ইরানে স্থলযুদ্ধে সফল হতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ লাখ সেনা লাগবে, কয়েক হাজার পাঠানো ‘হাস্যকর’

যুক্তরাষ্ট্রের ২৪তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সার্জেন্ট উইলিয়াম ওলাস বি তালেবানের যোদ্ধাদের সঙ্গে প্রাণপণে লড়ছে। আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের গার্মসিরে, ১৮ মে ২০০৮ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইরানে স্থল অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা ভাবছেন। সেখানে বর্তমানে প্রায় তিন হাজার মার্কিন প্যারাট্রুপার ও পাঁচ হাজার মেরিন সেনাকে সরাসরি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

কিন্তু ইরানে স্থল অভিযান পরিচালনার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনাকে যুদ্ধবিশেষজ্ঞরা ‘হাস্যকর’ বলে মনে করেছেন। কারণ, ইরানে সামরিকভাবে সফল হতে হলে ট্রাম্পকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় প্রত্যেক সদস্যকে সেখানে মোতায়েন করতে হতে পারে। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান সদস্যসংখ্যা ১৩ লাখের বেশি।

ইরাক ও আফগানিস্তানের তিক্ত অভিজ্ঞতা

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাকে হামলা শুরু করেন। ২০০৭-০৮ সালে ইরাক যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন সেখানে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর সেনা ছিলেন। সাদ্দাম হোসেনের পতনের চার বছর পর গড়ে ওঠা বিদ্রোহ দমন করতেই এত বিপুলসংখ্যক সেনা সেখানে অবস্থান করছিল। এই বিদেশি সেনাদের সঙ্গে সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ ইরাকি সরকারি সেনাও যুক্ত হয়েছিলেন।

৩৫ হাজার মার্কিন ও ব্রিটিশ সেনার একটি বিশাল বহরও হেলমান্দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ অঞ্চলটি আয়তনে ইরানের চেয়ে ২৮ গুণ ছোট
ফাইল ছবি: এএফপি

এরপরও দেখা গেছে, আল-কায়েদা ও সাদ্দামের বাথ পার্টির কিছু সদস্য নিয়ে গঠিত তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) ২০১৪ সালে ইরাকের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ দখল করে নেয়। এর অর্থ দাঁড়ায়, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে টালমাটাল ইরাক পরিস্থিতি সামাল দিতে সাড়ে সাত লাখ সেনাও যথেষ্ট ছিল না। অথচ ইরান আয়তন ও সামরিক শক্তিতে ইরাকের চেয়ে অনেক গুণ শক্তিশালী।

অভিযানের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য না থাকলে এই যুদ্ধ ব্যর্থ হতে বাধ্য। এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ যুদ্ধের পেছনে কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্য নেই।
স্যার নিক বোরটন, ইরাক ও আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট জেনারেল

বর্তমানে পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ৫০ হাজার সেনা, নাবিক ও বিমানসেনা রয়েছেন। মোতায়েন থাকা এই সেনারা বর্তমানে ইরাকে বোমাবর্ষণ এবং তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকিয়ে রাখতে ব্যস্ত। ট্রাম্প প্রশাসন সেখানে সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ২০ হাজার সেনা পাঠানোর কথা ভাবছে।

হেলমান্দ ও ইরানের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ: একটি অসম তুলনা

২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে মিত্রবাহিনীর সবচেয়ে বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। সেখানে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন অভিযানে সেনাসংখ্যা ৩ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার করা হলেও অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে অতিরিক্ত ২৫ হাজার মার্কিন মেরিন সেনা পাঠানো হয়েছিল।

বিশ্বের বৃহত্তম রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় মোতায়েন করা হয়েছে
ফাইল ছবি: এএফপি

বিস্ময়কর তথ্য হলো, ৩৫ হাজার মার্কিন ও ব্রিটিশ সেনার সেই বিশাল বহরও হেলমান্দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। অথচ অঞ্চলটি আয়তনে ইরানের তুলনায় ২৮ ভাগের এক ভাগ।

এদিকে প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশ ইরান আয়তনে অনেকটা পশ্চিম ইউরোপের সমান। এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে স্থল অভিযানের জন্য বর্তমানে যে পরিমাণ মার্কিন সেনা পাঠানোর চিন্তা করা হচ্ছে, তা আফগান যুদ্ধের হেলমান্দে পাঠানো সেনার চেয়েও কম।

ন্যাটোর সাবেক কয়েকজন জেনারেলও মনে করেন, ইরানে স্থলযুদ্ধে সফল হতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘১০ লাখের বেশি’ সেনা সেখানে পাঠাতে হবে।

খারগ দ্বীপ: ছোট লক্ষ্য কি বড় যুদ্ধের ফাঁদ

বর্তমানে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী দুটি ইউনিট—৩১ ও ১১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট (এমইইউ) অবস্থান করছে। ইউএসএস ত্রিপোলি ও ইউএসএস বক্সার নামের দুটি ছোট রণতরিকে কেন্দ্র করে গঠিত এই ইউনিট দুটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘অ্যাটাক ডগ’ বা দুর্ধর্ষ আক্রমণকারী দল হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি ইউনিটে প্রায় আড়াই হাজার সেনাসদস্য রয়েছেন।

ইরানের খারগ দ্বীপ দখল করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ দ্বীপে ইরানের মোট রপ্তানি তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করা হয়
ফাইল ছবি: এএফপি

এসব ইউনিট ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত খারগ দ্বীপের মতো লক্ষ্যবস্তু দখলের জন্য উপযোগী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরই মধ্যে এই দ্বীপে হামলার হুমকি দিয়েছেন।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির ২১ মাইল প্রশস্ত জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজের ওপর ইরানের হুমকি মোকাবিলায়ও এসব ইউনিট ব্যবহার করা হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা হয়তো সফলও হবে, কিন্তু এই সাফল্য কতক্ষণ স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ইরানে স্থলযুদ্ধে সফল হতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ লাখ সেনা লাগবে, কয়েক হাজার পাঠানো ‘হাস্যকর’

পুতিনের ড্রোন ও লক্ষ্যহীন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ

সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পরীক্ষিত ‘ফার্স্ট পারসন ভিউ’ (এফপিভি) ড্রোনগুলো ঘটনার মোড় পরিবর্তন করে দিতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিশ্চিতভাবে এসব ড্রোন ইরানকে সরবরাহ করবেন। তখন হয়তো দেখা যাবে, ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানি ড্রোন মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং সেই করুণ দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করছে।

ইরাক ও আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যার নিক বোরটনের মতে, ইরানে স্থল অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ‘কয়েক লাখ’ সেনা প্রয়োজন হবে। ন্যাটোর সাবেক কয়েকজন জেনারেলও মনে করেন, ইরানে স্থলযুদ্ধে সফল হতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘১০ লাখের বেশি’ সেনা সেখানে পাঠাতে হবে।

নিক বোরটন সতর্ক করে বলেন, অভিযানের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য না থাকলে এই যুদ্ধ ব্যর্থ হতে বাধ্য। এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ যুদ্ধের পেছনে কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্য নেই। তবে ইসরায়েল ইরানের ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ করার ওপর জোর দিচ্ছে।