যুবরাজের একের পর এক ভুল হিসাব—সৌদি আরব কীভাবে নতুন করে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল

ইয়েমেনে সৌদি আরবের নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে একের পর এক ভুল হিসাব। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে জোট ভাঙন, হুতিদের মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি এবং ট্রাম্পের অনিশ্চিত ভূমিকা রিয়াদকে আরও বিপাকে ফেলেছে। কমবেশি সামরিক সাফল্য এলেও সৌদির বিভক্ত মিত্রবাহিনী ও রাজনৈতিক সমাধানের অভাবে এ সংঘাতের শেষ কোথায়, তা এখনো অনিশ্চিত।

সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর এক যোদ্ধা গাড়িতে বসানো অস্ত্র থেকে গুলি ছুড়ছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে অগ্রাভিযানের সময় গত সোমবার ধারণ করা ভিডিও থেকে নেওয়া স্থির চিত্র এটি। ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশের ধুবাবের কাছেছবি: রয়টার্স

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর দেশকে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, পর্যটন ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর প্রধান আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তবে তাঁর সেই আকাঙ্ক্ষায় এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়েমেন থেকে ইরান–সমর্থিত হুতিদের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র।

এসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র এখন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে আঘাত হানছে। ফলে যুবরাজ যে আঞ্চলিক অশান্তি পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চেয়েছিলেন, এখন বাধ্য হয়ে সেই সংঘাতের গভীরেই জড়িয়ে পড়ছে তাঁর দেশ।

গত কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত অবস্থা ভেঙে চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে এবং গত মাসে তা তীব্র রূপ নিয়েছে। সৌদি আরব ১১ বছর ধরে সামরিক শক্তি ও কূটনীতি—উভয়টির মাধ্যমে তাদের দক্ষিণ সীমান্তের এ সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে আসছিল। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রিয়াদ প্রথমে ইরানের মিত্র হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, পরে তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালায় এবং হুতিদের মূল পৃষ্ঠপোষক ইরানের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত সব প্রচেষ্টার পরও ধারাবাহিকভাবে কিছু ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে রিয়াদ ইয়েমেনের এ নতুন সংঘাতের মুখে নিজেদের অরক্ষিত করে ফেলেছে। ইয়েমেনের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার জের ধরে গত বছরের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সৌদি আরব তাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের অবসান ঘটায়। এ ছাড়া সংকটের সময় পাশে পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদিচ্ছাকে মূল্যায়ন করতেও রিয়াদ ভুল করেছে। আবার ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলগুলোকে এক সুতোয় গাঁথতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে সৌদি আরবকে।

সৌদি আরব এখন ইয়েমেনের হুতিবিরোধী স্থানীয় অংশীদারদের সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু হওয়া এ সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়েমেন্স ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’।

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এখন ইয়েমেনের হুতিবিরোধী স্থানীয় অংশীদারদের সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে শুরু হওয়া এ সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়েমেন্স ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’।

এক দশকের বেশি সময় আগে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুবরাজ বিন সালমানের সৌদি আরবকে বদলে দেওয়ার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমানে সৌদির তেল অবকাঠামোয় বহুমুখী হামলার কারণে তেল রপ্তানি কমে যাচ্ছে, বড় বড় প্রকল্প বাতিল করতে হচ্ছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট পথ ছাড়াই দেশটি একটি যুদ্ধের দিকে টানাহেঁচড়ার শিকার হচ্ছে। ফলে যুবরাজের সেই পরিকল্পনাগুলো এখন আরও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে।

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মুকাল্লায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক যান। বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) বাহিনীকে সহায়তা দিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত এসব যান পাঠিয়েছিল বলে জানা গেছে। ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫
ছবি: এএফপি

