কূটনীতিতে জোর ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের

  • মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

  • হরমুজ প্রণালি নিয়ে শিগগিরই একটি চুক্তির আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

শিগগিরই হরমুজ প্রণালি ঘিরে একটি চুক্তির আশা করছে ইরানিরা। দেশটির বিভিন্ন স্থানে টাঙানো হয়েছে বিলবোর্ড। এমন একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন নারীরা। গতকাল তেহরানের ভ্যালিয়াসর চত্বরেছবি: এএফপি

হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন এক সূত্র। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথটি আবার উন্মুক্ত হতে পারে এবং প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই অস্থিরতার অবসান ঘটতে পারে।

বর্তমানে ওমান ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা চলছে। ওমানের ভৌগোলিক অবস্থান প্রণালিটির ঠিক বিপরীত পাশে হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা শুক্রবার বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমান ও ইরানের আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে এবং আমরা শিগগিরই একটি চুক্তির আশা করছি। কোনো ধরনের বাধা ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার চুক্তি ঘোষিত হওয়া মাত্রই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে।’ তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলো ইরানের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর আগে বিশ্বজুড়ে তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগই এই প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হতো। তবে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়, ওই পথে জাহাজ চলাচলের জন্য শুল্ক দাবি করে এবং অনুমোদন ছাড়া ওই পথে আসা জাহাজে হামলা চালায়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়।

সংঘাত শুরুর পর থেকে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডনক) ১৫টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। এসব হামলায় তাদের অন্তত একজন ক্রু নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন।

তিন দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি

ইরানের পক্ষ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সৌদির পবিত্র নগরী মক্কায় শুক্রবার একটি ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। এই তিন দেশই মার্কিন মিত্র ও সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।

চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সদস্য তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা তিন দেশের ওপরই আক্রমণ বলে গণ্য হবে এবং যৌথভাবে তা প্রতিরোধ করা হবে। আঙ্কারার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই চুক্তি নির্দিষ্ট কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি একটি রক্ষাকবচ। তবু শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের সঙ্গে চলতি উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন বিশ্ব বিশ্লেষকেরা।

অন্যদিকে ইসরায়েল ও ইরান–সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধেও জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে ওয়াশিংটন। দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অস্ত্রসংবরণ নিশ্চিত করতে এবং চুক্তি বাস্তবায়নে কোন কোন দেশ সেনা পাঠাবে, সে–সংক্রান্ত একটি খসড়া তালিকায় ইসরায়েল ও লেবানন একমত হয়েছে। শিগগিরই সেই তালিকা থেকে চূড়ান্ত দেশ বেছে নেবে যুক্তরাষ্ট্র।

কূটনীতির পক্ষে ইরানি প্রেসিডেন্ট

গত জুনে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে আর কোনো উচ্চপর্যায়ের প্রত্যক্ষ বৈঠক হয়নি। তবে ইরানের ভেতরেই যুক্তরাষ্ট্রমুখী এই কূটনীতি নিয়ে কট্টরপন্থীদের তোপের মুখে পড়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

কট্টরপন্থীদের সমালোচনার জবাবে শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, কিন্তু তারা কি যুদ্ধ করছে? চীন তার নিজের কাজ করে যাচ্ছে এবং দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। যখন আলোচনার মাধ্যমে আমরা আমাদের অধিকার আদায় করতে পারি, তখন কেন আমরা তা করব না?’

পেজেশকিয়ান আরও দাবি করেন, দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশই সংঘাত থামিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পক্ষে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মতপার্থক্যের কারণে শান্তিপ্রক্রিয়া কিছুটা বাধাগ্রস্ত হলেও সামরিক পথ ছেড়ে কূটনীতির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির সংকট সমাধানের পথেই আপাতত এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।