এয়ারফোর্স ওয়ানে হামলার খবর, তুরস্কের সন্দেহের তির কার দিকে?
গত মাসে আঙ্কারায় ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশে ফেরা নিয়ে লুকোচুরি এবং তাঁকে বহনকারী এয়ারফোর্স ওয়ানে ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা নিয়ে যে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তার পেছনে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা রয়েছেন বলে সন্দেহ তুর্কি কর্মকর্তাদের।
তাঁদের ধারণা, তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চলমান আলোচনাকে দুর্বল করার লক্ষ্যে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা সুপরিকল্পিতভাবে এই ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন।
গত ৮ জুলাই স্থানীয় সময় বেলা প্রায় ২টার দিকে সাংবাদিকেরা জানতে পারেন, আঙ্কারা বিমানবন্দরে—যেখানে ট্রাম্পের এয়ারফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজ রাখা আছে, সেখানে তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনীর অস্বাভাবিক রকম অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে গত ৭ ও ৮ জুলাই আঙ্কারা কঠোর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে ছিল। বলতে গেলে সেখানে প্রায় লকডাউন জারি করা হয়েছিল। সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, ফুটপাতগুলোতেও চলাচল সীমিত করা হয়েছিল, সরকারি কর্মচারীদের এক সপ্তাহের প্রশাসনিক ছুটি দেওয়া হয়েছিল এবং শহরটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল।
এমনকি তুর্কি সরকার এ উপলক্ষে তাদের এতিমেসগুত বিমানঘাঁটি বিশেষভাবে প্রস্তুত করেছিল, যাতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে শীর্ষ সম্মেলনের ভেন্যুতে পৌঁছাতে পারেন। এই বিমানঘাঁটিটি আনুষ্ঠানিকভাবে আঙ্কারা বিমানবন্দর নামে পরিচিত।
এই কঠোর ও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তারা তুরস্কের কর্মকর্তাদের বলেন, তাঁরা ইসরায়েলের কাছ থেকে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছেন। ওই প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরান ট্রাম্পকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে গত ৭ ও ৮ জুলাই আঙ্কারা কঠোর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে ছিল। বলতে গেলে সেখানে প্রায় লকডাউন জারি করা হয়েছিল। সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, ফুটপাতগুলোতেও চলাচল সীমিত করা হয়েছিল, সরকারি কর্মচারীদের এক সপ্তাহের প্রশাসনিক ছুটি দেওয়া হয়েছিল এবং শহরটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছিল।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা মিডলইস্ট আইকে বলেন, ইসরায়েলি ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, ইরানের একটি গোপন অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিট আঙ্কারা বিমানবন্দরের কাছে ট্রাম্পের নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, ধারণা করা হয়েছিল, ইরানিরা বিমানবন্দর থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান নিয়ে ‘ম্যানপ্যাডস’ নামে পরিচিত কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে উড়োজাহাজটিকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এসেনবোয়া বিমানবন্দরের বিপরীতে আঙ্কারা বিমানবন্দরটির চারপাশে অসংখ্য বেসামরিক স্থাপনা রয়েছে। সেগুলোর কয়েকটি রানওয়ে থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে অবস্থিত। ভবনের এত কাছাকাছি অবস্থান তুর্কি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা আরও জানান, মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসও অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল।
যার অংশ হিসেবে প্রথমে কর্মকর্তারা ট্রাম্পের যাত্রার স্থান আঙ্কারা বিমানবন্দর থেকে এসেনবোয়া বিমানবন্দরে স্থানান্তর করেন, যেখানে বিমানবন্দরের সীমানা থেকে বেসামরিক ভবনগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক দূরে অবস্থিত।
এরপর তাঁরা পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ফিরিয়ে আনেন। কারণ, ওই উড়োজাহাজে এমন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আছে, যা নতুন উড়োজাহাজটিতে এখনো নেই।
মার্কিন কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে হত্যার প্রচেষ্টার ইরানি হুমকিটিকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেছিলেন। কারণ, ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে আসে, যখন ট্রাম্প যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প বারবার বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এবং তিনি চলমান আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী। বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র মিডলইস্ট আইকে এ কথা বলেন।
ট্রাম্পের এই অবস্থান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ও পরিকল্পনার সঙ্গে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক। নেতানিয়াহু যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার পক্ষে। তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আরও ব্যাপক হামলা চালাতে এবং ইরানি নেতাদের হত্যা করতে নতুন করে অভিযান পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
তাই তুর্কি কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সম্ভবত নেতানিয়াহু সরকারের একটি কৌশলী ছলনা ছিল। এর লক্ষ্য ছিল ট্রাম্পের রক্ষক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা, ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনা ভেস্তে দেওয়া এবং এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের দৃশ্যত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে দুর্বল করা।