গাজায় ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের গোপন পদ্ধতি ফাঁস নতুন প্রামাণ্যচিত্রে
গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে হত্যায় কোন ধরনের গোপন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বেরিয়ে এসেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অন্দরের ২৪ জন সদস্যের জবানবন্দিতে। নতুন একটি প্রামাণ্যচিত্রে তাঁদের এসব চাঞ্চল্যকর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
অস্কারজয়ী ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোরের নতুন ছবি ‘নাজা’ (এনএজেডএ) গতকাল বৃহস্পতিবার ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। উৎসবটির মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন লায়ন’ পুরস্কারের লড়াইয়ে থাকা একমাত্র প্রামাণ্যচিত্র এটি।
ছবিটির নামকরণ করা হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি সংক্ষেপিত শব্দ থেকে। কোনো সামরিক হামলায় সম্ভাব্য নিহত সাধারণ নাগরিকদের বোঝাতে কৌশলে এ পরিভাষা ব্যবহার করে থাকে তারা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রযোজিত এ প্রামাণ্যচিত্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনাদের বিস্তারিত জবানবন্দি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁরা ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো ও দূরনিয়ন্ত্রিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগে সাংবাদিকদের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের শিল্পনির্দেশক আলবার্তো বারবেরা বলেন, ‘নাজা’ হবে ‘সত্যিই যুগান্তকারী’। তিনি একে রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও সিনেমার দিক থেকে অত্যন্ত চমৎকার একটি কাজ বলে আখ্যায়িত করেন।
ইসরায়েলের যুদ্ধসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ঝুঁকি এড়াতে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয়েছিল। রাজধানী তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে রাতে এসব সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। পরিচয় লুকিয়ে রাখতে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রামাণ্যচিত্রে অংশগ্রহণকারীদের চেহারা ও কণ্ঠ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়।
গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত বিভিন্ন গোপন কৌশলের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন সাক্ষাৎকারদাতারা। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক বিশেষ প্রযুক্তিও, যার মাধ্যমে হামাসের তুলনামূলক নিচু স্তরের বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য সদস্যকে চিহ্নিত করা হতো। এরপর পরিবারের সদস্যরাও নিহত হবেন জেনেও রাতের বেলা তাঁদের বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হতো।
নিশানা করা সম্ভাব্য হামাস যোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ইসরায়েলি বাহিনী তাঁদের ফোন হ্যাক করত। এরপর সপরিবার হত্যা করার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে তাঁদের কথোপকথন গোপনে শুনত তারা।
প্রামাণ্যচিত্রটিতে কিছু প্রত্যক্ষ বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর হিসাবেই প্রায় ২৫ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের ঘরে আছেন জেনেও পুরো এলাকা ধ্বংস করা, সুপরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার ঘটনা।
আমাদের দেশ যে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচার হত্যার জন্য দায়ী, তার নেপথ্যের কলকাঠি ও ব্যবস্থাগুলো খতিয়ে দেখার একটি দায়বদ্ধতা থেকে আমরা ছবিটি তৈরি করেছি। ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে আমাদের অবস্থানের জায়গা থেকে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি।
সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এমন এক গোপন গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করতেন, যা সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তরে বার্তা পাঠাত। এ ইউনিটের একজন বলেন, তাঁদের মূল মিশনই ছিল ‘শান্তি বিনষ্ট করা’।
পরিচালকদের এক যৌথ বিবৃতিতে আব্রাহাম ও জোর বলেন, ‘আমাদের দেশ যে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচার হত্যার জন্য দায়ী, তার নেপথ্যের কলকাঠি ও ব্যবস্থাগুলো খতিয়ে দেখার একটি দায়বদ্ধতা থেকে আমরা ছবিটি তৈরি করেছি। ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে আমাদের অবস্থানের জায়গা থেকে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি।’
পরিচালকেরা জোর দিয়ে বলেন, প্রামাণ্যচিত্রটির মূল লক্ষ্য ‘বিপথগামী সেনাদের দিয়ে সংঘটিত বিচ্ছিন্ন যুদ্ধাপরাধের’ ওপর ছিল না; লক্ষ্য ছিল সামরিক নির্দেশ, গৃহীত নীতি, এসব কার্যকর করার পেছনের যুক্তি এবং এ কাঠামোর ভেতরে থাকা মানুষগুলো উন্মোচন করা। অন্য কথায়, পুরো অবিচারমূলক ব্যবস্থা এবং সে ব্যবস্থার চালিকা শক্তি বা যন্ত্রের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশগুলো তুলে ধরা, কোনো একক ব্যক্তিকে দায়ী করা নয়।
