ইরান যুদ্ধ কীভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরাকের সম্পর্কে ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছে

দক্ষিণ ইরাকে মিলিশিয়া গোষ্ঠী কাতায়েব হিজবুল্লাহর কয়েকজন সদস্যছবি: রয়টার্স

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসনের প্রভাবে ইরাকের মরুভূমি এখন দ্বিতীয় রণাঙ্গনে পরিণত হয়েছে। ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাকের মাটি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। বাগদাদ সরকার এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।

পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় ইরাক গত কয়েক বছরে আরববিশ্বের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের যে চেষ্টা চালিয়েছিল, তা এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে। গত বুধবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডান এক যৌথ বিবৃতিতে তাদের অবকাঠামোতে এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

ছয়টি দেশ এই আন্তসীমান্ত হামলাকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে বর্ণনা করেছে। বিবৃতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৮১৭ নম্বর প্রস্তাবের উল্লেখ করে বলা হয়, ইরানকে অবিলম্বে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর সব ধরনের হামলা বন্ধ করতে হবে।

এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় আরব দেশগুলো সরাসরি ইরাক সরকারকেই দায়ী করেছে। সেই সঙ্গে জাতিসংঘের চার্টারের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকারের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে দেশগুলো।

বাগদাদ সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আশ্বাস দিলেও বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেন, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার কারণে ইরাকের সার্বভৌমত্ব ক্রমেই ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

আঞ্চলিকভাবে কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কায় গত বৃহস্পতিবার ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বাগদাদ বলেছে, প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তারই ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’।

ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশ বা জর্ডানে হামলার বিষয়টি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বাগদাদ। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা সংবিধান ও আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে ইরাক সরকার জানিয়েছে, হামলার বিষয়ে যেকোনো তথ্য বা প্রমাণ গ্রহণ করতে তারা ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’, যাতে এর বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

আরও পড়ুন

হিসাব কষা ছায়া যুদ্ধ

বাগদাদ সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আশ্বাস দিলেও বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেন, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার কারণে ইরাকের সার্বভৌমত্ব ক্রমেই ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

ইরাকের পশ্চিম আনবার প্রদেশে বিমান হামলায় নিহত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ)-এর সদস্যদের কফিন বহন করছেন তাঁদের সহযোদ্ধারা। গত মার্চে বাগদাদে তাঁদের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময় ছবিটি তোলা হয়
ছবি: রয়টার্স

ইরাকি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মাজেদ আল-কায়সি বলেন, ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর ছত্রচ্ছায়ায় থাকা গোষ্ঠীগুলো উপসাগরীয় দেশ এবং জর্ডানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিদিন গড়ে ২১ থেকে ৩১টি হামলা চালাচ্ছে।

আল-কায়সির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তারা সম্মিলিতভাবে ৪৫৪টির বেশি অভিযান চালিয়েছে। এসব হামলায় মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

আল-কায়সির পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বাগদাদের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অস্বস্তি ঢাকার চেষ্টা, কোনো কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান দাবি করে আসছে, তারা শুধু এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর অভিযোগ, জ্বালানিকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও হোটেলের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে বারবার হামলা চালানো হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং সরাসরি আইনি দায়বদ্ধতা থেকে বাঁচতে ইরান সুকৌশলে ইরাকি গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করছে।

কাতারের দোহাভিত্তিক ‘মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর পরিচালক খালেদ আল-জাবের মনে করেন, সরাসরি রাষ্ট্রীয় হামলার পরিবর্তে প্রক্সি বা ছায়া শক্তি দিয়ে এই হামলা চালানো একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।

খালেদ আল-জাবের বলেন, ইরান সংঘাত থেকে পিছু হটছে না; বরং তারা রাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই কৌশলের ফলে আড়ালে থেকে প্রতিপক্ষকে আঘাত করা সহজ হয় এবং হামলার দায়বদ্ধতা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করা যায়। এর মাধ্যমে ইরান মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোর ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

ক্ষুণ্ন হচ্ছে ইরাকের সার্বভৌমত্ব

নিজস্ব ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশীদের ওপর হামলা ঠেকাতে না পারায় ইরাককে এখন অভ্যন্তরীণ ও কূটনৈতিকভাবে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।

কুয়েতের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আহমেদ আবদেল মহসেন আল-মুলাইফি যুক্তি দেখিয়েছেন, যেসব দেশ আইনের ঊর্ধ্বে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়, তাদের পুরোপুরি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা যায় না।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা শিল্প অঞ্চলে বিস্ফোরণের পর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখছেন বিদেশি শ্রমিকেরা। ৩ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

আল–মুলাইফি সতর্ক করে বলেন, ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে প্রক্সি বা ছায়া বাহিনীর ওপর তেহরানের নির্ভরতা মূলত নিজেদের ওপর থেকে চাপ কমানোর একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। এর মাধ্যমে ইরান প্রকৃতপক্ষে আরব দেশগুলোকে তাদের ভূরাজনৈতিক লড়াইয়ের ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

আল-মুলাইফি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানে স্থল অভিযানের হুমকি বাস্তবায়ন করেন, তবে তেহরান কুয়েত ও সৌদি আরবের সীমান্তে নতুন ও বিপজ্জনক যুদ্ধের ফ্রন্ট খোলার জন্য তাদের ইরাকি প্রক্সিদের সক্রিয় করে তুলতে পারে।

ইরাকের আকাশ চিরে যখন একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজধানীর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে, তখন বাগদাদ থেকে দেওয়া কূটনৈতিক আশ্বাসগুলো বাস্তবতার সামনে ক্রমেই অন্তঃসারশূন্য মনে হচ্ছে। প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার আগেই নিজের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য ইরাকের হাতে এখন সময় অত্যন্ত সীমিত।