ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতির ওপর ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে দেশটির সরকারি বাহিনী। গত কয়েক দিনে এসব হামলায় হাজারো হুতি যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন বলে দাবি সৌদি আরব সমর্থিত বাহিনীটির। পাশাপাশি হুতিদের আরও কোণঠাসা করতে বড় অভিযান শুরুর পরিকল্পনা করছে রিয়াদ। ইরানপন্থী এই গোষ্ঠীকে পরাস্ত করতে এরই মধ্যে মিত্রদের কাছ থেকে সহায়তা পাচ্ছে দেশটি।
ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে গত জুলাইয়ে নতুন করে সৌদি–হুতি সংঘাত শুরু হয়। দুই পক্ষই একে অপরের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এ ছাড়া ইয়েমেনের আরও অঞ্চল দখল করে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল–মানদেব প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে হুতিরা। এই প্রণালি মুক্ত করতে হুতিদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি ও ইয়েমেনি বাহিনী।
এ সংঘাতের মধ্যে গত শুক্রবার ইয়েমেনি বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগের ২৪ ঘণ্টায় হুতিদের ওপর ৪৭৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে তারা। এতে ১ হাজার ৫৪০ হুতি যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন। গোষ্ঠীটির ২১৬টি সামরিক যান ও সক্ষমতাও ধ্বংস করা হয়েছে। পরে গতকাল শনিবার আবার দেশটির তাইজ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় হুতিদের ওপর ৭১টি হামলার কথা জানায় ইয়েমেনি বাহিনী।
ইয়েমেনে এমন লড়াইয়ের মধ্যে সৌদি আরবেও হামলার ঘটনা ঘটছে। গতকাল সৌদি সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আসির অঞ্চলের আহাদ রাফিদাহ এলাকায় হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশটির নাজরান শহরের একটি স্কুলে হুতিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। তবে এতে কোনো হতাহত হয়েছে কি না, তা জানায়নি তারা।
এ সংঘাতে সবচেয়ে সংকটে পড়েছেন ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন দেশটির লাখো বাসিন্দা। এমন পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের প্রতি চার পরিবারের তিনটিই ক্ষুধার্ত অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। সংস্থাটি বলেছে, ইয়েমেন সরকারনিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোয় প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবার খাবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
মোতায়েন করা হবে ১ লাখ সেনা
ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযানের পরিকল্পনার তথ্য রয়টার্সকে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোর একাধিক সূত্র। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহে এ অভিযান শুরু করা হতে পারে। স্থলে এই অভিযান চালাবে ইয়েমেনি বাহিনী। এ লক্ষ্যে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে। অভিযানে বিমান হামলা চালিয়ে সহায়তা দেবে সৌদি।
সৌদি আরবের এই অভিযানের প্রধান একটি লক্ষ্য হলো গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূলজুড়ে দখল করা ইয়েমেনি অঞ্চলগুলো উদ্ধার করা। ইয়েমেনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের বাব আল–মানদেব প্রণালি ঘিরে এই অভিযান চালানো হতে পারে। আবার আল–বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল–জাওফ অঞ্চলেও বড় পরিসরে হামলা চালানো হতে পারে।
এর আগে ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছিল সৌদি আরব। ২০২২ সালে সেই সংঘাত শেষ হয়। সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি রয়টার্সকে বলেন, সৌদি আরবের সম্ভাব্য অভিযানের ব্যাপ্তি হয়তো ২০১৫ সালের মতো অত ব্যাপক হবে না। নতুন অভিযানের লক্ষ্য হতে পারে শুধু বাব আল–মানদেব দিয়ে নৌ চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
পাশে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, পাকিস্তান
হুতিদের সঙ্গে লড়াইয়ে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি মিত্রদেশকে পাশে পেয়েছে সৌদি আরব। ওয়াশিংটনের একজন কূটনীতিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে হুতিদের ওপর বিমান হামলা চালানোর জন্য গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে রিয়াদকে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশও সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে।
গত মাসে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছিল সৌদি আরব। পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘাত শুরুর পর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, হালকা গোলা, ড্রোন, ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ নানা সরঞ্জামবোঝাই চারটি কার্গো উড়োজাহাজ ইয়েমেনের বন্দর শহর এডেনে পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ। শহরটি সৌদি–সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পাকিস্তানের আরেক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের স্থলসীমা রক্ষায় সহায়তার জন্য দেশটিতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। এই সেনারা চলতি বছরের শুরু থেকেই সৌদি আরবে পৌঁছানো শুরু করেন। হুতিদের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পরও দেশটিতে পাকিস্তানি সেনা পাঠানো হয়েছে। তবে ইয়েমেনে কোনো পাকিস্তানি সেনা পাঠানো হবে না।
এদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তুরস্ক থেকে কেনা ড্রোনও হুতিদের ওপর ব্যবহার করছে রিয়াদ। সেগুলো জুলাইয়ে সংঘাত শুরু আগে কেনা হয়েছিল। পাশাপাশি ফ্রান্স থেকেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, লোহিত সাগরে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইয়ানবু বন্দর রক্ষায় ফরাসি সেনাসদস্য ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানো হবে। চলমান সংঘাতের সময় এই বন্দর হামলার শিকার হয়েছে।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবির ভাষ্যমতে, মিত্রদের সহায়তা পেলেও হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে ইয়েমেনের স্থলবাহিনীর ওপর। এখন পর্যন্ত স্থলবাহিনী নিজেদের অবস্থান রক্ষায় জোর দিয়েছে। তবে সম্ভাব্য অভিযানে তারা আক্রমণাত্মক হবে। অভিযানের ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে তাদের সক্ষমতা ও দক্ষতার ওপর।