ইসরায়েলের দাবি খামেনি নিহত, ইরান বলছে ‘তিনি রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন’
হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন এবং তাঁর মরদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে এই দাবি নাকচ করে ইরান বলেছে, তিনি ‘রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন’।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শনিবার সকালে ইরানজুড়ে হামলা চালায়। ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। হামলায় তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দপ্তর– বাসভবনের চত্বরে ভবন থেকে কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এমন কথা বলেছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার খবরের বিষয়ে এনবিসি নিউজকে তিনি বলেছেন, ‘আমরা মনে করছি, এটা সঠিক খবর।’
যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে ইসরায়েলের এক হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ইরানের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে পাঁচ থেকে ১০ জন নিহত হয়েছেন।
তবে ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম ও মেহের জানিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতা ‘অবিচল রয়েছেন ও রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন’।
ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (৮৬)। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। এছাড়া তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি এবং পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করতেন।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী একটি শক্তি হিসেব দেখত। তাদের অভিযোগ, ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিচ্ছিলেন খামেনি। গত বছর জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধ হয়েছিল। সে সময় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ খামেনিকে হত্যার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, সর্বোচ্চ নেতা ‘আর বেঁচে থাকতে পারে না।’
ওই যুদ্ধে ইসরায়েল আকস্মিক হামলা চালিয়ে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাত হেনেছিল। ওই হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন এবং তাতে দেশটির সামরিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়। এখন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলে তা যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকতে থাকা ইরানের জন্য আরেকটি বড় আঘাত হবে।
খামেনি তাঁর পূর্বসূরি খোমেনির রক্ষণশীল মতাদর্শই আঁকড়ে ধরে ছিলেন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্টরা যখনই অভ্যন্তরীণ ও বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে উদারপন্থা গ্রহণের চেষ্টা করেছেন, খামেনি তখনই তা কঠোর হাতে দমন করেছেন। তাঁর শাসনামলে ইরান কর্তৃপক্ষ বারবার বিভিন্ন বিক্ষোভ দমন করেছে এবং যারা পশ্চিমাদের সঙ্গে সংঘাত কমিয়ে আনার পক্ষে ছিলেন, সেই সংস্কারপন্থীদের তিনি কোণঠাসা করে রেখেছিলেন।
খামেনির নেতৃত্বে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি শক্তিশালী শক্তিতে পরিণত হয় এবং ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। তিনি ২০১৫ সালে বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির করা পরমাণু চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছিলেন। ওই চুক্তি ইরানকে কিছু সময়ের জন্য একঘরে দশা থেকে মুক্তি দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে এসে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলে উত্তেজনা আবার বেড়ে যায়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে ইরানের মিত্ররা দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। এরপর ইসরায়েলের হামলায় হামাস ও হিজবুল্লাহর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অন্যদিকে তেহরানের দীর্ঘদিনের মিত্র সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে উৎখাত হয়ে দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় চলে যান।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানে সর্বোচ্চ নেতার পদটি তৈরি করা হয় এবং তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের ওপরে একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতাকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হয়। ৮৮ সদস্যের আলেমদের নিয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নেতা নির্বাচন করে।