লারিজানি নিহত হওয়ায় ইরানি শাসনব্যবস্থায় কী প্রভাব পড়তে পারে

আলী লারিজানিরয়টার্স ফাইল ছবি

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি দেশটির কট্টরপন্থী সামরিক গোষ্ঠী এবং তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী রাজনৈতিক অংশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরিতে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় লারিজানি নিহত হওয়ার ঘটনাটি ইরানের শাসনব্যবস্থার ওপর সামরিক বাহিনীর প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বিমান হামলায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব এবং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান লারিজানি কার্যত দেশটির নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গত মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযানের শুরুতেই খামেনি নিহত হন।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইরানি নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজির মতে, যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করতে লারিজানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু এখন এ ক্ষেত্রে সামরিকীকরণ হবে।

গত কয়েক মাস ধরে লারিজানির দায়িত্ব ক্রমেই বেড়েছিল। জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো কঠোর দমন-পীড়ন তদারকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পাশাপাশি লারিজানি মিত্র দেশ ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত মোকাবিলায় ইরানকে প্রস্তুত করার কাজেও যুক্ত ছিলেন।

লারিজানি একজন রক্ষণশীল রাজনীতিক হলেও ক্রমশ কট্টরপন্থীদের প্রভাব বাড়তে থাকা শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলক বাস্তববাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জায়গায় একজন মধ্যপন্থী সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন বলে সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস খবর প্রকাশ করেছিল।

অবশ্য শেষ পর্যন্ত লারিজানির চাওয়া পূরণ হয়নি। আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ এক ইরানি কর্মকর্তা ফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, লারিজানি নিহত হয়েছেন বলে তিনি ফোনে খবর পেয়েছেন। তাঁর মতে, এ ঘটনায় ইরানি কর্মকর্তারা যেমন গভীর আঘাত পেয়েছেন, তেমনি তাঁরা উদ্বেগের মধ্যেও আছেন।

আলী লারিজানি
রয়টার্স ফাইল ছবি

কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েল ইরানের সব শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা না করা পর্যন্ত থামবে না এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করবে।

প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় জ্যেষ্ঠ ওই ইরানি কর্মকর্তা তাঁর নাম প্রকাশ করেননি।

ইসরায়েল বলেছে, লারিজানির পাশাপাশি তারা বাসিজের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলামরেজা সোলাইমানিকেও হত্যা করেছে। বাসিজ হলো ইরানে বিক্ষোভ দমন করার জন্য সরকারের মোতায়েন করা সাদা পোশাকের মিলিশিয়া বাহিনী।

ইরানের বিপ্লবী গার্ডের এক সদস্য বলেছেন, লারিজানি ও সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড সম্ভবত ইরানের কট্টরপন্থীদের ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করার সুযোগ করে দেবে। তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাওয়ার কাছে হার মানবে না।

প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় বিপ্লবী গার্ডের এ সদস্য তাঁর নাম প্রকাশ করেননি। ওই সদস্য আরও বলেছেন, লারিজানি ও সোলাইমানির নিহত হওয়ার খবর শুনে তিনি মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হলেও এ ঘটনাটি তাঁকে আরও বেশি করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য সংকল্পবদ্ধ করে তুলেছে।

এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, লারিজানি নিহত হয়েছেন বলে তিনি ফোনে খবর পেয়েছেন। তাঁর মতে, এ ঘটনায় ইরানি কর্মকর্তারা যেমন গভীর আঘাত পেয়েছেন, তেমনি তাঁরা উদ্বেগের মধ্যেও আছেন। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েল ইরানের সব শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা না করা পর্যন্ত থামবে না এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করবে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইরানি নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হামিদরেজা আজিজির মতে, যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করতে লারিজানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু এখন এ ক্ষেত্রে সামরিকীকরণ হবে।

আজিজি বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে সবকিছুই সামরিক উচ্চপদস্থদের হাতে চলে গেছে। যুদ্ধ থামাতে তারা কীভাবে নমনীয়তা দেখাবে বা কতটা নমনীয়তা দেখাতে পারবে, অন্য পক্ষের ধারণাগুলো গ্রহণ করতে পারবে কি না—তা কল্পনা করাও কঠিন।’

আজিজির মতে, যখন শীর্ষ নেতৃত্বের একটি স্তরকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন পরের স্তরের সদস্যরা আগের চেয়ে আরও কঠোর ও কট্টরপন্থী হয়ে ওঠে।

আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো আলী আলফোনেহ লারিজানির কর্মজীবন নিয়ে একটি বিশ্লেষণ লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে আরও কট্টর করে তুলবে এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ডকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

টেক্সট বার্তায় আলফোনেহ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে পারার মতো যেকোনো ব্যক্তিকে হত্যা করছে ইসরায়েল। তাদের এজেন্ডা ট্রাম্পের থেকে আলাদা। এখন শুধু কট্টরপন্থী আইআরজিসি (বিপ্লবী গার্ড) থাকল।’

লারিজানির হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, এ মৃত্যু ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন কার্যক্রম পরিচালনা ও সমন্বয় করতে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর যে সক্ষমতা রয়েছে—তার ওপর আঘাত।

সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা রক্ষণশীল ইরানি রাজনীতি–বিশ্লেষক হাতেফ সালেহির মতে, লারিজানি ইরানের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সক্ষম মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ায় এখন যুদ্ধ থামাতে কম খরচায় রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার সুযোগ কমে যাবে।

টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইদ গোলকার বলেন, লারিজানির মৃত্যুর কারণে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও বিপ্লবী বাহিনীর সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফকে আরও উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব সামলাতে হবে। তিনি মোজতবা খামেনি, রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও বিপ্লবী গার্ডসের মধ্যে সংযোগ হিসেবে কাজ করেন।

গোলকারের মতে, গালিবাফ যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। তাঁদের বিশ্বাস, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারবেন।