যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সমঝোতার আভাস নেই

ইরানের রাজধানী তেহরানের পথে চলছে লোকজনছবি: রয়টার্স

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। দুই দেশকে ইসলামাবাদে আলোচনায় বসাতে তোড়জোড় চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। তবে সমঝোতার কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদে প্রতিনিধিদল পাঠানোর কথা বললেও দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। আলোচনায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে ইরান। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা দুই পক্ষের আলোচনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা প্রায় ছয় সপ্তাহ যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা অনুযায়ী, ওয়াশিংটন সময় আজ বুধবার সন্ধ্যায় যুদ্ধবিরতি শেষ হবে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী একটি সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হবে ওয়াশিংটন সময় রাত আটটায় (বাংলাদেশ সময় আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা)

যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াবে না—এ কথা বারবার বলছেন ট্রাম্প। এ সময়ের মধ্যে ইরানের সঙ্গে চুক্তি হয়ে যাবে—এমন কথাও বলছেন তিনি। তবে ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া হচ্ছে না। মূলত এ অবরোধের কারণেই দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় যোগ দিতে নারাজ ইরান। তেহরানের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, অবরোধ তুলে নিলে আলোচনায় বসার কথা বিবেচনা করবেন তাঁরা।

সমঝোতার বিষয়ে অনিশ্চিত এই অবস্থায় শেষ পর্যন্ত যদি আলোচনা না হয়, তাহলে আবার যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা রয়েছে। সে ইঙ্গিত দিয়ে সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তি না হলে, মার্কিন বাহিনী আবার ইরানে হামলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের হুঁশিয়ারিও একই ধরনের—যুদ্ধক্ষেত্রে দেখানোর মতো ‘নতুন কার্ড’ রয়েছে তাঁদের হাতে।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার ক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ আস্থার ঘাটতি বলে মনে করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জাহিদ মাহমুদ। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দুই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিসর ও চীনের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, মতবিরোধ দূর করে সংলাপ হবে।

ভ্যান্সের ইসলামাবাদ সফর স্থগিত

আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও ইসলামাবাদে সাজসজ্জা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইরানকে আলোচনায় বসাতে ‘ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে’ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। আল–জাজিরাকে সে কথা বলছিলেন দেশটির বিশ্লেষক নিলোফার আফ্রিদি কাজি। তাঁর আশা, আলোচনা নিয়ে হতাশা দেখা গেলেও আজ থেকে সবকিছু ইতিবাচক দিকে মোড় নিতে পারে।

তবে আলোচনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যখন জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর স্থগিতের ঘোষণা এসেছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার মার্কিন প্রস্তাবে কোনো সাড়া না পাওয়ায় ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর স্থগিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির বিষয়ে সরাসরি অবগত একজন মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি এটিও জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে যেকোনো মুহূর্তে এই সফর আবার শুরু হতে পারে।

কিন্তু গতকাল রাত পৌনে একটায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইরান পাকিস্তানে প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়ে দিয়েছেন, আলোচনায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে তখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি তাঁরা। আলোচনার বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানান পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারও।

জেডি ভ্যান্স ও বাঘের ঘালিবাফ
ফাইল ছবি: রয়টার্স

‘ইটের বদলে পাটকেল’

শেষ পর্যন্ত যদি আলোচনা হয়, তাহলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, জব্দ করা সম্পদ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলাপ হবে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনা সম্ভব নয় বলে গতকাল জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য মোহাম্মদ রেজা মোহসেনি। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো অত্যধিক বেশি এবং তারা শুধু নিজ স্বার্থ পূরণের লক্ষ্যে কাজ করছে।

একই কথা স্পিকার বাঘের গালিবাফের। তাঁর ভাষ্য, নৌ অবরোধের মাধ্যমে একটি চুক্তি করতে ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প। তিনি আলোচনার টেবিলকে ‘আত্মসমর্পণের টেবিলে’ পরিণত করতে চাইছেন। আর পাকিস্তানে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদাম তো সরাসরি বলে দিয়েছেন, বলপ্রয়োগ ও হুমকির মুখে আলোচনা নয়। হামলা শুরু হলে দ্রুত জবাব দেওয়া হবে।

এমন পরিস্থিতি দেখা দেওয়ার জন্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রকেই দুষছেন বিশ্লেষকেরা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বিবিসিকে বলেন, ইসরায়েল–লেবানন যুদ্ধবিরতির পর ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছিল। এরপরই নৌ অবরোধ শুরু করেন ট্রাম্প। ইরান যে এখন পর্যন্ত আলোচনায় অংশ নিচ্ছে না, তা ‘ইটের বদলে পাটকেলের’ মতো পদক্ষেপ।

ইরানকে আলোচনায় বসার আহ্বান

ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সাড়া না পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন দেশের নেতারা। তাঁরা তেহরানকে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। যেমন জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ভাদেফুল ব্রাসেলসে বলেছেন, ভ্যান্স আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিজেদের মানুষের স্বার্থে ইরানকেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব মেনে নেওয়া উচিত।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই আলোচনায় যোগ দেবে বলে আশা প্রকাশ করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, হরমুজ প্রণালি আবার আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে আশা তাদের। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, ইসলামাবাদ আলোচনা যেন সফল হয়, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে দোহা।

যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইরানের জনগণও অপেক্ষা করছেন। যেমন তেহরানের বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী আরিয়া ফারাহান্দ। নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাবার কাছ থেকে অর্থ নেওয়া বন্ধ করেছিলাম। বেতন বাড়ছিল। বোনদের জন্য উপহার কিনছিলাম। জীবনের প্রথমবারের মতো স্বাধীন বোধ করছিলাম। এখন খালি বাসায় একাকী পড়ে থাকতে হচ্ছে। সবকিছু জীবন থেকে চলে গেছে।’

‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড়’ জ্বালানিসংকট

ইসলামাবাদ আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও গতকাল জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রায় ৯৪ ডলারে দাঁড়ায়। এশিয়ার শেয়ারবাজারও কিছুটা স্থিতিশীল হয়। তবে যুদ্ধ বন্ধ না হলে এরই মধ্যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে বেড়েছে জ্বালানির দাম।

যুদ্ধ চললে ইউরোপের আসন্ন গ্রীষ্মকাল কঠিন হবে বলে উল্লেখ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্বালানিবিষয়ক কমিশনার ড্যান জগারসেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, যুদ্ধের স্বল্পমেয়াদি প্রভাব কাটানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ সদস্যদেশগুলোর সামনে তুলে ধরবে তাঁর দপ্তর। এই প্রভাবগুলোর মধ্যে থাকতে পারে পণ্যের সরবরাহঘাটতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারে অস্থিতিশীলতা।

আর যুদ্ধের কারণে বর্তমান জ্বালানিসংকটকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড়’ বলে উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল। ফ্রান্স ইন্টার রেডিওর সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, সংকট এরই মধ্যে বিশাল আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যদি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধকে মেলান, তাহলে বিশ্ব বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানিসংকটের মধ্যে রয়েছে।