ইরান যুদ্ধ সময়ে সময়ে নতুন মোড় নিচ্ছে। এতে এই সংকট সরকার, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষদের জন্য ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে সেসব নেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর, যাঁরা অনেক বেশি অনিশ্চিত আচরণ করেন।
এই নেতাদের একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এখন সম্ভবত ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও রয়েছেন। মোজতবা খামেনি সম্পর্কে এখনো তেমন কিছু জানা যায়নি এবং তিনি পরীক্ষিত নেতাও নন।
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরান যুদ্ধ নিয়ে মিশ্র বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি এ যুদ্ধকে ‘স্বল্পকালীন অভিযান’ বলে উল্লেখ করছেন যা ‘শিগগিরই’ শেষ হতে পারে। আবার তিনি এও বলেছেন, ইরান যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা অন্য কোনো মিত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ‘দীর্ঘ সময়ের’ জন্য না হারাবে, ততক্ষণ এই যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত হবে না।
তাহলে এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে কোনো সংকটের সময় সিএনএন প্রায়ই মার্কিন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সম্ভাব্য সমাপ্তির তিনটি দৃশ্যপট বা মডেল তৈরি করে— সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি (বেস কেস), সেরা সম্ভাবনা (বেস্ট কেস) এবং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি (ওর্স্ট কেস)। সরকারি তথ্য ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্লেষণটি এমন দাঁড়াতে পারে:
১. সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট (৬০%): ইরানকে কোণঠাসা করা—নব্বইয়ের দশকের ইরাকের মতো
এই দৃশ্যপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেনাবাহিনীকে ইরানের শক্তি প্রদর্শন বা প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা দুর্বল করার তাঁর নির্দেশিত মিশন সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সময় দেবেন। এর মানে দাঁড়ায়, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কাগুলো যথেষ্ট পরিমাণে সামলে রাখতে পারবে এবং প্রেসিডেন্ট তাঁর নির্দেশিত মিশনের প্রতি অটল থাকবেন।
এমন পরিস্থিতিতে ধরে নেওয়া হচ্ছে, এ মাসের শেষ নাগাদ ইরানের শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো অক্ষত থাকবে।
এই সময়ে তীব্র সামরিক অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ অভিযান তার নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করেছে। কিন্তু তেহরানে ইসলামি শাসনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তনের নিশ্চয়তা থাকবে না।
এরপর দেশটির নতুন সরকার যতক্ষণ না এবং যদি না তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করতে সম্মত হয় না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বহাল থাকবে। উভয় কর্মসূচির ওপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আছে, যা অব্যাহত থাকবে।
ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সম্ভাব্য অন্যান্য অংশীদারদের সামরিক উড়োজাহাজ সীমিত ঝুঁকি নিয়ে ইরানের আকাশে টহল দেবে। তেহরান যদি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় চালুর চেষ্টা করে, তবে যখন ইচ্ছা সেখানে হামলা চালানো যাবে; যা মূলত তাদের এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখবে।
আগামী কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত এই ‘বেস কেস’ বা সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপটটি হতে পারে নব্বইয়ের দশকের ইরাকের মতো— দুর্বল, কোণঠাসা এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় মাথার ওপর সদা সতর্ক মার্কিন পাইলট।
এই পরিস্থিতি ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) নিশ্চয়তা দেবে না। তবে দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে আরও বিক্ষোভ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাসনযন্ত্রের ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রাখতে হবে।
২. সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি (৩০%): এখনকার চেয়ে আরও শক্তিশালী ইরান
এই দৃশ্যপটটি হতে পারে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে গিয়ে যদি সামরিক বাহিনী তাদের কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেভাগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে জয় ঘোষণা করতে বাধ্য হন।
এমন পরিস্থিতিতে ইরান আবার নিজের শক্তি কাঠামো পুনর্গঠন করবে—আঘাতে জর্জরিত হয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং পুনরায় সবকিছু শুরু করার মতো যথেষ্ট সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকবে।
এতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আরও কমে যাবে। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলো সবসময় এমন এক ইরানের হামলার হুমকির মুখে থাকবে, যার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। তেহরান সেগুলো ব্যবহার করতে ইচ্ছুক, সে প্রমাণ তারা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে পারে। হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা উপসাগরীয় অংশীদারদের প্রতিরক্ষায় তাদের আরও মার্কিন সহায়তার প্রয়োজন পড়বে। অংশীদারদের ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার সামর্থ্য শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে এই সামরিক অভিযান শেষ করতে হবে।
