হরমুজ সাত দিনের মধ্যে খুলতে প্রস্তাব ইরানের, কী বলছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের আরাগচি বলেন, প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করা হলে এটি করা সম্ভব। তিনি বলেন, এসব শর্ত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে সাত দিনের একটি রূপরেখা প্রস্তাব করেছে ইরান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের কাছে এই পরিকল্পনা তুলে ধরেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর আওতায় সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং অঞ্চলটিতে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানো সম্ভব হবে। আরাগচি বলেন, এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটির (এমওইউ) লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালি অন্তত আংশিকভাবে পুনরায় খুলে দেওয়া। ১৪ দফার ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা ‘সব ফ্রন্টে’ সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাসহ আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইরানের এই প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে বিবিসিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। এসব আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কথা হচ্ছে। এর আগে চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইরানিরা হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। এতে সাত মাস ধরে চলা এই সংঘাতের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। এই সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
জাতিসংঘে গতকাল শুক্রবার সাংবাদিকদের ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চুক্তিতে পৌঁছানো এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ব্যাপারে যদি আন্তরিকতা থাকে, তাহলে এখনই সবকিছু প্রস্তুত রয়েছে।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের ব্যবহৃত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দামে ওঠানামা দেখা দিয়েছে।
সংঘাত অবসানের পথ খুঁজে বের করতে ট্রাম্পের ওপরও চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দিয়ে এই চাপ আরও বাড়ছে।
সাংবাদিকদের আরাগচি বলেন, প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং স্বাভাবিক নৌ চলাচল শুরু করা সম্ভব।
তবে এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে বা ইরানের পক্ষ থেকে কী কী দাবি করা হয়েছে, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে যেসব পদক্ষেপ নিতে হবে, সেগুলো নতুন কিছু নয়। সবই এরই মধ্যে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) উল্লেখ করা আছে।’
এদিকে বিবিসিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন আমাদের হাতে থাকায় আমরা খুবই শক্ত অবস্থানে আছি। তাই আমাদের তাড়াহুড়া নেই।’
গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটির (এমওইউ) লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালি অন্তত আংশিকভাবে পুনরায় খুলে দেওয়া। ১৪ দফার ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাসহ আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এখন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
এতে আরও বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে ইরান। ভবিষ্যতে নৌ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করার কথাও ছিল।
তবে এর কিছুদিন পরই দুই পক্ষ আবার হামলা শুরু করলে ওই সমঝোতা ভেস্তে যায়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে অনুমতি ছাড়া পার হওয়ার চেষ্টা করেছে—এমন অভিযোগে ইরান কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
ইরানিরা হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে। এতে সাত মাস ধরে চলা এই সংঘাতের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, তেহরানকে কখনোই পারমাণবিক বোমা অর্জন করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, ইরানের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শান্তি প্রস্তাবে সম্মত হলেও পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইরান কোনো ছাড় দেবে না।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর অধিকারসহ নিজেদের কোনো অধিকারেই ইরান কোনো ছাড় দেবে না।
ইরানের সাত দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানায়নি। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ট্রাম্পের শর্তগুলো মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে সন্দিহান। তাই তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের বলেছেন, ইরানের ওপর নতুন করে বোমা হামলা চালানোর সম্ভাবনাই তিনি বেশি দেখছেন।
রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই প্রতিবেদন নিশ্চিত করতে পারেনি।
সৌদি মিত্ররা ঐক্যবদ্ধ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ বন্ধে এর আগের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এরপর কখনো লড়াইয়ে বিরতি এসেছে, আবার কখনো নতুন করে হামলা শুরু হয়েছে। এতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আগে থেকেই সংকটে থাকা দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে।
ইরান ও তাদের মিত্ররা পাল্টা হামলা চালিয়ে সংঘাতটি পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছে। ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতিরা সৌদি আরবের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
ইরান ঘনিষ্ঠ ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবের একটি পাইপলাইনে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিশ্ববাজারে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ আরও কিছুটা কমে গেছে। এদিকে, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ শনিবার ভোরে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচলের পথ নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে হওয়া সমঝোতার বিষয়ে আরাগচি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদকে অবহিত করেছেন।
যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব সামলাতে সৌদি আরবের মিত্ররাও দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে একজোট হয়েছে।
সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হুতি যোদ্ধাদের হামলার শিকার হয়েছে। হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি আরবের ভেতরেও আঘাত হেনেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেন জোট আজ ভোরে বলেছে, হুতিদের ছোড়া দুটি ড্রোন সৌদি রাজধানী রিয়াদের দিকে যাওয়ার সময় তারা সেগুলো ভূপাতিত করেছে। এ ছাড়া ইয়েমেন সীমান্তবর্তী খামিস মুশাইতের দিকে হুতিদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও তারা প্রতিহত করেছে।
হুতিরা ইয়েমেনের সবচেয়ে জনবহুল এলাকাগুলো এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করার পর থেকে তারা সৌদি আরবের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলায় লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এসব হামলায় সৌদি আরবের শহর, জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌযান চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল অনেকটাই বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির প্রধান বিকল্প পথ লোহিত সাগর দিয়েও পণ্য পরিবহন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের কাছে এ নিয়ে সামরিক সহায়তা চেয়েছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর প্রকাশ পেয়েছে।
চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এত দিন পর্যন্ত তিনি যে চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেননি, সেটি তখন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ইরানের সঙ্গে কি এমন একটি চুক্তি হবে, যাতে তারা আবার গড়ে উঠতে পারে এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠতে পারে? নাকি আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করে দেব এবং দ্রুতই তা করব, যাতে আবারও মানুষ ও দেশ ধ্বংস করার সুযোগ তারা কখনো না পায়? আমি কি তাদের নরকে পাঠিয়ে দেব?’
গতকাল আরাগচি বলেন, ইরান ‘জবরদস্তি, হুমকি বা ভয় দেখানো’ মেনে নেয় না। তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না’।