ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্পের

  • ইরানের সেতু, কারখানা ও উপাসনালয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা।

  • ট্রাম্পের সময়সীমা শেষের আগেই বেড়েছে তেলের দাম। অস্থিতিশীল শেয়ারবাজার।

  • হরমুজ প্রণালি খুলতে নিরাপত্তা পরিষদে তোলা প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীনের ভেটো।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না উপাসনালয়ও। হামলায় বিধ্বস্ত ইহুদিদের একটি সিনাগগের ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ করছেন জরুরি বিভাগের কর্মীরা। গতকাল ইরানের রাজধানী তেহরানেছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি করতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বেসামরিক সেতু, রেল, কারখানা, এমনকি ধর্মীয় উপাসনালয়ও। এরই মধ্যে হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস’ করা হবে।

ট্রাম্পের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় (ইস্টার্ন টাইম) গতকাল মঙ্গলবার রাত আটটায়। বাংলাদেশের হিসাবে তা আজ বুধবার সকাল ছয়টা। এর আগেও একাধিকবার হুমকি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, সময়সীমার মধ্যে ইরান চুক্তি না করলে এবং হরমুজ খুলে না দিলে দেশটির সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র তথা বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হবে। ইরানে ‘নরক নামিয়ে’ আনা হবে।

যে চুক্তি কথা বলে ট্রাম্প সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন, তা নিয়ে কম কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে না। সবশেষ গত রোববার ওয়াশিংটন ও তেহরানের কাছে যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল পাকিস্তান। তবে কোনো পক্ষই তাতে সায় দেয়নি। এর কারণ হিসেবে গতকাল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, দুই পক্ষই আলোচনায় বসার পর্যায়ে ছিল, তখনই তেহরানে হামলা চালায় ইসরায়েল।

চুক্তি না হওয়া এবং সময়সীমা নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির মুখে বিনিয়োগকারীরাও যে শঙ্কিত, তা গতকাল বিশ্ববাজারের চিত্রে উঠে এসেছে। এদিন প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১১০ ডলারের ওপরে উঠেছে। দিনের শুরুতে কিছুটা ভালো অবস্থায় থাকার পর অস্থিরতা দেখা গেছে জাপানের শেয়ারবাজারের নিক্কেই-২২৫ সূচকে। সিঙ্গাপুরের স্ট্রেইটস টাইমস সূচকেও দশমিক ২২ শতাংশ পতন হয়েছে।

ইরানের সভ্যতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে ট্রাম্পের হুমকি ‘নিন্দনীয় ও বেআইনি’ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের অধ্যাপক মাইকেল বেকার। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, নির্বিচার ধ্বংসের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প এমন কথাবার্তা বলছেন, যা বড় মাত্রার যুদ্ধাপরাধের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। বেসামরিক জনগণের ওপর এমন হামলা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

‘ইরানিরা নিজেদের উৎসর্গ করতে প্রস্তুত’

এর আগে চুক্তি করতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে বেঁধে দেওয়া সময়সীমা একাধিকবার বাড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে গতকাল রাত আটটার সর্বশেষ সময়সীমা শেষ হওয়ার পাঁচ ঘণ্টা আগেও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর ঘোষণা আসেনি। এদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, মঙ্গলবার রাতে ইরানের সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো পুনরুদ্ধার করা যাবে না। ইরানে ৪৭ বছরের শোষণ, দুর্নীতি ও মৃত্যুর অবশেষে অবসান হবে।

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর একটি একটি ইরান বা পারস্য সভ্যতা। এ অঞ্চলে মানুষের বসবাস শুরু প্রায় আট হাজার বছর আগে। আখেমেনীয়, পার্থীয় ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের মাধ্যমে পারস্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। পারস্যে মুসলিম শাসনের অধীনে আসে সাত শতকে। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে ইরান। সেই শাসনব্যবস্থা এখনো চলমান।

ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সর্বশেষ সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সেই পুরো সভ্যতা ধ্বংস করতে ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর মধ্যে দেশটির কাশান শহরে একটি রেলসেতুতে হামলায় দুজন নিহত হন। ইসরায়েল জানিয়েছে, গতকাল ইরানের আটটি সেতুতে হামলা চালিয়েছে তারা। সেগুলো কাশানসহ তেহরান, কারাজ, তাবরিজ ও কোম শহরে অবস্থিত।

ইরানের সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ইরানের খোররামবাদ বিমানবন্দরে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পশ্চিম ইরানের শিরাজ শহরে একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাও ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়। যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালায় ইরানের তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপে। রাজধানী তেহরানের আকাশে যুদ্ধবিমান থেকে দফায় দফায় ফেলা হয় বোমা।