সৌদি আরবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে দেশটির কয়েকটি বিমানবন্দরে হুতি বাহিনীর হামলায় একজন সৌদি পাইলটসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। আঞ্চলিক এই অস্থিরতার কারণে দেশটিতে এ বছর তারকাবহুল চলচ্চিত্র উৎসব, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও কনসার্ট স্থগিত করতে হয়েছে। অন্যদিকে চলতি অক্টোবরের শেষে সৌদির ফ্ল্যাগশিপ আর্থিক সম্মেলন (মরুভূমির দাভোস নামে পরিচিত) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের এ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক এ হামলার কারণে সম্মেলনটি এখন চরম চাপের মুখে পড়েছে।

সৌদি আরবের শুধু এতটুকুই দরকার ছিল, যেন ইয়েমেন সংঘাত তাদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকে এবং হুতিরা যেন তাদের (সৌদি আরব) রূপান্তর পরিকল্পনা ব্যাহত করতে না পারে। কিন্তু এখন রিয়াদ নিজেদের এ সংঘাতের ঠিক মাঝখানে আবিষ্কার করছে।
—মাইকেল র‍্যাটনি, সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরবের শুধু এতটুকুই দরকার ছিল, যেন ইয়েমেন সংঘাত তাদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকে এবং হুতিরা যেন তাদের (সৌদি আরব) রূপান্তর পরিকল্পনা ব্যাহত করতে না পারে। কিন্তু এখন রিয়াদ নিজেদের এ সংঘাতের ঠিক মাঝখানে আবিষ্কার করছে।’

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকস্মিক বিদায়

গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঠানো সামরিক যানের একটি চালানের ওপর সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান হামলা চালালে দুই দেশের এক দশকের পুরোনো জোটে ফাটল ধরে। ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব রুখতে এ দুই দেশ একসঙ্গে লড়ছিল। তবে ওই ঘটনার পর আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিলে সৌদি আরব ইয়েমেন সংকটে একেবারে একা হয়ে পড়ে।

ইউএইর সঙ্গে এ সম্পর্কচ্ছেদ পুরো অঞ্চলকে চমকে দিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরবের আরেক বড় ভুল হিসাব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (ন্যাটোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও, নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় রিয়াদ হতাশ হয়েছে।

সৌদি আরব তখন এ প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এক বিরল গণমাধ্যম যুদ্ধ শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে সুদান ও ইয়েমেনে অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সৌদির বিশ্লেষকেরা প্রকাশ্যে ইউএইকে এমন এক ছোট ভাই হিসেবে চিত্রায়িত করতে থাকেন, যে কিনা বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রখ্যাত সৌদি সাংবাদিক দাউদ আল-শিরিয়ান লিখেছিলেন, সৌদি আরব হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, যার ওপর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘যদি (সৌদি আরব) হোঁচট খায়, তবে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে ও উপসাগরীয় অঞ্চল ছিটকে যাবে।’

রিয়াদ যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য চাপ দিচ্ছিল, তখন ইয়েমেনের পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। হুতিদের সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধবিরতি এমনিতেই নড়বড়ে ছিল। তার ওপর রিয়াদের দাবিতে ইউএইর দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের ফলে এক চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কারণ, ইয়েমেনে যে হাজার হাজার যোদ্ধা এক দশক ধরে আবুধাবির অধীনে লড়াই করছিলেন, তাঁরা সৌদির নতুন কৌশল ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

আরব আমিরাতের মিত্র যোদ্ধাদের দাবি, আবুধাবির চলে যাওয়ার ফলে ইয়েমেন যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সৌদিরা তা পূরণ করতে পারেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমিরাতিরা (ইউএইর সেনা) যখন চলে যায়, তখন দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে হয়নি। এরপর পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে, তা সত্যিই ভয়াবহ। আমিরাতের সেনা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দক্ষ, সৌদিরা সেই দক্ষতার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।’

হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে লড়াইরত বাহিনীগুলো পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছিল কি না ও দায়িত্ব হস্তান্তর ঠিকঠাক হয়েছিল কি না, তা জানতে সিএনএন সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (বাঁয়ে) ১৫ সেপ্টেম্বর মিসরের রাজধানী কায়রোতে দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন
ছবি: মিসরের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়

