ইরানে খামেনির দাফনের দিন বিস্ফোরণের দায় নিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র, তাহলে হামলার জন্য দায়ী কে

ইরানের বুশেহর প্রদেশের বানুদে নৌকা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। বুশেহর পরমাণুকেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় এ বিস্ফোরণ হয়। ৯ জুলাই ২০২৬, বুশেহর প্রদেশ।ছবি: রয়টার্স

ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে গতকাল বৃহস্পতিবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। অন্যদিকে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা নতুন এ হামলায় তাঁদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন।

ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ রাতের দিকে বুশেহর ও এর কাছের শহর চোগাদাকের আশপাশের এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বুশেহর শহরে ইরানের একটি পারমাণবিক কেন্দ্র রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দক্ষিণের শহর কোনারকেও আরও তিনটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

এর কিছুক্ষণ পরই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড আল-জাজিরাকে জানায়, গত কয়েক ঘণ্টায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে কোনো ধরনের হামলা চালায়নি।

গত মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে আসছে। পাশাপাশি তেহরান কাতার, বাহরাইন, কুয়েতসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও আঘাত হেনেছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে জুনের মাঝামাঝিতে হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বিস্ফোরণের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে মেহর নিউজ এজেন্সি বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি।

বুশেহরের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক ডেপুটি গভর্নর এহসান জাহানিয়ান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইরনাকে বলেন, শহরের বিস্ফোরণটি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কারণে হয়েছিল।

জাহানিয়ান আরও জানান, বুশেহরের উপকণ্ঠে একটি সামরিক ঘাঁটিতে একটি ‘প্রজেক্টাইল’ বা ক্ষেপণাস্ত্রজাতীয় বস্তু আঘাত হেনেছে।

যুদ্ধ ‘শেষ হয়নি’

ইরান থেকে খবর আসার পরপরই ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুযায়ী, ‘ফোনে আলাপকালে তাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘পারস্য উপসাগরে মার্কিন পদক্ষেপের’ সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ইসরায়েলের হাতজেরিম বিমানঘাঁটিতে বিমানবাহিনীর স্নাতক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘(ইরান) যুদ্ধ শেষ হয়নি। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’

দৈনিক ইয়েদিওথ আহরোনথের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুকে বলতে শোনা যায়, ‘আকাশসীমায় আধিপত্য বজায় রাখা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তানীতির একটি মৌলিক স্তম্ভ। অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ‘শেষ হয়ে যায়নি’।

মধ্যপ্রাচ্যে নৃশংশতা ছড়ানো ইসরায়েলি বাহিনীর প্রধান তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের টেবিলে নতুন পরিকল্পনা রয়েছে। বড় ধরনের অভিযান এখনো আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে বলে মনে হচ্ছে। প্রস্তুত থাকুন।’

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে ইরানে হামলা চালাতে ইসরায়েল প্রস্তুত।

নানা সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, ‘আকাশসীমার আধিপত্য পুনরুদ্ধার করতে, ইরানে আবার আঘাত হানতে এবং হুমকি দূর করতে সেনাবাহিনী যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত। তারা সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। প্রয়োজনে তৃতীয়বারের মতো আঘাত হানতেও আমরা প্রস্তুত।’

ওমানের মুসান্দাম থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের মতবিরোধের বড় কেন্দ্রে রয়েছে এই প্রণালি। ৮ জুলাই ২০২৬, হরমুজ প্রণালি
ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধ

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পরই মূলত এই পাল্টাপাল্টি হামলার নতুন পর্ব শুরু হয়। কাতার ও সৌদি আরবের জাহাজসহ বেশ কিছু নৌযান যখন ওমান সীমান্তের কাছাকাছি রুট দিয়ে এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করছিল, তখন সেগুলোর ওপর হামলা চালানো হয়।

ইরান বলছে, সব জাহাজকে ইরানি উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে যেতে হবে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যরা যৌথ এক বিবৃতি দিয়ে জাহাজ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ডে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

এ বিরোধের মূলে রয়েছে, কীভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে ভিন্ন দুই দৃষ্টিভঙ্গি। ট্রাম্প চান, আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক হোক। অন্যদিকে ইরান সেখানে জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে—এমন যেকোনো পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করছে।

জাহাজে হামলার ঘটনার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ট্রাম্প ইরানি নেতৃত্বকে ‘আবর্জনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সমঝোতা স্মারক ‘শেষ’। তবে কোনো পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এটি থেকে পিছু হটেনি।

ট্রাম্প আরও যোগ করেছেন, তিনি আপাতত শান্তি আলোচনা চলতে দিতে পারেন। কিন্তু তাঁর হুমকিমূলক বক্তব্যে পুরো প্রক্রিয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন ইরানের তেল রপ্তানির ওপর দেওয়া ছাড়ও প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

যদিও যুদ্ধবিরতির মধ্যে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলা এটিই প্রথম নয়। আগেও এমনটা ঘটেছে। তবে আশঙ্কা বাড়ছে, উভয় দেশই হামলা জোরদার করতে পারে, যা এই অঞ্চলকে আবার বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যাবে।

এমন এক সময়ে এ পরিস্থিতি তৈরি হলো, যখন আলোচকদের সঙ্গে কারিগরি আলোচনা স্থগিত রাখা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রথম দিনে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর দাফনপ্রক্রিয়ার জন্য এ স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগামী সোমবার আলোচনা আবার শুরু হবে কি না, তা সাম্প্রতিক হামলার পর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।