প্রামাণ্যচিত্রটির সহপ্রযোজক ছিলেন জেমস উইলসন ও নির্বাহী প্রযোজক জোনাথন গ্লেজার। অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র ‘দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’–এর নেপথ্যেও ছিলেন তাঁরা।
সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন এমন এক গোপন গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করতেন, যা সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তরে বার্তা পাঠাত। এ ইউনিটের একজন বলেন, তাঁদের মূল মিশনই ছিল ‘শান্তি বিনষ্ট করা’।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি প্রকাশনা ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’, হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম লোকাল কল এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রথম প্রকাশিত তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘নাজা’। সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের ঝুঁকির কারণে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এটির চিত্রগ্রহণ ও প্রযোজনার কাজ করা হয়েছে। আর বৃহস্পতিবারের উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগপর্যন্ত এটির বিষয়বস্তু রাখা হয়েছিল কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে।
দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানী বিভাগের প্রধান ও ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক পল লুইস ‘নাজা’কে বর্ণনা করেছেন গাজায় ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহৃত ব্যবস্থাগুলোর উন্মোচন ও যাচাইয়ে বছরের পর বছর ধরে করা শ্রমসাধ্য এক কাজের চূড়ান্ত রূপ’ হিসেবে।
প্রামাণ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর আগে সাংবাদিকদের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের শিল্পনির্দেশক আলবার্তো বারবেরা বলেন, ‘নাজা’ হবে ‘সত্যিই যুগান্তকারী’। তিনি একে ‘রাজনৈতিকভাবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও সিনেমার দিক থেকে অত্যন্ত চমৎকার একটি কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেন।
বারবেরার বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ইতালির চিনেচিত্তা নিউজ লিখেছে, ‘এটি শুধু সাক্ষাৎকারের কোনো সাধারণ সংগ্রহ নয়; গাজায় অভিযান শুরুর সময় তাঁরা কী কাজ করেছিলেন, তা প্রকাশ করতে এ ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের রাজি করাতে তিন বছর লেগেছে। আর আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, তাঁদের জবানবন্দি রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো।’
২০২৩ সাল থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। আর আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ। এ দুই মিলিয়ে হতাহতের সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগের গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি।
খাদ্যের চালানে ইসরায়েলি বিধিনিষেধ গত গ্রীষ্মে গাজায় এক মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছিল। পাশাপাশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তিন-চতুর্থাংশের বেশি বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ায় বা ক্ষতিগ্রস্ত করায় বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনিরা এখন তাঁবুর শিবিরে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন; যেখানে বিশুদ্ধ পানি কিংবা স্যানিটেশনের সুবিধা নেই বললেই চলে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর গাজায় বর্বরতা শুরু করেছে দেশটি।
২০২৫ সালে সেরা প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে অস্কারজয়ী ‘নো আদার ল্যান্ড’ ছবির চার সহপরিচালকের দুজন ছিলেন আব্রাহাম ও জোর।
দুই ছবির মধ্যে যোগসূত্র টেনে পরিচালকেরা বলেন, ‘নো আদার ল্যান্ড’ প্রামাণ্যচিত্রে তাঁরা (ফিলিস্তিনি সহপরিচালক) বাসেল আদরা ও হামদান বালালকে সঙ্গে নিয়ে পাঁচ বছর কাটিয়েছেন। মূলত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা দখলদারত্ব ও জাতিগত আধিপত্যের একটি বৃহত্তর চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এ জন্য ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাগুলো তাঁরা বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত (ক্যামেরাবন্দী) করেছেন।
একইভাবে ‘নাজা’ প্রামাণ্যচিত্রে তাঁরা একটি ব্যবস্থার নানা সূত্র মিলিয়ে দেখেছেন। এতে দুই ডজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনার সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থার চিত্র, যা এমন এক অপরাধ ঘটাতে ব্যবহার করা হয়েছে, যাকে জাতিসংঘের একটি কমিশন ও বিশ্বের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো জাতিহত্যা বলে আখ্যায়িত করেছে।