যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ থেকে সব মাইন সরিয়েছে—দাবি ট্রাম্পের, ইরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞায় ক্ষোভ চীনের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির সব মাইন মার্কিন নৌবাহিনী সরিয়ে ফেলেছে বা নিষ্ক্রিয় করেছে। বিশ্ববাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে নতুন করে মাইন স্থাপনকারী যেকোনো জাহাজ বা নৌযান তাৎক্ষণিকভাবে ও পদ্ধতিগত উপায়ে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
তবে ট্রাম্পের এ দাবির বিষয়ে ইরানের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রণালিটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রায়ই বলে থাকেন, ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। তবে যেসব নৌযান অনুমতি ছাড়া পার হওয়ার চেষ্টা করেছে, সেগুলোর ওপর গুলি চালিয়েছে ইরান।
সম্প্রতি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিল ইরান। প্রণালিটি পরিচালনার জন্য একটি ব্যবস্থা ঠিক করা ছিল এর উদ্দেশ্য। তবে এসব আলোচনা থেকে এখনো কোনো চুক্তি হয়নি। উল্টো গত সপ্তাহে ট্রাম্প তাঁর মিত্রদেশটিকে বোমা মারার হুমকি দিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে নতুন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়। এর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এ হরমুজ প্রণালি দিয়েই পার হতো।
প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি ইরান মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার পাল্টা জবাবও দিয়েছে। তারা ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটির ওপর হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধ শেষ করার জন্য আলোচনার সুবিধার্থে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি করা হয়েছিল, যা এখন ভেস্তে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে থেমে থেমে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।
এদিকে চলতি সপ্তাহে ইরানের ওপর একগুচ্ছ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, আর্থিকভাবে ইরানের সঙ্গে যুক্ত থাকা যেকোনো দেশকেও একঘরে করে দেওয়া হবে।
গত জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। এটি ছিল ১৪ দফার একটি প্রাথমিক চুক্তি। সেখানে হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ৬০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এরপর তেহরানের পরমাণু ইস্যুর সমাধানের বিষয়ে মূল আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
এ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি একটি নতুন করিডরের রূপরেখা ও যৌথভাবে মাইন অপসারণের অভিযান নিয়ে কথা হয়েছে।আব্বাস আরাগচি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
তবে সেই সময়সীমা এখন শেষ হয়ে গেছে এবং আলোচনাও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ট্রাম্পের বিশ্বাস, এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে।
১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশির ভাগ সময় ইরান নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেছেন, বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞার জন্য তেহরান ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আরেকটি পরাজয়’ ঘটবে।
তবে ইরান যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের বাণিজ্য বন্ধ রাখার জন্য কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। গতকাল মঙ্গলবার তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এ ‘বেআইনি একতরফা নিষেধাজ্ঞার’ তীব্র বিরোধিতা করছে তারা। নিজেদের অধিকার রক্ষায় চীন ‘সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে বলেও জানিয়েছে।
ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। গতকাল মঙ্গলবার তারা বলেছে, (ইরানের বিরুদ্ধে) যুক্তরাষ্ট্রের ‘বেআইনি একতরফা নিষেধাজ্ঞার’ তীব্র বিরোধিতা করছে তারা। নিজেদের অধিকার রক্ষায় চীন ‘সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে বলেও জানিয়েছে।
আগামী মাসে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে একটি পরিকল্পিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ওই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা এল।
বেইজিংয়ের সম্ভাব্য পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে ওয়াশিংটন সতর্ক থাকতে পারে। কারণ, বিশ্বের বেশির ভাগ বিরল খনিজ ও অন্যান্য অতি জরুরি খনিজ প্রক্রিয়াজাত করে চীন। এসব খনিজ উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আগের বাণিজ্য আলোচনার অংশ হিসেবে বেইজিং এরই মধ্যে বিরল খনিজ রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে।
অন্যদিকে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য বেশির ভাগ দেশ এর বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, এ পথ আন্তর্জাতিক জলসীমার অংশ। তাই যুদ্ধের আগে যেমন বাধাহীনভাবে জাহাজ চলাচল করত, তা বজায় থাকা উচিত।
সম্প্রতি সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিল ইরান। প্রণালিটি পরিচালনার জন্য একটি ব্যবস্থা ঠিক করা ছিল এর উদ্দেশ্য। তবে এসব আলোচনা থেকে এখনো কোনো চুক্তি হয়নি। উল্টো গত সপ্তাহে ট্রাম্প তাঁর মিত্রদেশটিকে বোমা মারার হুমকি দিয়েছেন। বলেছেন, এ ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের নিজস্ব আলোচনার ‘পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে’ এমন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি গতকাল তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দেখা করেন। এরপর তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে খুব শিগগির একটি অস্থায়ী জাহাজ চলাচলের করিডর স্থাপনের ঘোষণা দেবে তাঁর দেশ ও ইরান। তিনি এমনটাই আশা করছেন।
এক বিবৃতিতে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, নিরাপদ নৌ চলাচল পরিস্থিতি ফেরাতে ‘বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা’ নেওয়ার আশা করছেন তিনি। বলেন, যথাসময়ে এ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনা বিষয়ে এবং চলতি সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান আসবে।
এক বিবৃতিতে এ বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আরাগচি। তিনি বলেন, পাকিস্তান ও ওমানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় ‘আঞ্চলিক সমাধান’ নিয়ে কথা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানান, এ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি একটি নতুন করিডরের রূপরেখা ও যৌথভাবে মাইন অপসারণের অভিযান নিয়েও কথা হয়েছে।
বৈঠকের পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কথা বলেন দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি। তিনি বলেন, উপসাগরে প্রবেশের পথটি হবে ‘ইরানের জলসীমা দিয়ে এবং বের হওয়ার পথটি হবে ওমানের জলসীমা দিয়ে। তবে জাহাজগুলো উভয় রুটেই ইরানের জলসীমা হয়ে পার হবে’।
কাজেম গারিবাবাদি আরও বলেন, জলপথটির দক্ষিণ করিডর এই কাঠামোর আওতায় ‘বন্ধ’ থাকবে। এই রুট ওমান উপকূলের কাছে অবস্থিত এবং যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ কোম্পানিগুলোকে এটি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এ বৈঠকের মানে এটি নয় যে ‘আগামীকাল থেকেই প্রণালিটি খুলে দেওয়া হবে’। তিনি বলেন, কোনো সামরিক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হতে দেওয়া হবে না। শুধু বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এ পথে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।
গারিবাবাদি এই রুটকে ‘অস্থায়ী’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, আগের নৌ চলাচল পরিকল্পনার বদলে একটি নতুন স্থায়ী রুট ঠিক করতে ইরান ও ওমান ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করবে। তিনি বলেন, ইরানের দাবিগুলো মানা না হলে প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়া হবে।