‘কিছুই স্বাভাবিক নেই’, ইরানের যুদ্ধজীবন নিয়ে দিনলিপিতে আর কী লিখলেন প্রেসিডেন্টের ছেলে
যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এক ইরানির দিনলিপি (ডায়েরি) লেখা, কিংবা দাদির ওপর যুদ্ধের প্রভাব দেখে চোখের পানি ফেলার বিষয়টি হয়তো তেমন অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, যদি না সেই দিনলিপির লেখক হন প্রেসিডেন্টের ছেলে।
বাবা মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রতি অটুট আনুগত্যের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউসেফ পেজেশকিয়ানের প্রতিদিনের ভাবনা, যুদ্ধ পরিস্থিতির অগ্রগতি, সাধারণ ইরানিদের ওপর এর প্রভাব এবং কীভাবে এই লড়াইকে আরও কার্যকর করা যায়—তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সাবেক হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাঁর সঙ্গে ইউসেফ পেজেশকিয়ানের দেখা হয়নি।
৪৫ বছর বয়সী পদার্থবিজ্ঞানের এই সহকারী অধ্যাপক রাষ্ট্রের কোনো গোপন তথ্য ফাঁস করেন না। তিনি বলেন, তাঁর কাছে এমন কোনো তথ্য নেই। এমনকি অন্যদের চেয়ে ৪৮ ঘণ্টা আগে কোনো তথ্য জানার যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। এর বদলে তিনি টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই খবর শোনেন। তবে ইরানের চরম সেন্সরশিপের মধ্যেও এসবের সঙ্গে পরিচিত ইউসেফ তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সরকারপক্ষের সমর্থকদের প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল আশা ও আশঙ্কার চিত্রগুলো তুলে ধরছেন।
দিনলিপির এক জায়গায় ইউসেফ লিখেছেন, ‘দুপুরবেলা ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শোনা গেল, আর তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। তেহরানের আবহাওয়া মনোরম, অনেকটা বসন্তের মতো হয়ে উঠেছিল। ইস! আমার যদি একটা ক্যামেরা থাকত, সুন্দর এই শহরের দৃশ্যগুলোর ছবি তুলে রাখতাম। ইস! যদি কোনো যুদ্ধ না থাকত, আর আমি আমার স্ত্রী-সন্তানদের শহরের রাস্তায় হাঁটতে নিতে পারতাম।’
ইরান সরকারের আরোপিত ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং সেন্সরড সংবাদ নিয়ে ইউসেফ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর যারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছিল, সেসব দেশের কাছে তাঁর বাবার ক্ষমা চাওয়ার বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
ফাঁকা একটি পার্কে এক বন্ধুর সঙ্গে প্রেসিডেন্টের ছেলে কথা হয়। সেই বন্ধু জানাচ্ছিলেন, ‘কয়েক রাত আগে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন, তাঁদের বাড়ির কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে। পরের দিন সে বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সন্তানদের তাঁদের নানির বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। গতকাল তাঁর স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তাঁদের বাড়িটা ধ্বংস হয়ে গেছে।’
ইউসেফ পেজেশকিয়ান লিখেছেন, ‘গল্পটা বলার সময় তাঁর হাত কাঁপছিল। আমি বললাম, “আগামীকাল তোমার স্বপ্নকে জিজ্ঞেস করো, এই যুদ্ধের পরিণতি কী হবে।” আমরা দুজনই হেসে উঠলাম। দুশ্চিন্তার মধ্যেও মানুষ হাসার একটা অজুহাত খুঁজে নেয়।’
ইউসেফ যুদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টিও তুলে ধরেন, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিতর্কগুলোরই প্রতিফলন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হলো, আমরা আর কত দিন লড়ব? চিরকাল? ইসরায়েলের সম্পূর্ণ ধ্বংস ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার পর্যন্ত? ইরানের সম্পূর্ণ ধ্বংস বা আত্মসমর্পণ পর্যন্ত? আমাদের যুদ্ধ শেষের দৃশ্যপটগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। কোন দৃশ্যপটটি ঘটার আশঙ্কা বেশি? কোনটি আমাদের জন্য কাঙ্ক্ষিত?’
আরেক জায়গায় প্রেসিডেন্টপুত্র লিখেছেন, ‘সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তথ্যের প্রয়োজন।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের অস্ত্র সরবরাহের সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হবে। ১. আমাদের কাছে মজুত থাকা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে কত মাস যুদ্ধ চালানো সম্ভব? ২ শত্রু নিজেদের যুদ্ধের জন্য কত মাস প্রস্তুত করেছে? অন্যভাবে বললে, আমাদের টিকে থাকার ক্ষমতা বেশি হবে নাকি শত্রুর?’
ইরানের নেতারা সঠিক পথেই আছেন বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন ইউসেফ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘কোন পক্ষ মিথ্যা বলছে? ইরান কি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চেয়েছিল? ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে চেয়েছিল? সরকার কি ৪০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে?’ (এখানে সম্ভবত জানুয়ারি মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে শুরু করে ৩৫ হাজারের বেশি বলে ধারণা করা হয়)। ‘তাহলে, যখন এক পক্ষ ক্রমাগত মিথ্যা বলছে, তখন কেন তাদের বিশ্বাস করব?’
