হুতিদের অগ্রযাত্রায় কারও লাভ, কারও ক্ষতি

সশস্ত্র হুতি যোদ্ধাফাইল ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পুরোটা এখন দেশটির হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। গত সপ্তাহান্তে তারা বন্দরনগর মোখা দখল করে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন (পেরিম) দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নেয়।

এখন আফ্রিকার উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে হুতি বাহিনী। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপরও তাদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়েমেনের বাইরে হুতিরা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই। তবে এই যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে আফ্রিকা মহাদেশেও পড়তে শুরু করেছে।

আরও পড়ুন

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) গতকাল রোববার জানিয়েছে, বিগত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেন থেকে ২ হাজারের বেশি মানুষ আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে পালিয়ে গেছেন।

ইয়েমেনের উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে জিবুতির শহর ওবকে ইয়েমেনিরা পৌঁছাচ্ছেন। সেখানে তাঁদের খাবার ও পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে আইওএম সতর্ক করে বলেছে, আরও সহায়তা প্রয়োজন।

সমুদ্রপথের গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ

বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ বাব আল-মানদেব দিয়ে পরিচালিত হয়। সমুদ্রপথে পরিবহন করা তেলের প্রায় ১১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৮ শতাংশও এই পথ দিয়ে যায়।

কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) ছবিতে বাব আল–মানদেব প্রণালি। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার
ছবি: রয়টার্স

অন্যদিকে হুতিদের মিত্র ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে। এ যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।

হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য হাজেম আল-আসাদ বলেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবে নৌ চলাচলসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে।

ইরান বলে আসছে, ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুতিরা একটি স্বাধীন গোষ্ঠী।

তবে ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

সমুদ্রপথের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নৌ কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রু ক্রিস্তিয়ান হুদিস্তেয়ানু আল-জাজিরাকে বলেন, বাব আল-মানদেব প্রণালি হরমুজ প্রণালির চেয়ে সরু।

আরও পড়ুন
হেলিকপ্টার নিয়ে লোহিত সাগরে একটি জাহাজের পিছু নিয়েছে হুতিরা
ফাইল ছবি: রয়টার্স

হুদিস্তেয়ানু বলেন, হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাদের সামগ্রিক সক্ষমতায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনেনি। তবে এর ফলে আগের তুলনায় জাহাজ নিশানা করা তাদের জন্য সহজ হয়েছে।

এর একটি উদাহরণ হলো, সম্প্রতি একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উপকূলে থাকা এক হুতি কমান্ডারকে বলতে শোনা যায়, ওই এলাকায় কামান বসিয়ে ইয়েমেনের উপকূলের কাছের জলসীমায় থাকা লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পোর্টওয়াচের তথ্য বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ ও পরিবহন করা পণ্যের পরিমাণ ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে জাহাজে হুতিদের হামলার পর লোহিত সাগরে উত্তেজনা আবার বেড়ে গিয়েছিল।

বড় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চালাচ্ছে। এতে একটি যাত্রায় ২০ দিনের বেশি সময় বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

লোহিত সাগরে সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন আটালান্টা’ টাস্কফোর্স কাজ করছে। তবে লোহিত সাগরে আবার জাহাজে হামলা শুরু হলে নির্ধারিত দায়িত্বের সীমাবদ্ধতার কারণে এই বাহিনীর পক্ষেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে।

আরও পড়ুন
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারত। ৩১ আগস্ট ২০২৬
ফাইল ছবি: রয়টার্স

হুদিস্তেয়ানু বলেন, এই অঞ্চলে নৌবহরের রসদসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে অনেক দেশের নৌবাহিনী জিবুতিকে বন্দর হিসেবে ব্যবহার করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে অপারেশন আটালান্টার মতো চলমান অভিযানের আওতায় থাকা জাহাজগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করা কঠিন।

হুদিস্তেয়ানু আরও বলেন, ‘তবে আমি বলব না যে এসব জাহাজ শুধু নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সেখানে রয়েছে।...হুমকির জবাব দিতে দেরি করলে বা নিষ্ক্রিয় থাকলে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে নৌবাহিনীর জাহাজগুলোকে বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালির দিকে বেশি পাঠানো হয়েছিল। এর ফলে হর্ন অব আফ্রিকার উপকূলের কাছে নিরাপত্তার কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে সংগঠিত সামুদ্রিক অপরাধী চক্রগুলো।

হুদিস্তেয়ানু সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা বিশেষ করে সোমালিয়ার উপকূলজুড়ে জলদস্যুতার পুনরুত্থান দেখতে পাচ্ছি। বহুস্তরীয় এই সংকটের সময় আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজর হরমুজ ও বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে সরে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।’

আরও পড়ুন

মিসরের দুশ্চিন্তা

লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না বলে হুতিরা আশ্বস্ত করেছে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো নিশানা করে হামলা চালিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হুতিরা লোহিত সাগরে ১০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। হুতিদের দাবি ছিল, এসব জাহাজ ইসরায়েল বা দেশটির মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় মিসরের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস সুয়েজ খালের টোল।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মিসর প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে। এই অর্থ সুয়েজ খালের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ।

হুদিস্তেয়ানু বলেন, হুতিদের এই অভিযান ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহজেই বোঝা যায়। লোহিত সাগর দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করত, সেগুলোর বড় একটি অংশ একপর্যায়ে পুরোপুরি চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরে হুতিরা জাহাজে হামলা বন্ধ করার কথা জানায়। কিন্তু অনেক কোম্পানি কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখে। তারা আর আগের পথে ফিরে আসেনি।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সামরিক কুচকাওয়াজ
ফাইল ছবি: রয়টার্স
আরও পড়ুন

আফ্রিকা অধ্যয়নের অধ্যাপক ও সংঘাত নিরসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বদর হাসান আল-শাফেই বলেন, এই সময়ে ক্ষতি সত্ত্বেও মিসর কৌশলগতভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছিল।

আল-শাফেই আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তাতে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকার নীতি অনুসরণ করে মিসর। ২০১৫ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোর ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের সময় থেকেই এটি মিসরের একটি স্থায়ী অবস্থান।’

আল-শাফেই আরও বলেন, বাব আল-মানদেব দিয়ে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের দিকে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এসব সত্ত্বেও মিসর হস্তক্ষেপ করেনি। যদিও এতে দেশটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

আরও পড়ুন

ইরিত্রিয়ার গুরুত্ব বেড়েছে

ইয়েমেনিরা এখন লোহিত সাগরে প্রবেশের পথে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে। এর ফলে ইয়েমেনের অপর পাশে বাব আল-মানদেবের কাছে অবস্থিত আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।

ইরিত্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কির শাসনামলে দেশটি স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছে। এ কারণে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে দেশটির যোগাযোগও সীমিত ছিল।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফওয়ার্কি লোহিত সাগরে ইরিত্রিয়ার কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর চেষ্টা করছেন। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কও উন্নত করেছেন তিনি।

আল-শাফেই বলেন, ‘ইয়েমেনে যা ঘটছে, তা থেকে নিজেকে দূরে রাখার ভান করছেন আফওয়ার্কি। কিন্তু বাস্তবে লোহিত সাগরে যা ঘটছে, তা থেকে তিনি অনেক সুবিধা পাচ্ছেন।’

আরও পড়ুন