ধ্বংসস্তূপের গাজায় মৌমাছিরা যে ফুলের খোঁজে ফেরে
চারদিকে চোখ রাখলে মনে হয়, শহরটি যেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপ। ভাঙা কংক্রিট, পোড়া দেয়াল, গুলির ক্ষত, বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন ভবন—সব মিলিয়ে গাজায় মৃত্যু ও ধ্বংসের এক দীর্ঘ নীরবতা। এই নীরবতা ভেঙে মাঝেমধ্যে যেমন শোনা যায় বুলেট ও ভবন ভেঙে পড়ার বিকট শব্দ; সব হারানো মানুষের আর্তচিৎকার, কান্না। তেমনই শোনা যায় আরেকটি শব্দ; সেটি হলো ‘ভনভন’। এই শব্দে ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে মৌমাছি।
গাজার আকাশে এখনো যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যায়। যুদ্ধ এই শহরের শুধু ভবন আর মানুষের জীবনই তছনছ করেনি। ধ্বংস করেছে জলপাই বন, কমলার বাগান, গুলবাহার আর বুনো ফুলে ভরা প্রান্তর। ধ্বংসস্তূপের নিচে হারিয়ে গেছে সেই সবুজ, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে মৌমাছি। সেই গাজায় এখনো মৌমাছি উড়ছে। মানে হত্যার দৃশ্যের মধ্যে ধ্বংস্তূপের কোথাও না কোথাও ফুল ফুটে আছে।
ফুলের ডাকহরকরা হলো মৌমাছি, তারা পরাগবাহক। ফুল থেকে ফুলে ঘুরে ঘুরে তারা আদান-প্রদান করে গোপন পরাগ। আর এর মাধ্যমে বংশের বিস্তার ঘটে উদ্ভিদের, সবুজের। আবার সেই সবুজেই বাঁচে মৌমাছি। ফুলের এই ডাকহরকরার মূল খাবার ফুলের মধু আর পরাগরেণু। আর খায় পাকা ফলের রস, মৌ-রুটি (পরাগরেণু ও মধু মিশিয়ে এবং পচিয়ে মৌমাছিরা একধরনের খাবার বানায়) ও রয়েল জেলি (রানি মৌমাছির জন্য বিশেষ একধরনের পুষ্টিকর খাবার, যা শ্রমিক মৌমাছির গ্রন্থি থেকে তৈরি হয়)। এসব খাবারের মূল উৎস ফুল। তাই ফুল আর মৌমাছি—একে অন্যের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।
কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় তারা বেঁচে আছে, ভনভন করে উড়ছে। মানে ধ্বংসস্তূপে ফোটা ফুলের ঠিকানা পেয়েছে মৌমাছি অথবা ওই সব ফুল পেয়েছে তাদের ডাকহরকরার খোঁজ। এবার হবে তাদের বংশের বিস্তার। আর তাই যুদ্ধবিরতির আওতায় নির্ধারিত ‘হলুদ রেখা’ (ইয়েলো লাইন) বা সামরিক সীমারেখাকে চোখ রাঙিয়ে মাথা উঁচু করে ফুটছে ফুল, নেচে নেচে উড়ছে মৌমাছিও। যেন তারা গাজার মানুষকে বলছে—এই পোড়া শহরে আবার ফিরিয়ে আনব সবুজ। আবার জাগবে প্রাণ। তোমরাও জাগো।
মৌমাছিপ্রেমী ইব্রাহিম নাজি আল-দাব্বা তাই ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। গাজার লাখো ফিলিস্তিনির মতো ইব্রাহিমও পুরো যুদ্ধে বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শেষমেষ যুদ্ধে ঘর হারানো ইব্রাহিম পরিবারসহ আশ্রয় নিয়েছেন গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকায়। এ শহরেরও কোনো বাড়ি আর অক্ষত নেই।
তবু ভোরের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইব্রাহিম ভাঙাচোরা সিঁড়ি বেয়ে ধসে পড়া একটি ভবনের ছাদে উঠে দাঁড়ান। সেখানে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নে ভরা ভাঙাচোরা কংক্রিটের চারপাশে রাখা সারি সারি মৌচাক। ফুল নেই, তবু সেখান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি বেরিয়ে ইব্রাহিমের চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। যেন ভনভন সুরে মৌচাষি ইব্রাহিমকে তারা বলছে, ‘মানুষ তুমি যুদ্ধ থামাও। ফুল ফোটাও। এ পৃথিবী সবুজ করো। নিজে বাঁচো, আমাদের বাঁচাও।’
