মামদানির বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা’ ছড়ানোর অভিযোগ তুললেন আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুফাইল ছবি : রয়টার্স

ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানি তাঁকে একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিহিত করে এবং গাজা যুদ্ধের জন্য নিউইয়র্কে এলে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসলে ‘ঘৃণা’ ছড়াচ্ছেন। আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত এই আসামি নিউইয়র্কে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

মেয়র সংবর্ধনা জানাবেন না বলে ইঙ্গিত দেওয়া সত্ত্বেও গতকাল রোববার নেতানিয়াহু বলেছেন, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে তিনি নিউইয়র্কে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন।

গত বুধবার নিউইয়র্কে মামদানি বলেছিলেন, নিউইয়র্ক নগরের হাতে বিশ্বের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আইনি ক্ষমতা না থাকলেও তিনি বিষয়টি কার্যকর করতে ফেডারেল সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।

ফক্স নিউজ চ্যানেলের ‘সানডে মর্নিং ফিউচারস উইথ মারিয়া বার্টিরোমো’ অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, তাঁর (মামদানি) তো নিউইয়র্কের সব নাগরিক—ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুসলিম সবার মেয়র হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি এক গোষ্ঠীকে অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ক্রমেই বিতর্কিত এক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাস যোদ্ধাদের হামলার পর গাজায় নির্বিচার ও নৃশংস হামলা শুরু করে। ইরান–সমর্থিত হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান শুরুর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে।

নেতানিয়াহু তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগগুলো ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেছেন। তিনি আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন আচরণের অনিয়মের অভিযোগের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি মূল বিষয় থেকে মনোযোগ সরানোর একটি চেষ্টামাত্র।

তবে গাজায় যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর নির্দেশে পরিচালিত নৃশংস হামলায় ২০ হাজারের বেশি শিশুসহ প্রায় ৭৩ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের প্রায় সবাই বেসামরিক নাগরিক।

নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানি
ছবি: রয়টার্স

সর্বশেষ ফক্সে নেতানিয়াহুর মন্তব্যের বিষয়ে জোহরান মামদানির কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

গতকাল উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু আরও অভিযোগ তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি অতীতে যে দ্বিদলীয় রাজনৈতিক সমর্থন ছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে মামদানির রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত প্রগতিশীল এবং উগ্র-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটদের বিভাজনের কারণে।

নির্বিচার গাজাবাসীকে হত্যার অভিযোগ আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশে ক্রমবর্ধমান ইহুদিবিদ্বেষ সম্পর্কেও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইহুদি জনসংখ্যার শহর নিউইয়র্কের মানুষের সঙ্গে যখন তিনি কথা বলেন, তখন ‘ইহুদিরা সেখানে চরম অস্বস্তি বোধ করে’।

নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমি মনে করি এটি ভুল। পুরো ব্যাপারটাই ভুল।’

২০২৫ সালের মেয়র নির্বাচনী প্রচারজুড়ে মামদানি বলেছিলেন, গাজা যুদ্ধে নেতানিয়াহুর ভূমিকার জন্য আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে তিনি শহরের পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার চেষ্টা করবেন।

গত বুধবার এক ভিডিও বার্তায় মামদানি বলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিউইয়র্ক নগরে স্বাগত জানানো হবে না এবং অন্য কোনো পলাতক যুদ্ধাপরাধীকেও নয়।’

মামদানি নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের উদ্দেশে বলেন, তিনি তাঁদের ক্ষোভ বুঝতে পেরেছেন এবং প্রতিবাদ প্রকাশ এমন একটি বিষয়, যা এই শহর ‘সব সময় সম্মান করবে’।

হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক আদালত নেতানিয়াহু, তাঁর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং হামাসের প্রয়াত নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাঁদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবস্থায় আপনাকে কোনোভাবেই, কোনো রূপেই গ্রেপ্তার করা হবে না।’

নেতানিয়াহু আজ সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এবং রিপাবলিকান পার্টির প্রয়াত সিনেটর ইসরায়েলপন্থী লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দিতে যাচ্ছেন।

ইসরায়েলের সব ধরনের অন্যায় ও নৃশংসতার ঘোর সমর্থক লিন্ডসে গ্রাহাম ১১ জুলাই আর্টারি বা ধমনি ফেটে গিয়ে হঠাৎ মারা যান। নেতানিয়াহু তাঁকে একজন ‘মহান দেশপ্রেমিক’এবং ইসরায়েলের ‘অন্যতম সেরা বন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করেন।