পাইলটকে সহকারীর ছুরিকাঘাত, ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় সৌদিতে ইসরায়েলগামী বিমানের জরুরি অবতরণ
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাই থেকে ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি যাত্রীবাহী বিমান আজ বুধবার সৌদি আরবে জরুরি অবতরণ করেছে। বিমানের দুই পাইলটের মধ্যে মারামারির ঘটনায় জরুরি সংকেত পাঠানো হয়েছিল। এতে কিছু সময়ের জন্য বিমান ছিনতাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটি জর্ডানের আকাশসীমায় থাকা অবস্থায় গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের দিকে যায়। এ সময় বিমানটি তিনটি জরুরি সংকেত পাঠায়। এর একটি সংকেতে বিমানে সম্ভাব্য বেআইনি হস্তক্ষেপের কথা জানানো হয়।
পাইলটদের মধ্যে কথিত মারামারির সময় বিমানটি নাটকীয়ভাবে নিচে নেমে আসে। মাত্র দুই মিনিটে এটি প্রায় ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।
বিমানটিতে বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি নাগরিক ছিলেন। সম্ভাব্য ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা যুদ্ধবিমান পাঠান। পরে বিমানটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিবৃতির বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ফ্লাইদুবাইয়ের বিমানটি বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে তাবুকে অবতরণ করে। বিমানের ক্যাপ্টেন ও কো-পাইলট আহত হয়েছেন। তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এর আগে ফ্লাইদুবাই জানিয়েছিল, এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটটি গন্তব্যে যাওয়ার পথে একটি ঘটনার মুখে পড়ে। পরে বিমানটি তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে। বিমানের সব যাত্রী নিরাপদে আছেন এবং তাঁদের সবার হিসাব পাওয়া গেছে।
এক যাত্রী জেরুজালেম পোস্টকে বলেন, এক পাইলট অন্য পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন। এরপর তিনি তাঁকে ককপিট থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় বিমানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। অন্য ইসরায়েলি যাত্রীরা ককপিটে ছুটে গিয়ে হামলাকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন।
গার্ডিয়ান এসব প্রতিবেদন তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে এমন একজন যাত্রীর ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, যাঁর শার্টে রক্তের দাগ দেখা গেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র প্রথমে বলেছিলেন, ছিনতাইয়ের চেষ্টার কারণে বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করা হয়নি। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, এক পাইলট আত্মহত্যার চেষ্টায় বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন কি না, তা তাঁরা খতিয়ে দেখছেন। ফ্লাইটের ক্রু দলের অন্য সদস্যরা তাঁকে থামিয়ে দেন বলে জানা গেছে। কর্মকর্তারা আরও বলেন, ইসরায়েলিদের ওপর হামলার উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তাঁরা বিবেচনা করে দেখছেন। তবে তদন্ত এখনো চলছে।
এ ঘটনার কারণে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর নির্ধারিত সফর স্থগিত করেছেন। সফরে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধানের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
পাইলটদের মধ্যে কথিত মারামারির সময় বিমানটি নাটকীয়ভাবে নিচে নেমে আসে। মাত্র দুই মিনিটে এটি প্রায় ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়।
সৌদি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, বিমানের সব যাত্রী নিরাপদ আছেন। ক্যাপ্টেন ও কো-পাইলট দুজনকেই চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। অনুমতি পেলে তারা আটকে পড়া যাত্রীদের ইসরায়েলে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য উড়াল দেবে।
পাইলটদের মধ্যে মারামারির ঘটনাটি এখনো স্পষ্ট নয়। যাত্রীরা ওই সময়ের নানা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় রক্ত ঝরেছে বলেও জানা গেছে।
বিমানে থাকা এক যাত্রীর মা ইয়াসমিন আবু কাইস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, তাঁর মেয়ে চিৎকারের শব্দ শুনেছেন। এক ব্যক্তির হাতে ছুরি ছিল। ওই ব্যক্তি এক পাইলটকে মেঝেতে ফেলে দেন। চারদিকে রক্ত ছিল বলে তাঁর মেয়ে জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ঘটনার পর তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করা ফ্লাইদুবাইয়ের আরেকটি ফ্লাইট মাঝ আকাশ থেকে ঘুরে আবার দুবাইয়ের দিকে ফিরে গেছে।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যার মাত্র কয়েক দিন আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছিলেন, অক্টোবরে ইসরায়েলের নির্বাচন চলাকালে হামলা হতে পারে, এমন কিছুর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, ইসরায়েলের ওপর হামলার কোনো পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য তাদের কাছে ছিল না।
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েলগামী ও ইসরায়েলি বিমান ছিনতাই এবং এসব বিমানে হামলার একাধিক ঘটনা ঘটিয়েছিল। তবে কয়েক দশক ধরে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
ইসরায়েলে বিশ্বের অন্যতম কঠোর বিমানবন্দর নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। ইসরায়েলগামী বিমানে ওঠার আগেই যাত্রীদের নিরাপত্তা তল্লাশি করা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে ২০২০ সালে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর তাদের মধ্যে বিমান চলাচল শুরু হয়। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের এ পর্যন্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে ২০২৫ সালে চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থার কারণে একটি বিমান রিয়াদে অবতরণ করেছিল।
ফ্লাইদুবাই নিশ্চিত করেছে, বুধবার তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করা তাদের এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটে একটি ঘটনা ঘটেছে। পরে বিমানটি নিরাপদে তাবুকে অবতরণ করে।
বিমান সংস্থাটি বলেছে, ‘আমাদের দল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। আরও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হবে।’
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ঘটনার পর তেল আবিবের উদ্দেশে যাত্রা করা ফ্লাইদুবাইয়ের আরেকটি ফ্লাইট মাঝ আকাশ থেকে ঘুরে আবার দুবাইয়ের দিকে ফিরে গেছে।