ধসে পড়া এ বাড়িতে এখন আর কেউ থাকেন না। কারা থাকত, তাঁরা আদৌ বেঁচে আছেন কি না, তা-ও জানেন না ইব্রাহিম। তিনি জানেন, এমন ভাঙাচোরা বাসার ছাদ মৌমাছি পালনের উপযুক্ত জায়গা নয়। এই সংকটকালে কেউ মৌমাছির বাক্সগুলো জ্বালানি হিসেবে বা আসবাব বানানোর জন্য নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ধসে পড়া এই বেওয়ারিশ ছাদ ছাড়া তাঁর কাছে আর কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। তাই এই ছাদেই মৌমাছিদের আস্তানা গড়ে দিয়েছেন সাত সন্তানের বাবা ৪৯ বছর বয়সী ইব্রাহিম। এই ছাদ থেকে যত দূর চোখ যায়, শুধু দেখা যায় প্রায় জনমনুষ্যহীন শহরটি ধসে পড়া ভবনের ভারে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
ছাদে রাখা বাক্স থেকে আলতো করে একটি চাকের ফ্রেম তুলে ধরেন ইব্রাহিম। সেখান থেকে মৌমাছিরা উড়ে যাচ্ছে দূরে, ফুলের ঠিকানায়। ফুল থেকে ফলসম্ভার করে ঠিকঠাক মতো আবার তারা ফিরে আসবে চাকে। চোখে মমতা আর মুখে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে ধীরস্বরে ইব্রাহিম বলেন, ‘মৌমাছির জন্য গাছ লাগে। অথচ আমরা এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মৌমাছি পালন করছি।’
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইব্রাহিমের জীবনের সঙ্গে মৌ চাষ জড়িয়ে আছে বহু বছর ধরে। এটা তাঁর বাপ-দাদার পেশা। তাই আজকের এ মৌমাছির ফিরে আসাকে তিনি শুধু মধু উৎপাদনের দিক থেকে বিবেচনা করছেন না। তাঁদের টিকে থাকার, ফিরে দাঁড়ানোর ও জীবনের প্রতীক হিসেবেও দেখছেন।
যুদ্ধের আগে পূর্ব গাজাজুড়ে ইব্রাহিমের ৪০০টির বেশি মৌচাকের বাক্স ছিল। ছিল আধুনিক মৌ খামার, মধু সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার সরঞ্জাম, সংরক্ষণাগার এবং একটি গাড়ি। সব মিলিয়ে জমে উঠেছিল তাঁর মৌ চাষের ব্যবসা, যা দিয়েই চলত সংসার। তারপর যুদ্ধ এল। যুদ্ধ ধ্বংস করে দিল তাঁর সব। যার বাজারমূল্য সাড়ে তিন লাখ ডলার।
গত বছরের যুদ্ধবিরতির পর ইব্রাহিম ভেবেছিলেন, আবার ফিরে পাবেন বাপ-দাদার পেশা। কিন্তু খামারে গিয়ে তিনি ধ্বংসাবশেষই শুধু দেখলেন। ‘মৌমাছি নেই, চাক নেই, যন্ত্রপাতি নেই। আবার শুরু করার মতো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না’—এভাবেই বলেছেন তিনি।
সীমান্তঘেঁষা কৃষিজমিগুলো এখন ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ইয়েলো লাইন টেনে মানুষের যাতায়াত সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ লাইনের ভেতরে পড়েছে কৃষিজমি। সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে বাগানগুলো একসময় হাজার হাজার মৌমাছির বিচরণভূমি ছিল, ইয়োলো লাইন তার দুর্গম দূরত্ব বাড়িয়েছে। মানুষ যে মৌমাছির যত্নআত্তি করবে, সে সুযোগও প্রায় নেই গাজায়।
এরপরও এত বড় যুদ্ধ ও জাতিহত্যা দিয়েও ইব্রাহিমকে মৌমাছিদের থেকে আলাদা করা যায়নি। কারণ, তিনি হয়তো জানেন, ধ্বংসের চেয়ে মানুষের সৃষ্টির ইতিহাস অনেক বেশি। তাই যেটুকু অর্থ বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন, তা দিয়ে এই দুর্মূল্যের বাজার থেকে মাত্র তিনটি মৌ বাক্স কিনেছিলেন। এতেই খরচ হয়েছিল ৩ হাজার ডলারের বেশি। ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে সেই তিনটি মৌ-কলোনি বেড়ে হয়েছে ৩৫টি।
