অবিরাম বোমাবর্ষণের মধ্যে কীভাবে চলছে জীবন, তেহরানবাসীর ডায়েরিতে
যুদ্ধ চলছে মধ্যপ্রাচ্যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলার পর এ যুদ্ধের সূত্রপাত। অবিরাম হামলায় তেহরানের জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। ইরানের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কিছুদিন আগেও চলছিল বিক্ষোভ। সেই বিক্ষোভে অংশ নিয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন ‘ইলাহি’ (ছদ্মনাম)। মুক্তি পেয়ে এখন তেহরানেই রয়েছেন। যুদ্ধের মধ্যে নির্ঘুম এক রাতের বিবরণ দিয়েছেন তিনি।
দিনটি ১২ মার্চ, বৃহস্পতিবার। তখন ভোররাত ৫টা, ভয়াল একটি দিন কাটানোর পর ঘুম সবে আসছিল। ঠিক তখনই বেজে উঠল ফোনটা। আতঙ্ক গ্রাস করল আমাকে। এ সময় তো কোনো ফোন আসার কথা নয়। নিশ্চয়ই কেউ সাহায্য চাইছে, অথবা হয়তো কেউ নিঃসঙ্গ ও ভয়ার্ত।
অবসাদ নিয়েই ফোনটি ধরলাম। আমার ছোট বোন। সে কাঁদছে এবং কান্নার দমকে কথাও বলতে পারছে না। আমার হৃদয় ভেঙে খানখান হয়ে গেল। ওকে অনেক দিন ধরে দেখিনি। আমি যখন জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম, তখন সে অন্য শহরে। আমাদের মায়ের দেখাশোনা করার জন্য সেই শহরে চলে গিয়েছিল।
সে তার জন্মদিনে ফিরেও এসেছে। কিন্তু তারপরই শুরু হলো যুদ্ধ। আমরা তেহরানে দুটি ভিন্ন বাড়িতে রইলাম পড়ে, আলাদা হয়ে।
সে আমার থেকে অনেক ছোট, তবু আমার ছেলেকে সুরক্ষিত রাখার ভারটি সে নিয়েছিল, যাতে আমি কোথাও নিরাপদে থাকতে পারি এবং আবার গ্রেপ্তার এড়াতে পারি। আমি তাকে জানাই যে তার প্রতি আমি কতটা কৃতজ্ঞ। আমার মন এখন অশান্ত: আমি ধরেই নিই যে বাড়িতে ভয়ানক কিছু হয়েছে এবং সে তা বলতেও পারছে না।
আমি তাকে বলি যে এই মুহূর্তে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেঁচে থাকা। এমনকি যদি বাড়িও না থাকে, তবু।
ফোঁপাতে ফোঁপাতেই সে বলল, ‘আমাদের প্রতিবেশী বিস্ফোরণে আঘাত পেয়েছেন…এবং তিনি আর নেই।’
একমুহূর্তের জন্য ওই প্রতিবেশীর চেহারা আমার চোখে ভেসে ওঠে। আমার মতো, তিনিও সিগারেট খেতেন। নিশ্চয়ই তিনি ধূমপানের জন্য বারান্দায় ছিলেন। অথবা হয়তো অনেকের মতোই তিনি ড্রোন দেখার জন্য বেরিয়েছিলেন এবং বুঝতে চেয়েছিলেন, সেগুলো কোন দিকে উড়ে যাচ্ছে।
এমনও হতে পারে, ওই প্রতিবেশী সেখানে একটি দেশের জন্য, বিধ্বংস এক জনগোষ্ঠীর জন্য কাঁদতে গিয়েছিলেন। অথবা তিনি ভাবছিলেন, কোথায় পেট্রল পাওয়া যেতে পারে, যাতে তিনি তাঁর দুই সন্তানকে একটি বেশি সুরক্ষিত শহরে নিয়ে যেতে পারেন।
ইশ! যদি আমি এখন এক মরুভূমিতে থাকতাম, চিৎকার করে কাঁদতে পারতাম। এমন জায়গা, যেখানে আমি যত জোরে চাই, কাঁদতে পারি। শেষবার কেঁদেছিলাম জানুয়ারিতে প্রতিবাদকারীদের নির্বিচারে হত্যার পর। কেন আমরা বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানের মানুষের মতো কাঁদতে পারি না? কেন আমাদের এত বেদনা যে নতুন বেদনাও বুঝতে পারি না?
আর ঘুমাতে পারছি না। উঠে যাই সেখানে, যেখানে একটি ছোট গ্যাস বার্নার রেখেছি। একে আমি আমার রান্নাঘর বলি। আমার কফি প্রয়োজন। কিন্তু কফি এখন খুব ব্যয়বহুল, আর আমাকে টাকা বাঁচাতে হবে। সিগারেটও ব্যয়বহুল, কিন্তু আমি তবু ধূমপান করি: এক, দুই, পাঁচ...
গত সপ্তাহান্তে জ্বালানি ডিপোতে বোমা হামলার পর থেকে আমার বুক জ্বলছে, ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছি না। আমি একটি ইনহেলার কিনেছি, যা এখন আমার গলায় ঝুলে আছে।
সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে আরেকটি বিস্ফোরণ প্রকম্পিত করে তোলে। আমি চোখ রাখি জানালার বাইরে। সরকারের কিছু সমর্থক তাদের গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন, শোকসংগীত গাইছেন এবং বলছেন, ‘সবাইকে বলি, আমরা সবাই একসাথে আছি, স্বদেশবাসী।’
স্বদেশবাসী? তোমাদের বোকামি এই মাতৃভূমিকে ধ্বংস করেছে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম। আমরা সংগ্রাম করেছিলাম, যাতে এই দিনগুলো কোনো দিন না আসে। আমাদের বন্দী করা হয়েছিল, নির্যাতন করা হয়েছিল, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
আমি ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কেও ভাবছি। তিনি যদি ৫০ দিন আগে পদক্ষেপ নিতেন, তাহলে হয়তো ৩৫ হাজার মানুষ এখনো বেঁচে থাকতে পারত। এখন আমি আশঙ্কা করছি যে ইরান ধ্বংস হতে পারে, তবু ইসলামী প্রজাতন্ত্র টিকে থাকবে।
আমি এক নারীর কাছে কিছু ডাল ও অল্প কিছু অর্থ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি, যাঁর স্বামী জেলে এবং যাঁর একটি ছোট বাচ্চা আছে। এটাই আমাদের কাছে থাকা শেষ টাকা। কোথাও কোনো নগদ অর্থ নেই। জানি না কোনো দিন আমরা এই ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর মতো যথেষ্ট অর্থ পাব কি না।
সকাল আটটা বেজে গেছে। রাস্তায় আবার ভিড় জমেছে। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। আমি কিছু ক্লান্ত ও হতাশ মানুষকে দেখি। তারা দিনমজুর, রোজ এখানে আসে, কিন্তু রোজগারের কোনো পথ হয় না।
তেহরানে জীবন থেমে নেই; তবে তা অন্ধকারাচ্ছন্ন, তিক্ত।