প্রস্তুতির ঘাটতি

ইউএইর সেনা প্রত্যাহারের আট সপ্তাহ পরই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্র ইসরায়েল, যা এ অঞ্চলে নজিরবিহীন অশান্তি ডেকে এনেছে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের ফলে সৌদি আরবসহ মার্কিন মিত্ররা সরাসরি ইরানের নিশানায় পরিণত হয়।

বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মত, সৌদির জন্য ওই সময়টা ছিল খুবই দুর্ভাগ্যজনক। ইয়েমেনে ইউএইর মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চাপ সামলানোর পরপরই সৌদি আরবকে এ আঞ্চলিক যুদ্ধের (ইরান যুদ্ধ) মুখোমুখি হতে হয়। বছরের পর বছর ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করলেও, ইরানের ওপর ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের ফলে ইরানপন্থী হুতিরা যে সৌদির ওপর চড়াও হবে, তা একরকম নিশ্চিতই ছিল।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত র‍্যাটনি বলেন, নিজের ভূখণ্ডে শত্রু বাহিনীর হামলার পর সৌদিদের পাল্টা জবাব দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না...তাই এখানে একটি প্রতিক্রিয়া হওয়াটা অবধারিত ছিল।’

পূর্ব দিক থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সৌদিতে আঘাত হানলেও, রিয়াদের পুরো মনোযোগ ছিল দক্ষিণে ইয়েমেন সীমান্তে। হুতিরা তখনো সৌদির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে থাকায় প্রথমে তাদের ইরানি মিত্রদের সাহায্য করতে অনিচ্ছুক বলেই মনে হচ্ছিল। তবে তেহরান সৌদিদের এ যুদ্ধে (হুতিদের সঙ্গে লড়াইয়ে) টেনে আনে।

যে সামরিক বাহিনী মার্কিন অংশীদারত্বকে কেন্দ্র করে তাদের ‘সমগ্র বিশ্বদর্শন’ গড়ে তুলেছে, সেই সৌদিরা এখন বুঝতে পারছে ট্রাম্প কতটা অপ্রত্যাশিত। নিজেদের শক্তিতে একা একা এ যুদ্ধগুলো লড়া কখনোই তাদের সামরিক কৌশল বা কাঠামোর মধ্যে ছিল না।

গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে সৌদির বিমান অবরোধ অমান্য করে হুতিদের একটি প্রতিনিধিদলকে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় নিয়ে আসার জন্য একটি বাণিজ্যিক বিমান পাঠায় ইরান। বিমানটিকে অবতরণে বাধা দিতে সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায় রিয়াদ। এর জবাবে বিদ্রোহী হুতি গোষ্ঠী যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয় ও সৌদির জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে এক ঝটিকা অভিযান শুরু করে। নিয়ন্ত্রণে নেয় গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ কৌশলগত এ অঞ্চলের। ২০২২ সালের পর এটিই ছিল ইয়েমেনে সবচেয়ে বড় সংঘাতের ঘটনা।

হুতিরা সৌদির তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে হামলা চালালে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরব বেশ কিছু ভুল ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’ রিয়াদ হুতিদের এমন আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং মিত্র ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের কোনো সমন্বয় ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আহমেদ নাগি আরও বলেন, ‘(ইয়েমেনে) যেসব অঞ্চল হাতছাড়া হয়েছে, তার ফলে মিত্রদের মনোবল ভেঙে গেছে। এটি এখন সৌদিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, হুতিদের কাছে এখন আরও উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যা সৌদির বেশ কয়েকটি শহরে আঘাত হানতে সক্ষম।’

‘অনিশ্চিত’ ট্রাম্পের ওপর ভরসা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরবের আরেকটি বড় ভুল হিসাব ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (ন্যাটোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও, নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় রিয়াদ হতাশ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেন ও হুতিদের ওপর হামলা চালানোর অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো ওয়াশিংটন ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। এ বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল, এ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব যুদ্ধবিরতি রক্ষা করা। হুতিরাও এটি স্পষ্ট করে দেয় যে তাদের লড়াই শুধু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। ফলে লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই অবাধে চলাচলের সুযোগ পায়।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, যে সামরিক বাহিনী মার্কিন অংশীদারত্বকে কেন্দ্র করে তাদের ‘সমগ্র বিশ্বদর্শন’ গড়ে তুলেছে, সেই সৌদিরা এখন বুঝতে পারছে ট্রাম্প কতটা অপ্রত্যাশিত।