গাজার মৌচাষি সমবায় সমিতির সভাপতি ইব্রাহিম। তাঁর মতো অন্য মৌচাষিরাও এখন আর মধু সংগ্রহের স্বপ্ন দেখেন না। তাঁরা লড়ছেন মৌমাছিগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কেউ একটি মৌচাক ভাগ করে দুটি বানাচ্ছেন, যেন মৌমাছির সংখ্যা অন্তত না কমে। কেউ কৃষিজমিতে যেতে না পেরে বাড়ির ছাদেই বসিয়েছেন মৌচাক। যেখানে ফুল ফোটেনি, সেখানে তো মানুষের জন্য ত্রাণ আছে। ত্রাণের সেই চিনি মিশিয়ে কৃত্রিম খাবার বানিয়ে মৌমাছিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। কারণ, তাঁরা জানেন, বর্ণিল মৌমাছি না থাকলে প্রকৃতি সবুজ হবে না, ধরণিতে ফুটবে না সুন্দর ফুল। আর সবুজ প্রকৃতি, ফুল ও মৌমাছি ছাড়া মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় গাজার আকাশে বসন্ত এলেই ফুলের গন্ধে ভরে উঠত মৌমাছির পথ। কৃষি প্রকৌশলী ও মৌচাষি রাতেব সাম্মুর বলেন, যুদ্ধের আগে গাজায় প্রায় ৩০ হাজার মৌচাক ছিল। কয়েক বছর আগেও বছরে প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন মধু উৎপাদিত হতো। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফুল ফোটার সময় বদলে যাওয়ায় সেই উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছিল।
কিন্তু যুদ্ধের ধাক্কা আরও নির্মম জানিয়ে সাম্মুর বলেন, এখন পুরো গাজায় টিকে আছে মাত্র সাত শতাধিক মৌচাক। মধু উৎপাদনও নেমে এসেছে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মাত্র ১০ শতাংশে।
মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে আরেক মৌচাষি ফাহাদ আল-দাহদুহের এখন দিন কাটে ভাঙা মৌচাক জোড়া লাগিয়ে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন কাঠের বাক্স, ভাঙা ঢাকনা, ছড়িয়ে থাকা তলার কাঠ কুড়িয়ে আনেন। সেগুলো আবার হাতুড়ি-পেরেক দিয়ে জোড়া দিয়ে মৌমাছির বাক্স তৈরি করার চেষ্টা করেন।
৩২ বছর বয়সী এই মৌপাল বলেন, ‘যা পেয়েছি, সব কুড়িয়ে এনেছি। বাক্স, ঢাকনা, এমনকি নিচের কাঠও। আবার জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছি।’
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার কোথাও না কোথাও ফুল ফুটছে। মৌমাছিরা ইয়েলো লাইন বোঝে না। কিন্তু বারুদ পোড়া গন্ধের ভেতরও ঠিক ঠিক সেই ফুলের ঘ্রাণ বুঝে নিতে পারে। সেখান থেকে আগামীর রসদ সংগ্রহ করে বোমা বিস্ফোরণের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে থাকা আকাশ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসছে নিজস্ব চাকে। আর ইব্রাহিমরা কান পেতে তাদের গুনগুন গুঞ্জরণ শুনে নিজেদের সাহসের পাল্লা ভারী করে তুলছেন। কারণ, মৌমাছিদের দেখে ইব্রাহিমের শুধুই গাজার মানুষের কথা মনে হয়; যাঁরা বারবার ধ্বংস হতে হতে এগিয়ে যাচ্ছেন আরেক জীবনের দিকে।
সূর্য তখন আরও ওপরে উঠেছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে মৌচাকের মুখে অবিরাম যাতায়াত করছে মৌমাছিরা। চারদিকে মৃত্যু আর ধ্বংসের স্মৃতি, কিন্তু তাদের ডানায় লেগে আছে বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত জেদ। হয়তো সেই জেদই নিজের জীবনের ঝুঁকির মুখেও ইব্রাহিমদের প্রতিদিন ভাঙাচোরা ছাদে ফিরিয়ে আনে।