ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলা
ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে পরিচিত খারগ দ্বীপে গতকাল শনিবার ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় দ্বীপের ৯০টির বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
ইরানের মোট জ্বালানি তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি প্রক্রিয়াজাত করা হয় খারগ দ্বীপে। তেহরানের দাবি, হামলায় তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি পুরোদমে চালু রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খারগ দ্বীপে হামলার একটি ভিডিও নিজের মালিকানধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ভদ্রতার খাতিরে আমি দ্বীপটির জ্বালানি তেল অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দিলে আমি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করব।’
ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরান গতকাল হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, খারগ দ্বীপের তেল স্থাপনায় হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেল স্থাপনাগুলোকে ‘ছাইয়ের স্তূপে’ পরিণত করা হবে।
খারগ দ্বীপে হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ এক নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে গতকাল ইরাকে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসেও হামলা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জাপানে অবস্থিত নিজেদের ঘাঁটি থেকে প্রায় আড়াই হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে।
গতকাল যুদ্ধের ১৫তম দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছে। ইরানও ইসরায়েলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টার খবর গতকাল নাকচ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
খারগ দ্বীপে ক্ষয়ক্ষতি
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলায় বিমানবন্দর ও রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভিডিওতে বিস্ফোরণ দৃশ্য ও কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকমের দাবি, হামলায় তারা দ্বীপটিতে থাকা ইরানের নৌ মাইন মজুত কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র বাংকারসহ ৯০টির বেশি সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে।
খারগ দ্বীপে হামলা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মার্ক কিমিট বলেন, ‘এর অর্থ হলো আমরা এই যুদ্ধে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছি।...এখন দেশটির অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করছি।’
দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ‘আস্তানা’গুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইরানের আইআরজিসি। তারা আবুধাবি ও দুবাইয়ের বন্দর এলাকার বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক ভ্যালি নাসর বলেন, ‘খারগ দ্বীপে হামলা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা হতে পারে।...তাই উভয় পক্ষ সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইরান সম্ভবত পিছু হটবে না। ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।’
ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরের এই প্রবাল দ্বীপটির আয়তন ২২ বর্গকিলোমিটার। ইরানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের মতে, তিনটি প্রধান তেলক্ষেত্র—আবোজার, ফোরুজান ও দোরুদ থেকে তেল এখানে আসে এবং প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে। এখান থেকে বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল বিদেশে যায়।
স্থল অভিযান কি শুরু হতে যাচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যে আরও ২ হাজার ৫০০ মেরিন সেনা ও একটি উভচর যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সদস্য ও উভচর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলিকে এই অঞ্চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটগুলো সাধারণত সমুদ্র থেকে স্থলে নেমে অভিযান চালাতে সক্ষম। তবে বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার, বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্যোগকালীন সহায়তা কার্যক্রমেও তারা পারদর্শী।
ওয়াশিংটন থেকে আল–জাজিরার প্রতিনিধি রোজিল্যান্ড জর্ডান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এই যুদ্ধের পরিধি বাড়াচ্ছে। তারা এখনই যুদ্ধ থামানোর পক্ষে নয়। তবে এই মোতায়েন মানে কোনো স্থল অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে, বিষয়টি তেমন নয়।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানের আরও কয়েকটি দ্বীপে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খারগ দ্বীপের আগেই তারা ইরানের কিশ দ্বীপে হামলা চালিয়েছিল। শিগগিরই আবু মুসা দ্বীপে হামলা চালানো হতে পারে।
হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে আরেক পোস্টে দাবি করেছেন, ‘ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের চেষ্টা করছে। এটা ঠেকাতে অনেক দেশ, বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে, যাতে এই জলপথ উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখা যায়।’
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। ইরান এই প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে গতকাল মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে একটি হেলিপ্যাডে দুটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। হামলার পর দূতাবাসের ভেতর থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেলেও হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ওই দূতাবাস বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের দ্রুত ইরাক ত্যাগ করা উচিত।
এই হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী ‘কাতায়েব হিজবুল্লাহর’ নিশানায় হামলা হয়েছে। এতে গোষ্ঠীটির একজন ‘গুরুত্বপূর্ণ নেতাসহ’ দুই সদস্য নিহত হন।
সৌদিতে ৫টি মার্কিন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং বিমান ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গত শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।
তবে ট্রাম্প গতকাল ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে দাবি করেছেন, সৌদি আরবে ইরানের হামলায় তাঁদের একটি বিমান সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেটি শিগগিরই উড়বে। অন্য চারটি বিমান সচল রয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট চারটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর ১৩ সদস্য নিহত ও অন্তত ১৫০ জন আহত হয়েছেন।
পাল্টাপাল্টি হামলা
ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইলাম প্রদেশের আইভান শহরে গতকাল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ছয় মাস বয়সী এক শিশুসহ একই পরিবারের ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির কারাজ, ইসফাহানসহ কয়েকটি শহরে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ৪০০ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইসফাহানে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪৩ হাজার বেসামরিক ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
গতকাল ইসরায়েলের আপার গ্যালিলি অঞ্চলে হামলায় বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হিজবুল্লাহর ছোড়া রকেটে এসব ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর আগে দেশটির মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে বেশ কিছু হামলা হয়েছে। দক্ষিণের নেগেভ মরুভূমির একটি গ্রামেও হামলায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। মধ্য ইসরায়েলের বেন গুরিয়েন বিমানবন্দরের কাছের শহর শোহামেও ক্ষয়ক্ষতির হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি এবং বাহরাইন ও কুয়েতের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর গতকাল ‘টানা কয়েক দফায়’ হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের নৌবাহিনী। এ হামলায় আবুধাবির আল-দাফরা এবং বাহরাইনের শেখ ইসা ঘাঁটির প্যাট্রিয়ট রাডার সিস্টেম, যুদ্ধবিমান ও জ্বালানি সংরক্ষণের ট্যাংক নিশানা করা হয়েছিল।
গতকাল জর্ডান জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে তারা ইরানের ছোড়া ৮৫টি ড্রোনের মধ্যে ৭৯টিই প্রতিহত করেছে। আমিরাত গতকাল ৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৩টি ড্রোন ধ্বংসের কথা জানিয়েছে।
লেবাননে নিহত বেড়ে ৮২৬
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে গতকাল ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১২ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বুর্জ কালাউইয়া শহরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওই হামলায় ১২ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হন। যুদ্ধ শুরু পর থেকে লেবাননে এই নিয়ে ২৬ জন চিকিৎসাকর্মী প্রাণ হারালেন।
২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৮২৬ ছাড়িয়েছে। গতকাল তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান অভিযোগ করেন, ইসরায়েল পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে এবং লেবাননে নতুন গণহত্যা সংগঠিত করতে যাচ্ছে।