এবার আরামকোর সদর দপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

৩ অক্টোবর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণে সৌদি আরামকোর স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উড়ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে সৌদি আরামকোছবি: এএফপি

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে কয়েক দফা হামলার পর এবার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর প্রধান কার্যালয়ে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে গত মঙ্গলবার রাতে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে সদর দপ্তরের একটি প্রশাসনিক ভবনে আগুন ধরে যায়। হামলায় কেউ হতাহত হননি। তবে ভবনটির কয়েকটি তলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি বলেছে, ধাহরানের আরামকো স্থাপনাসহ সৌদি আরবের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। গতকাল বুধবার গোষ্ঠীটি আরও হামলার হুমকি দিয়ে বলেছে, সৌদি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’।

মঙ্গলবার হুতিদের হামলার আগে ইয়েমেনের সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট রাজধানী সানার উপকণ্ঠে হামলা চালায়। দেশটির পেট্রোলিয়াম কোম্পানির একটি জ্বালানি ডিপোসহ কয়েকটি স্থাপনা লক্ষ্য করে এসব হামলা চালায় তারা।

হুতিরা এর আগেই হুমকি দিয়েছিল, সানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন হামলার ‘কঠোর ও বেদনাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে। সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে তারা ধাহরানের আরামকো সদর দপ্তর ও রিয়াদের একটি তেল শোধনাগারের কথাও বলেছিল।

ধাহরানের ওই কমপ্লেক্সে আরামকোর গুরুত্বপূর্ণ পরিচালন কেন্দ্র রয়েছে। এখান থেকে স্থল ও সমুদ্রের তেলক্ষেত্র, পাইপলাইন, শোধনাগার ও রপ্তানি টার্মিনালের বিশাল নেটওয়ার্ক তদারক করা হয়।

হামলার পরও আরামকোর কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কিছু কর্মীকে বাসা থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলার পর ভবনে সীমিত আগুন লাগে। তবে ঘটনাটি সম্পর্কে জানেন এমন কয়েকজন রয়টার্সকে বলেছেন, আগুন ভবনের কয়েকটি তলায় ছড়িয়ে পড়েছে। ওপরের তিনটি তলা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তেলের দাম বেড়েছে

আরামকোর সদর দপ্তরে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। গতকাল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৯১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৬ দশমিক ৬০ ডলারে উঠেছে।

হরমুজ প্রণালিতেও ঝুঁকি বেড়েছে। গতকাল রয়টার্স জানিয়েছে, গত সোম ও মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত দুটি কনটেইনার জাহাজ অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর একটি আগুন ধরে পরে ডুবে যায়। দুই জাহাজের ৪৩ নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভানি স্তাউনোভো বলেন, হরমুজে জাহাজে হামলা এবং সৌদি-হুতি সংঘাত তেলের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বারবার নিশানায় বিমানবন্দর

হুতিরা বলেছে, ধাহরানের আরামকো স্থাপনার পাশাপাশি রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রাজধানীর একটি আরামকো শোধনাগারেও তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

গত এক সপ্তাহে কিং খালেদ বিমানবন্দর চারবার হামলার মুখে পড়েছে। গত শনিবারের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। পরদিন একই বিমানবন্দরে আরেক হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরটি আগামী শনিবার পর্যন্ত বন্ধ রেখেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসও ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে।

গতকাল রিয়াদের দিকে হুতিদের ছোড়া আরেকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এর আগের দিন দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫টি বাড়ি।

ইয়েমেনে তীব্র লড়াই

গত মাসে হুতিরা লোহিত সাগর উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে পৌঁছে যায়। এরপর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে নতুন করে পাল্টা অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।

সৌদি জোট ও সরকারপন্থী বাহিনীর পাল্টা অভিযানে বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছের কিছু এলাকা থেকে হুতিরা পিছু হটেছে। তবে গোষ্ঠীটি আশপাশে অবস্থান করছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র তাইজের আশপাশেও হুতিরা অগ্রসর হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস জানিয়েছে, যুদ্ধাহত মানুষের চাপ সামলাতে ইয়েমেনের হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলেছে, হুতিদের ঘেরাওয়ের কারণে তাইজে ছয় লাখের বেশি মানুষের কাছে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাঁদের মধ্যে দুই লাখের বেশি নারী ও শিশু।

নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষক নওয়াফ ওবায়েদ আল-জাজিরাকে বলেছেন, আকাশপথে হামলা বাড়লেও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ‘প্রকৃত স্থলযুদ্ধ আসলে এখনো শুরু হয়নি’। তাঁর মতে, প্রথমে হুতিদের জ্বালানি ও সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা, এরপর তাদের নিয়ন্ত্রণের বিস্তার ঠেকানো এবং পরে দখলে যাওয়া এলাকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হতে পারে।

চাপে সৌদির অর্থনীতি

হামলার নতুন ঢেউ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনীতি বৈচিত্র্যকরণ প্রকল্পের ওপর চাপ তৈরি করছে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন, বিনোদন ও ব্যবসার বড় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় শক্তি হিসেবেও তুলে ধরছে রিয়াদ।

কিন্তু এখন রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দর থেকে বিশ্বের বৃহত্তম তেল কোম্পানির সদর দপ্তর—একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হামলার মুখে পড়ছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে রিয়াদে অনুষ্ঠেয় বড় বিনিয়োগ সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক আয়োজন নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে সৌদি আরবের ‘নিরাপদ ব্যবসায়িক গন্তব্য’ হিসেবে গড়ে তোলা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সৌদি আরবকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসরায়েল। ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ-এর বরাতে তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, ওই প্রস্তাবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আগ্রহ দেখাননি। কারণ, ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য সামরিক সহযোগিতা সৌদি জনমতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।