এমনই এক বোমার আঘাতে তেহরানে ধ্বংস হয়ে যায় ইহুদিদের উপাসনালয় রাফিনিয়া সিনাগগ। ইরানের পার্লামেন্টে দেশটির ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন হোমায়ুন সামেহ। সিনাগগ ধ্বংসের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘জায়নবাদীরা উৎসবের সময়ও আমাদের রেহাই দেয়নি। সিনাগগটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও ২৬ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। এরপরও ইরানিরা মাথা নোয়াবে না বলে উল্লেখ করেছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে গতকাল তিনি লেখেন, ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি ইরানি দেশকে রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘কালো দাগ’

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে, তার আঁচ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রেও। গতকালও দেশটিতে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে। ইরানের সরকার পতন থেকে শুরু করে দেশটির সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, হরমুজ প্রণালি চালুসহ যেসব লক্ষ্যের কথা ওয়াশিংটন বলেছিল, তার একটিও পূরণ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে জোর দিচ্ছিলেন ট্রাম্প নিজেই।

তবে কূটনীতির পথে না হেঁটে ইরানের বেসামরিক স্থাপনার দিকে নজর দেওয়ায় চটেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকেরাই। যেমন অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলি বলেছেন, ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘কালো দাগ’ হয়ে থাকবে। আর কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মার্ফি সরাসরি বলেছেন, ট্রাম্পের এমন পদক্ষেপ যুদ্ধাপরাধ।

যুদ্ধের রীতিনীতি নিয়ে জাতিসংঘের একটি সনদ রয়েছে। এটি জেনেভা সনদ নামে পরিচিত। এই সনদ অনুযায়ী যুদ্ধের সময় কোনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালালে যুদ্ধাপরাধ বলে গণ্য হবে। এ বিষয়ে ইঙ্গিত করে ইরানি রেড ক্রিসেন্ট গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, এদিন ইরানে ১৭টি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে। এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি যুদ্ধাপরাধ।

তবে কোনো সমালোচনা যেন কানে তুলতে রাজি নন ট্রাম্প। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা যদি যুদ্ধাপরাধ হয়, তা নিয়ে চিন্তিত নন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে হামলার হুমকি ইরানের

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর থেকে পাল্টা জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তবে ট্রাম্পের নতুন হুমকির পর ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও হামলা চালাতে পিছপা হবে না তারা।

এ হুমকির আগে গতকাল যুদ্ধের ৩৯তম দিনে ব্যাপক পাল্টা হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। ইসরায়েলের গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এদিন ইরানের হামলায় মধ্য ইসরায়েলের রশ হাইন, রামাত হাশারনসহ কয়েকটি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়। এদিন হামলায় নতুন করে ১৩৩ জন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে ইসরায়েল সরকার। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে নিহত হয়েছেন ২৬ জন।

গতকাল মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশেও হামলা হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরবের জুবাইল অঞ্চলে একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। জর্ডানের আকাবা শহরে বিস্ফোরণ হয়েছে। ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন। ইরানের কিশ দ্বীপের কাছে একটি জাহাজেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য।

‘অনড় ইরানে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প’

ট্রাম্পের মাথাব্যথার কারণ যে হরমুজ প্রণালি, সে-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবের ওপর গতকাল রাতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটি হয়। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো দেশ যদি বল প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলতে চায়, তাহলে জাতিসংঘের স্পষ্ট অনুমতি পাবে। তবে এ প্রস্তাব চীন ও রাশিয়ার ভেটোয় বাতিল হয়ে যায়। প্রস্তাবের পক্ষে ছিল ১১টি দেশ। ভোট দেয়নি ২টি দেশ।

এই প্রস্তাব বাতিল ইরানের পক্ষেই যায়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। যুদ্ধেও ইরানের ‘জয় হয়েছে’ বলে গতকাল এক্সে দাবি করেছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকারের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি।

এদিকে ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট আল-জাজিরাকে বলেছেন, তেহরান নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে যদি শর্ত পালনে ব্যর্থ হয়, তবে প্রেসিডেন্ট কী পদক্ষেপ নেবেন, তা একমাত্র তিনিই জানেন।

ইরানের অনড় অবস্থান ট্রাম্পকে মূলত ক্ষুব্ধ করছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব তেহরানের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ট্রাম্প চান ইরানিরা তাঁর হুমকি আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিক এবং নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করুক। কিন্তু যুদ্ধের শুরু থেকেই এমন কিছু হচ্ছে না। ফলে নিজের লক্ষ্যও পূরণ করতে পারছেন না ট্রাম্প। এটি তাঁকে আরও ক্ষুব্ধ করছে।