সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে কে এই মোজতবা খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনিকে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনই আলী খামেনি নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আগ্রাসনে আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর কে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হচ্ছেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। যদিও ইরান কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
তবে ইসরায়েলি ও পশ্চিমা গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, মোজতবা খামেনিই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।
গত শনিবার ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যৌথ আগ্রাসনে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছাড়াও তাঁর স্ত্রী, মোজতবা খামেনির স্ত্রী ও এক বোন নিহত হন। তবে সেদিন মোজতবা খামেনি হামলাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তার পর থেকে ইরানের ওপর তীব্র বোমাবর্ষণ অব্যাহত আছে। তবে মোজতবা খামেনি বেঁচে আছেন।
মোজতবা খামেনি কখনো কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি বা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন করেননি। তবে তিনি দশকের পর দশক ধরে সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ মহলে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) সঙ্গেও মোজতবা গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
কয়েক বছর ধরে বাবার সম্ভাব্য প্রধান উত্তরসূরি হিসেবে মোজতবা খামেনিকে নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছিল। তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রায় আট বছর ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তারপর প্রায় ৩৭ বছর যাবৎ দেশটির সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শনিবার তেহরানে নিজ কম্পাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তিনি নিহত হন।
এখন মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হলে এই ইঙ্গিত–ই পাওয়া যাবে যে ইরানে কট্টরপন্থীরা এখনো প্রভাবশালী এবং দেশটির সরকারের স্বল্প মেয়াদে কোনো চুক্তি বা আলোচনায় রাজি হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।
মোজতবা খামেনির বয়স ৫৬ বছর। তিনি কখনো বাবার উত্তরাধিকার হওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেননি। এটি তাঁর ও ইরানের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। কারণ, সর্বোচ্চ নেতার পদে মোজতবার উত্তরণ কার্যত ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগে পাহলভি রাজতন্ত্রের মতো একটি রাজবংশ গঠন করার সমতুল্য হবে।
যদিও মোজতবা খামেনি নিজেকে সব সময় আড়ালেই রেখেছেন। তিনি কোনো জনসভার বক্তৃতা, জুমার নামাজের খুতবা বা রাজনৈতিক ভাষণ দেননি। এমনকি অনেক ইরানি তাঁর কণ্ঠ পর্যন্ত শোনেননি। যদিও তাঁরা বছরের পর বছর ধরে জানেন, মোজতবা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে উঠে আসা একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।
অভিযোগ
প্রায় দুই দশক ধরে দেশে ও দেশের বাইরে অবস্থান করা ইরানের সরকারবিরোধীরা দেশটিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন–পীড়নের সঙ্গে মোজতবা খামেনির নাম জড়িয়েছেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভেতর সংস্কারপন্থী শিবির থেকে প্রথমে মোজতবার বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে ‘গ্রিন মুভমেন্টের’ সময় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন করতে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এবং আইআরজিসির আধাসামরিক বাহিনী বাসিজকে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
ওই সময় বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে মাহমুদ আহমাদিনেজাদ আবার ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বলে অভিযোগ উঠেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ আন্দোলন শুরু হয়েছিল।
বাসিজ বাহিনী এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে বিক্ষোভ দমন কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিক্ষোভটি হয়েছে দুমাস আগে। জাতিসংঘ ও পশ্চিমা বিশ্বভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করেছে, ওই বিক্ষোভ চলাকালে ইরানের সরকারি বাহিনী হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, বিশেষ করে গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি রাতে।
মাঝারি মানের ধর্মীয় নেতা
তরুণ বয়সেই মোজতবা খামেনি আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা শুরু করেছিলেন। ১৯৮০–এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি বাহিনীটির হাবিব ব্যাটালিয়নে কাজ করেছিলেন এবং একাধিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
সে সময়ে মোজতবার কয়েকজন সহযোদ্ধা এবং ধর্মীয় নেতা পরবর্তী সময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় শীর্ষ পদে উঠে যান।
মোজতবা খামেনির ওপর মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাধিক দেশে সম্পত্তিসহ তিনি একটি অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
তবে খুব সম্ভবত লেনদেনের কোনো নথিপত্রে মোজতবার নাম নেই। অভিযোগ করা হয়ে থাকে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে তিনি বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি ডলার স্থানান্তর করেছেন।
খামেনির ধর্মীয় যোগ্যতাও বিতর্কের বিষয়। কারণ তিনি ‘হুজ্জাত-উল ইসলাম’ বা মাঝারিপর্যায়ের একজন ধর্মীয় নেতা। আয়াতুল্লাহ বা উচ্চপর্যায়ের নেতা নন।
অবশ্য মোজতবার বাবাও ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার সময় আয়াতুল্লাহ ছিলেন না। সে সময় গঠনতন্ত্র খানিকটা শিথিল করে তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা করা হয়েছিল। মোজতবার বেলায়ও একই ধরনের সমঝোতা হতে পারে।
যদিও এই মুহূর্তে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কবে বা কীভাবে নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করবে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র বোমাবর্ষণ চলছে। এর ফলে সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ এবং তথ্যপ্রবাহে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
এখন তিন সদস্যের একটি কাউন্সিলকে আইনগতভাবে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কাউন্সিলে আছেন কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আলিরেজা আরাফি, বিচারব্যবস্থার প্রধান চরম রক্ষণশীল গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
ইরানে ‘অ্যাসম্বলি অব এক্সপার্টস’ বা বিশেষজ্ঞ পর্ষদ নামে একটি পর্ষদ সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে।
৮৮ জন জ্যেষ্ঠ শিয়া ধর্মীয় নেতাকে নিয়ে এই পর্ষদ গঠিত। তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, এই পর্ষদ সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ, তদারকি ও অপসারণের দায়িত্বে থাকে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এর আগে মাত্র একবার সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা হয়েছিল।