যুক্তরাষ্ট্র-সৌদির হামলায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলার পর ইরাকের নিনেভে প্রদেশের বারতাল্লায় পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) একটি ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। ২৯ জুলাই ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ইরাকে ইরান–সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একাধিক ঘাঁটিতে আজ বুধবার ভোরে একযোগে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এতে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) নামের গোষ্ঠীটির অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত ও ৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই দিন প্রায় একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা চালিয়েছে ইরান। এ হামলার জন্য ইরানকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

টানা ১৩ দিন পর গত শুক্রবার ইরানে বোমা হামলা স্থগিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হামলা বন্ধ হওয়ায় ইরানও পাল্টা হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল। এমন একটা অবস্থায় হঠাৎ এসব হামলার খবর এল। অন্যদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর এবারই প্রথম প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার কথা জানাল সৌদি আরব।

ইরাকে হামলা ও জর্ডানে ইরানের পাল্টা আঘাতের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন করে বেড়েছে।

পিএমএফের একাধিক ঘাঁটিতে হামলা

আজ ভোরে ইরাকের বিভিন্ন স্থানে পিএমএফের একাধিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দাবি, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় চালানো ড্রোন হামলার জবাবে এ হামলা চালানো হয়েছে।

পিএমএফ জানিয়েছে, বাগদাদ, নিনেভে, বসরা, কিরকুক, কারবালা, দিয়ালা, ওয়াসিতসহ কয়েকটি প্রদেশে তাদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ২০ সদস্য নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছেন। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল–জাইদি পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিপরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি এ হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ এবং ইরাকের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরাকের ভূখণ্ড অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য বা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব মেটানোর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইরাকে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাই পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

* জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে আকস্মিকভাবে ইরানের হামলা।
* এ হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা ট্রাম্পের।

জর্ডানে ইরানের আকস্মিক হামলা

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে যৌথ হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ওপর আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। সেন্টকমের দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এসব হামলা প্রতিহত করেছে। জর্ডানের সেনাবাহিনীর দাবি, তারা পাঁচটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা নিশানা করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তিনটি ট্যাংকারেও হামলা চালিয়েছে। তবে আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি আরবের যৌথ হামলা, নাকি জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলা—কোনটি আগে হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, জর্ডানে প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছেন। নতুন করে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটির মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের অন্যতম প্রধান নিশানায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় সেনাদের মুঠোফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপের কথা ভাবছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তাদের আশঙ্কা, সেনাদের মুঠোফোনে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা ইরানকে হামলার নিশানা নির্ধারণ ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নে সহায়তা করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি আরবের যৌথ হামলার পর ইরাকের উত্তরাঞ্চলের নিনেভে প্রদেশের বারতাল্লায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি স্থাপনা। ২৯ জুলাই ২০২৬
ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের হুমকি

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার বিষয়ে আজ ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ‘এর জন্য তাদের (ইরান) চড়া মূল্য দিতে হবে।’ তাঁর দাবি, আকস্মিক হামলার জবাব দিতে মার্কিন বাহিনীর হাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল। তবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করেন, ইরাকে ইরান–সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি যৌথ হামলা ইরাকি সরকারের সমন্বয়ে চালানো হয়েছে। তিনি এসব গোষ্ঠীকে ‘বিশ্বের জন্য ক্যানসার’ বলে মন্তব্য করেন এবং ইরান–সমর্থিত অন্যান্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন।

যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা

হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনার ওমানের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, ওই প্রস্তাব তাদের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আল–জাজিরা জানিয়েছে, চলমান সংঘাত লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উপসাগরীয় দেশগুলো উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের জাতিসংঘে নিয়োজিত রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে গত মাসে সই হওয়া প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রতিশ্রুতি মেনে চলার আহ্বান জানান। ওই সমঝোতায় ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্ত করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্য দিয়ে তা এরই মধ্যে ভেঙে পড়েছে।