মোদির তেল আবিব সফর নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে টানাপোড়েন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন ইসরায়েল সফর দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে টানাপোড়েন তৈরি করেছে। সফরে মোদির দেশটির পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রথা অনুযায়ী এতে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা। কিন্তু তা নিয়ে দোলাচল তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় পার্লামেন্টে মোদির ভাষণে প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানো না হলে তা বর্জনের হুমকি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ।
আগামী বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুই দিনের সফরে মোদির ইসরায়েল পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সফরে তাঁর ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ ভাষণ দেওয়ার এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কর্মসূচি রয়েছে।
আমরা ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে কথা বলেছি...তারা এই পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বেগের মধ্যে আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আগামী বুধবার নেসেটে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়
বিরোধীদলীয় নেতা লাপিদ জোর দিয়ে বলেন, ‘মোদির ভাষণের সময় সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক অমিতকেও নেসেটে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। বিরোধীদের দাবি, এটি বর্জনের ডাক নয়। বরং সরকার ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির’ দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
নেসেটে সম্প্রতি লাপিদ বলেন, ‘আমরা ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে কথা বলেছি...তারা এই পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বেগের মধ্যে আছে।’
লাপিদ আইনপ্রণেতাদের বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অধিবেশনে জোট সরকার যদি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বর্জন করে, তাহলে আমরা সেই আলোচনায় অংশ নিতে পারব না।’
লাপিদ জোর দিয়ে বলেন, জোট সরকার যদি আবারও আইজ্যাক অমিতকে জনসম্মুখে বর্জন করে, তা আইনসভার জন্য ‘চরম বিব্রতকর’ হবে।
লাপিদ জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা চাই না আমাদের কারণে ভারত বিব্রত হোক। এক শ কোটি মানুষের একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন, আর নেসেট অর্ধেক খালি থাকবে, এমনটি হতে পারে না।’
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে। এই বিষয়টি দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশটির জনগণকে স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে থেকে এ বিষয়টিতে নিয়ে ইসরায়েলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। হামলার আগপর্যন্ত টানা ১০ মাস প্রতি সাপ্তাহিক ছুটিতে দেশটির লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন।
আইজ্যাক অমিত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের শীর্ষ আদালতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর পর থেকে আইনমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন তাঁকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন। তিনি আইজ্যাক অমিতের সঙ্গে দেখা করতে বা তাঁকে আদালতের প্রধান হিসেবে সম্বোধন করতেও রাজি নন।
আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও সরকারি গেজেটে এখনো প্রধান বিচারপতি হিসেবে আইজ্যাক অমিতের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নেসেটের একাধিক আয়োজন থেকে আইজ্যাক অমিতকে বাদ পড়তে হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অন্যান্য বিশ্বনেতার ভাষণেও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অথচ প্রথা অনুযায়ী তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা ছিল।
আইজ্যাক অমিতকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলো দুই সপ্তাহ আগে নেসেটের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর একটি অধিবেশন বর্জন করে। সেখানে বিরোধী দলের একমাত্র সদস্য হিসেবে অধিবেশনে বক্তব্য দেন ইয়ার লাপিদ।
বক্তব্যে লাপিদ সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের প্রতি এমন আচরণের জন্য নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করেন।
আইজ্যাক অমিত ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের শীর্ষ আদালতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর থেকে আইনমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন তাঁকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে আসছেন।
বিরোধীদলীয় নেতার এই হুমকির ফলে রাজনৈতিক মহলে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়। নেসেটের স্পিকার আমির ওহানা অভিযোগ করেন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ফায়দা লুটতে গিয়ে লাপিদ ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্ষতি করছেন।
নেসেটের স্পিকার আমির ওহানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ যদি বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি এবং আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে চান, তবে সেটি তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ। এটি দুর্ভাগ্যজনক ও ভুল সিদ্ধান্ত।’
আমির ওহানা বলেন, ‘আমি আশা করি, তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসবেন।’ ওহানা এই ধরনের হুমকিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে অবৈধ হাতিয়ারের ব্যবহার বলে মন্তব্য করেন।
নেসেটর স্পিকার আরও বলেন, বিরোধীদলীয় নেতাকে ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন তিনি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষণের সময় বর্জনের পথ বেছে নেননি?
আমির প্রশ্ন তোলেন, সেই সময়ও ‘বিচারপতি অমিতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।’ তবে কেন লাপিদ তখন নীরব ছিলেন?
জবাবে লাপিদ প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কাছে প্রকাশ্য একটি আবেদন জানান। একমত পোষণ করে তিনি বলেন, কোনো বিদেশি নেতার অনুষ্ঠান বর্জন করা সত্যিই ‘অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি অবৈধ হাতিয়ার। তবে তিনি যুক্তি দেন, এর জন্য নেসেটের স্পিকারই দায়ী।
লাপিদ দাবি করেন, জেরুজালেম ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য নেতানিয়াহুকে ‘অবিলম্বে নেসেটের স্পিকার আমির ওহানাকে নির্দেশ দিতে হবে, যেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক অমিতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।’
বিরোধীদলীয় এ নেতা বলেন, ‘বিচারপতি অমিতকে স্পিকার ওহানার বর্জন করার অর্থ হলো বিরোধীদেরও বর্জন করা। এমনটা হলে আমরা ওই বৈঠকে যোগ দিতে পারব না।’
লাপিদ জোর দিয়ে বলেন, দেশের মর্যাদা, নেসেট বা প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো ‘ইচ্ছা’ তাঁর নেই। বরং তাঁকে ‘কোণঠাসা’ করা হচ্ছে।
বিরোধী দলের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি সূত্র প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) বলেছে, ‘তারা (সরকার) উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘আমরা বর্জনের ডাক দিচ্ছি না। আমরা কেবল প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারকে অনুরোধ করছি, যেন প্রটোকল অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।’