র‍্যাটনি আরও বলেন, ‘নিজেদের শক্তিতে একা একা এ যুদ্ধগুলো লড়া কখনোই তাদের সামরিক কৌশল বা কাঠামোর মধ্যে ছিল না। সাধারণ কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমলে এমন পরিস্থিতি হলে, আমরা একটি যৌক্তিক ও সুচিন্তিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের অংশীদারকে (সৌদি আরব) সাহায্য করতাম।’

র‍্যাটনি বলেন, ‘এখন আমাদের সেই প্রক্রিয়া নেই এবং সবকিছু শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ের ওপরই এসে ঠেকেছে, তা হলো ট্রাম্প কী ভাবছেন? আর এর ফলেই সৌদি আরব সম্ভবত নিজেদের অরক্ষিত বোধ করছে।’

হুদাইদা শহরের দক্ষিণে হায়েস এলাকায় পিকআপে করে যাচ্ছেন সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর অনুগত যোদ্ধারা। ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ছবি: এএফপি

এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব অন্যদিকে নজর দিয়েছে। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে দেখা করতে কায়রো যান। এর কয়েক সপ্তাহ পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান। ফ্রান্স তাদের সামরিক কর্মীসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েনে রাজি হয়েছে। যুক্তরাজ্য বলেছে, সৌদি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ পাঠাবে তারা। এ ছাড়া নবগঠিত যৌথ বাহিনী কমান্ডের অধীনে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার জন্য বর্তমানে ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদিতে কাজ করছেন।

রিয়াদে এক জরুরি বৈঠকের পর গত সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র অধীন ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করতে’ সম্মত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে করা এ চুক্তির উদ্দেশ্য, এ তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া ইউএইর অনুগত ইয়েমেনি বাহিনীও হুতিবিরোধী এ অভিযানে অংশ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যা সৌদি ও ইউএইর মধ্যকার সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলার আভাস দিচ্ছে।

আঞ্চলিক সমাধান জরুরি

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাইরের দেশের সমর্থন এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের প্রাথমিক সাফল্য চলতি সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করতে পারবে না। বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখনো খুবই সাধারণ বিষয় এবং যুদ্ধের (সৌদি–হুতি লড়াই) কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিণতি এখনো দৃশ্যমান নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যেতে হলে সুশৃঙ্খল সংগঠন, আঞ্চলিক সমর্থন, তহবিল ও লজিস্টিকস বা রসদ সহায়তার প্রয়োজন, যা বর্তমান সৌদি জোট ধরে রাখতে পারবে কি না, এখনো নিশ্চিত নয়।

ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেন–বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি সিএনএনের বেকি অ্যান্ডারসনকে বলেন, ‘তাদের কমান্ড সেন্টারগুলো একীভূত করতে হবে এবং এ জোটের ভেতরের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার যদি (হুতিদের কাছ থেকে) মুক্ত করা অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারে, তবে এ ভূখণ্ডগত অর্জনের কোনো মূল্য থাকবে না।’

অনেক বিশেষজ্ঞ অবশ্য মনে করেন, ইয়েমেনের এ লড়াই মূলত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। আর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এ সংঘাত যত দিন চলবে, তত দিন সৌদি আরবকে বিপর্যস্ত রাখতে হুতিদের উসকে দেওয়ার শক্তিশালী কারণ ইরানের থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে আলাদা কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে অথবা হুতি নেতৃত্বকে নির্মূল করতে তাদের সামরিক হামলা আরও জোরদার করতে পারে।

তবে র‍্যাটনি বলেন, ‘এ দুটি পরিস্থিতির কোনোটিই নিকট ভবিষ্যতে ইয়েমেন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করবে না। সৌদি আরবকে শুধু একটি ত্রুটিপূর্ণ পথ ধরেই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।’

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্