ করা হয়। কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশের মাধ্যমে এ দণ্ড বিলোপের পথে এগোনোর আহ্বান জানায়। আর্জেন্টিনা ১৮ বছরের কম বয়সে করা অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছে।

অ্যামনেস্টি সৌদি আরবকে মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগে বৈষম্য নিয়ে অবিলম্বে স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত করতে বলেছে। নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের অধীন সৌদি আরব নির্যাতন প্রতিরোধ এবং নির্যাতনে আদায় করা স্বীকারোক্তি আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রহণ না করা নিশ্চিত করতে বাধ্য।

কিন্তু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের চিত্রে আবারও স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা বা প্রকাশ্যে ঘোষিত আইনি প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা না করেই সৌদি আরব দ্রুতগতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে চলেছে। এর মধ্যে নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন এবং শিশু অধিকার সনদের অধীনে থাকা প্রতিশ্রুতিও আছে। ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অন্যায্য বিচার, নির্যাতন, বৈষম্য ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও দেশটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশগুলোর তালিকায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হচ্ছে।

হুসেইন আবু আল-খায়েরের বোন অ্যামনেস্টিকে বলেছিলেন, ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ‘৯ বছরের নির্যাতনের পর’। এই নির্যাতন সইতে হয়েছে তাঁকে (আবু আল–খায়ের), তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে আর পুরো পরিবারকে। মরদেহ ফেরত না আসায় পরিবারের হাতে ছিল না শোক করার মতো কিছুই। আইন, আদালত আর ঘোষিত সংস্কারের এ দীর্ঘ হিসাব-নিকাশ শেষে যে প্রশ্ন থেকে যায়, তা আসলে এই—রেকর্ড মৃত্যুদণ্ডের এই দেশে একজন মানুষের শেষ খবরটুকুও কি সময়মতো পৌঁছায় তাঁর পরিবারের কাছে?

তথ্যসূত্র:

১. ডব্লিউআইপিও–এর নিবন্ধ—Law of Criminal Procedure (promulgated by Royal Decree No. M/39 of 28 Rajab 1422 (16 October 2001)), Saudi Arabia;

২. এমইএনএ (মিনা) রাইটস গ্রুপ, এএলকিউএসটি ফর হিউম্যান রাইটস এবং ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস (ইএসওএইচআর)—তিনটি মানবাধিকার সংস্থার যৌথভাবে তৈরি করা প্রতিবেদন—Death penalty in Saudi Arabia: joint submission to the Special Rapporteur on extrajudicial, summary or arbitrary executions, March 10, 2026;

৩. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন—Saudi Arabia: “If We Had Money and a Lawyer, Maybe My Brother Would Be Alive”: Saudi Arabia’s Execution Crisis, 7 July 2025 এবং

৪. ইএসওএইচআর–এর প্রতিবেদন—108 Saudi Arabia: Executions in the First Half of 2026.