ইসরায়েলে ৫০ বছরের মধ্যে রেকর্ড ভোট, বেশি ভোটার উপস্থিতি কার পক্ষে যেতে পারে

অস্ত্রসহ অবৈধ বসতি স্থাপনকারী উগ্র ইহুদিরা অধিকৃত পশ্চিম তীরের তেলেমের ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে যান। ২৭ অক্টোবর ২০২৬, অধিকৃত পশ্চিম তীরছবি: এএফপি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাগ্যনির্ধারণী নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। খাতাকলমের হিসাব বলছে, দেশটিতে ১৯৭৭ সালের পর এত বেশি ভোটার কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি। উপস্থিত ভোটারদের বড় একটি অংশ আরব। তাঁরা এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হামলার পর আজ মঙ্গলবার দেশটিতে প্রথম নির্বাচন হচ্ছে। সেই স্মৃতি এবারের নির্বাচনে ভোটারদের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া ওই হামলার জেরে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলে নৃশংস আগ্রাসন, লেবাননে চলমান হামলা এবং ইরান যুদ্ধ ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলেছে।

আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল সাতটা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। চলবে স্থানীয় সময় রাত ১০ পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ শুরুর পর বেলা ১টা পর্যন্ত ৪৮ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে বলে ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎসের খবরে বলা হয়েছে।

আল-জাজিরাকে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, ১৯৭৭ সালের পর এত ভোট পড়ার ইতিহাস আর নেই। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ হবে ৪ নভেম্বর।

নির্বাচনে মূল আলোচনা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটকে ঘিরে। এই জোটে রয়েছে কট্টর ডানপন্থী ইতামার বেন-গভিরের দল জিউইশ পাওয়ার ও বেজালেল স্মোত্রিচের দল রিলিজিয়াস জায়োনিজম। বেন-গভির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও স্মোত্রিচ অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অতি রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমও নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য মিত্র।

বিপরীতে রাজনৈতিক দল ইয়াশার, টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটসদের নিয়ে বিরোধী শিবির। এ শিবির জিতলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকটকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। টুগেদারের নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদও সরকারপ্রধান হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন।

* স্থানীয় সময় দুপুর ১টা পর্যন্ত ৪৮ শতাংশের বেশি ভোট।
* আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ হবে ৪ নভেম্বর।
* সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আরবরা।

‘ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছি’

ইসরায়েলের পার্লামেন্টের মোট আসন ১২০টি। এর মধ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠাতা পেতে ৬১ আসনে জয়ী হতে হয় কোনো দল বা পক্ষকে। তবে সম্প্রতি করা রয়টার্সের এক জরিপ বলছে, নির্বাচনে নেতানিয়াহু জোট এককভাবে ৫০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে আইজেনকট বা বিরোধী জোট পেতে পারে ৫২ আসন। অর্থাৎ এককভাবে কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না।

‘আমার ধারণা, দুই পক্ষের যেকোনো একটিরই সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। কোনো পক্ষই বিপুল ব্যবধানে জিতবে না’
আমোৎস আসা-এল, ইসরায়েলি বিশ্লেষক

নেতানিয়াহু বিভিন্ন মেয়াদে ১৯ বছর ইসরায়েল সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে তাঁর জোট সরকারের নানা নীতি দেশে বিভাজন বৃদ্ধি করেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে। তবে নেতানিয়াহুর ভাষ্য, শত্রুদের মোকাবিলা করার মতো দৃঢ়তা কেবল তাঁরই রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীর কাছে নির্বাচনের মূল বিষয় হলো ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

ব্যালট হাতে ভোট কেন্দ্রে যুদ্ধবাজ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২৭ অক্টোবর ২০২৬, জেরুজালেম
ছবি: এএফপি

দক্ষিণ ইসরায়েলের কিবুৎজ নির ওজ সফরের সময় গতকাল আইজেনকোট বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আজকের (মঙ্গলবার) দিন শেষে আমরা পরিবর্তন দেখতে পাব। গত তিন বছর এবং সেই ভয়াবহ দিনের ঘটনাগুলোর ভুল সংশোধনে এটি ভূমিকা রাখবে।’

আর পশ্চিম জেরুজালেমে ভোট দেওয়ার পর নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেউ কেউ নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টা করছে।’

আজ রামাত গানের বাসিন্দা রুথ এপস্টেইন ভোট দেন বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটসকে। পরে তিনি বলেন, ‘আমার জানা সব নির্বাচনের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে আমি সত্যিই ভয় পাচ্ছি।’ অন্যদিকে জেরুজালেমের বাসিন্দা লুইস লিপস্কি নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকট ভোট দিতে কেন্দ্রে যান। ২৭ অক্টোবর ২০২৬, হার্জলিয়া
ছবি: এএফপি

নজরে আরব ভোটাররা

এবারের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি প্রার্থী আহমেদ তিবি। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটাররা ‘নজিরবিহীন’ সংখ্যায় ভোট দিচ্ছেন। তবে আইজেনকোট আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলো সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দিতে পারে।

ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল বলেন, ‘আমার ধারণা, দুই পক্ষের যেকোনো একটিই সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। কোনো পক্ষই বিপুল ব্যবধানে জিতবে না।’ তবে নেতানিয়াহু বা আইজেনকট—কেউই যদি সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান, তাহলে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন নেতানিয়াহু।