নতুন ভারসাম্য স্থাপনের আগে এই অঞ্চলে ব্যবসা করার খরচ দ্রুত বেড়ে যাবে। জাহাজে পণ্য পরিবহন বিমার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন বিনিয়োগে ঝুঁকি বৃদ্ধি ব্যবসায় ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হবে। আর এই নতুন ভারসাম্য তৈরির ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী এক ইরানকে মাথায় রাখতে হবে, যেখানে ক্ষমতা কাঠামোয় কট্টরপন্থীদের প্রভাব বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার বলেছিলেন, কোনো সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়কেরই যুদ্ধের সম্ভাব্য সব পরিণতি ‘নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে কঠোরভাবে’ বিশ্লেষণ না করে চূড়ান্ত সামরিক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কারণ যুদ্ধ শুরু হলে গেলে, তা অপ্রত্যাশিতভাবে এগোতে পারে এবং পরিকল্পনার বিপরীত ফলাফল বয়ে আনতে পারে।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, সেটা ইরান যুদ্ধ নিয়ে যে কোনো পূর্বাভাসেই বলা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে যে কোনো প্রশাসনের সময়ই এটা হতো। ট্রাম্প প্রশাসন এই অর্থনৈতিক ধাক্কার মাঝেও নিজের সামরিক অভিযান শেষ করার দৃঢ় সংকল্প দেখাচ্ছে, যেটা সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপটে বলা হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ ইঙ্গিতও দিয়েছেন, যে কোনো মুহূর্তে বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
যদি সত্যিই মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের কাজ শেষ করার আগেই কৌশল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্যকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
এই যুদ্ধ শুরু করার যে যুক্তিই থাকুক না কেন, অভিযান তাড়াহুড়ো করে শেষ করলে তা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে আরও সাহসী করে তুলতে পারে। এতে ওই অঞ্চল ও বিশ্ব ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।
৩. সেরা সম্ভাবনা: নতুন ইরান ও নতুন মধ্যপ্রাচ্য (১০%)
এই দৃশ্যপট হতে পারে ইরানের ওপর সামরিক চাপ অব্যাহত রেখে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোয় আঘাত হানা, সরকারকে দুর্বল করে দেওয়া, দেশটির বিরোধীদের মনোবল বাড়ানো যাতে তারা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভের মাধ্যমে বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের দাবি তোলে।
জানুয়ারি মাসের সহিংস দমনপীড়নে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সেই ঘটনা না ঘটলে এই পরিস্থিতির (সরকার পরিবর্তনের) ভালো সম্ভাবনা থাকত। নিকট ভবিষ্যতে ইরানিরা তখনই বিপুল সংখ্যায় রাজপথে ফিরে আসতে পারে, যদি তেহরানের নিপীড়ক বাহিনী হিসেবে পরিচিত বাসিজ মিলিশিয়া এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) উল্লেখযোগ্যভাবে এবং দৃশ্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে তা করা কঠিন।
ইতিহাসে এর আগেও দেখা গেছে, সাধারণত বাইরে থেকে সামরিক চাপে কোনো দেশের শাসন ব্যবস্থার দ্রুত পতন সম্ভব হয় না, যদি না অভ্যন্তরীণভাবে বিরোধীদের সংগঠিত ও সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে না ওঠে।
যদিও এই অভিযান মূলত সীমান্তের বাইরে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে সীমিত করার লক্ষ্যে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের জন্য এটা পর্যাপ্ত নয়। আর এটা সম্ভব করতে হলে মার্কিন স্থলবাহিনী বা সংগঠিত বিরোধী শক্তি প্রয়োজন হবে।
আর এই দুটির কোনোটিই এই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনায় সম্ভবত নেই। এ দুটি ছাড়া নিকট ভবিষ্যতে তেহরানে শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা খুবই কম।
তিনটি সম্ভাবনা একসঙ্গেও ঘটতে পারে
এই দৃশ্যপটে তিনটি সম্ভাবনার একটিকে অন্যটির বিরোধী মনে করা হচ্ছে না। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের নামমাত্র প্রধান হয়ে থাকতে পারেন। তিনি ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে নিজের হাতে তুলে নিতে পারবেন কি না তা বোঝা যাচ্ছে না কিংবা তিনি নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সুযোগও সৃষ্টি করতে পারেন।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ১৯৭৯ সালে পারিবারিক শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু এখন মোজতবা খামেনি প্রাথমিকভাবে তাঁর প্রয়াত বাবার উত্তরাধিকার হিসেবে ইরানের সর্বোচ্চ পদের দাবিদার হয়েছেন।
সেক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে, দীর্ঘ মেয়াদে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তখন ইরানি জনগণই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। শেষ পর্যন্ত এই শাসনব্যবস্থা থেকে তারা বেরিয়ে আসবে।