ইউসেফ আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, আমাদের ত্রুটি আছে। আমরা ভুল করেছি। আমরা ভুলের ঊর্ধ্বে নই। কিন্তু আমাদের ভুলগুলো এমন নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধকে বৈধতা দেবে বা আমাদের দোষী সাব্যস্ত করবে। আমি নিশ্চিত করে বলছি, আল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেই।’
দিনলিপি লেখা যে কঠিন, তা স্বীকার করেন ইউসেফ। লিখেছেন, ‘মাঝে মাঝে আমি যেসব শব্দ বা ভাবনা প্রকাশ করতে চাই, সেগুলো মশার মতো মাথার চারপাশে ঘোরে। যখনই সেগুলো ধরার জন্য হাত বাড়াই, উড়ে যায়। এই ব্যাপারটাই লেখালেখিকে খুব ক্লান্তিকর করে তোলে।’
সবার মতোই প্রেসিডেন্টের ছেলে খবর পড়েন, কখনো কখনো গুজবও শোনেন। তিনি লিখেছেন, ‘খবরে বলছে, তারা খারগ দ্বীপে আঘাত হেনেছে। তবে সেটা শুধু সামরিক স্থাপনায়। তারা হুমকি দিতে চেয়েছিল, তারা আঘাত হানতে পারে। হ্যাঁ, তারা আঘাত হানতে পারে। এরপর ইরান অন্য জায়গায় আঘাত করবে। তারপর তারা সংঘাতের মাত্রা উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং আমরাও তাদের সঙ্গে সংঘাতের মাত্রা বাড়াচ্ছি। প্রশ্ন হলো, উত্তেজনা আর কত দূর গড়ানো সম্ভব?’
কখনো কখনো খবর ইউসেফকে নাড়িয়ে দেয়। তিনি লিখেছেন, ‘তিনটার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলী লারিজানি, তাঁর ছেলে, কয়েকজন সহযোগী এবং বাসিজ কমান্ডারের শহীদ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। আমি সত্যিই এটি বিশ্বাস করতে চাইনি। শত্রুকে কিছুতেই আরেকটি সফল হত্যাকাণ্ড চালাতে দেওয়া যাবে না। আমরা যদি ইহুদিবাদীদের এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে না পারি, তবে আমরা পরাজিত হব।’
ইউসেফের পোস্ট থেকে বোঝা যায়, তিনি ইরান সরকার ও তাঁর বাবার সমালোচনাও শোনেন। বিশেষ করে ৭ মার্চ উপসাগরীয় নেতাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে। তিনি এটিকে ‘নৈতিক দায়িত্ব’ উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘আমি জানি আমার বাবা প্রতিবেশী ও এই অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কতটা চেষ্টা করেছেন। এটা কতই না তিক্ত যে নিজেদের রক্ষা করতে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোতেই মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে হয়। আমি জানি না, তারা আমাদের পরিস্থিতি বুঝতে পারছে কি না।’
ইউসেফ আরও লিখেছেন, যুদ্ধের পরে ‘আমাদের প্রতিবেশীদের প্রয়োজন হবে।’
ইউসেফ মনে করেন, টিকে থাকার সক্ষমতার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যই ইরানকে রক্ষা করতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান এখনই মনোবল হারানোর মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি এবং আরও কয়েক মাস লড়াই করার মতো রসদ তাদের আছে।
তবে প্রেসিডেন্টের ছেলে ডায়েরিতে কিছু ব্যক্তিগত মুহূর্তও জায়গা পেয়েছে, ‘যুদ্ধের ১৯ দিন পর, আজ শেষ পর্যন্ত আমি কেঁদে ফেলেছি। কয়েকবার।’
ইউসফে লিখেছেন, ‘আমি আমার দাদিকে দেখতে গিয়েছিলাম। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে তাঁকে জানানোই হয়নি, নেতা (আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি) শহীদ হয়েছেন। তিনি সবকিছু থেকেই অন্ধকারে ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করতেন, কেন সব জায়গায় নেতার ছবি দেখানো হচ্ছে...পরে তিনি সব জানতে পারেন এবং সব শহীদের জন্য শোক প্রকাশ করেন।’
মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে লিখেছেন, ‘আমাকে দেখে তিনি (দাদি) কেঁদে ফেলেন। আমি তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে হাসিমুখে বলি, সব ঠিক আছে। কিছুই হয়নি। এটা যুদ্ধ। তারা আমাদেরকে আঘাত করে, আমরাও তাদের আঘাত করি এবং এভাবেই চলছে।’
কিন্তু দাদির বাড়ির সদর দরজা থেকে বের হওয়ার পরই কান্নায় ভেঙে পড়েন ইউসেফ। ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন, ‘কোনো কিছুই স্বাভাবিক নেই।’