যুদ্ধ বন্ধ ও আলোচনায় ফেরার শর্ত কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে পাঠাল ইরান

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজায়িফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে আনুষ্ঠানিক কিছু শর্ত পাঠিয়েছে ইরান। আল-জাজিরাকে এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

গতকাল শনিবার আল-জাজিরার তেহরান ব্যুরোপ্রধান নুর এদ্দিন এদঘিরকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজায়ি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারী কাতারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তারা আমাদের শর্তগুলো ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। আমরা এখন প্রেসিডেন্ট (ডোনাল্ড) ট্রাম্পের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’

মাসখানেক আগে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারির দায়িত্ব নেওয়া রেজায়ি বলেন, ‘আমাদের শর্ত হলো—সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, আমাদের জব্দ করা অর্থ ছাড়তে হবে এবং নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া ওয়াশিংটনের স্বার্থেই জরুরি। ট্রাম্পের হুমকিতে কোনো কাজ হবে না। আমরা চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত।’

গত মাসে দুই পক্ষের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ শেষ হয়। এরপর থেকেই দুই দেশকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে কাজ করছে কাতার ও পাকিস্তান। এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও যুদ্ধের অবসান চায়। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর এই যুদ্ধ শুরু হয়।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র আবারও নতুন করে হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি রেজায়ি। সামরিক মূল্যায়নের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, এই হামলার বেশ জোরালো আশঙ্কা রয়েছে। তবে তেহরানও পুরোপুরি প্রস্তুত।

রেজায়ি জানান, আগের দুই দফা সংঘাতের পর ইরান তাদের সামরিক পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছে। তাদের মূল নজর এখন মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর। পারস্য উপসাগর থেকে শুরু করে ওমান উপসাগর ও আরব সাগর পর্যন্ত তাদের নিশানা থাকবে। তবে এর বাইরে ভারত মহাসাগরের দিকের লক্ষ্যবস্তুগুলো ইরানের আওতার বাইরে পড়বে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ইরানের ‘দ্বিমুখী বার্তা’

রেজায়ি জানান, সম্প্রতি তারা মার্কিন রণতরি বা যুদ্ধজাহাজের কাছাকাছি এলাকায় একাধিক ওয়ারহেডযুক্ত জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছেন। এসব ওয়ারহেড ভবিষ্যতে আরও উন্নত করা হতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে ইরানের যেকোনো পাল্টা হামলার তীব্রতা হবে অনেক বেশি। আগের মতো এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি স্থানীয় মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থ ও তাদের কোম্পানিগুলোর ওপরও আঘাত হানা হবে।

যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাস্তব অর্থে যুদ্ধ এখনো চলছে।’ তবে যত দ্রুত সম্ভব এই সংঘাত অবসানে তেহরান একটি নতুন কৌশলে কাজ করছে বলেও জোর দেন তিনি।
তেহরান থেকে আল-জাজিরার তৌহিদ আসাদি জানান, পুরো সংঘাতজুড়ে ইরান যে ‘দ্বিমুখী বার্তা’ দিয়ে আসছে, রেজায়ির বক্তব্য তারই অংশ। তারা একদিকে যেমন কূটনীতির পথ খোলা রাখছে, অন্যদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতিও পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে।

পেন্টাগনের আরব উপদ্বীপবিষয়ক সাবেক পরিচালক ডেভিড ডেস রোচেস আল-জাজিরাকে বলেন, ওয়াশিংটন সম্ভবত এই শর্তগুলোকে সমঝোতার জন্য খুব একটা আন্তরিক সূচনা হিসেবে দেখবে না।

রোচেস বলেন, ‘প্রথম দেখায় এটিকে হয়তো খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হবে না। তারা এটিকে ইরানের একধরনের আত্মসমর্পণ হিসেবেই দেখতে পারে।’

তবে রোচেসের মতে, ইরান আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে।  ইরান আগে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ চেয়েছিল, এবার সেই দাবি থেকে তারা সরে এসেছে। তিনি বলেন, ‘সবার আগে নজর কাড়ে যে তিনি ক্ষতিপূরণের দাবিটি বাদ দিয়েছেন।’