ইরান সফরে যাচ্ছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী, কারণ কী
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা জোরদার করেছে কাতার। এর অংশ হিসেবে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি আজ বৃহস্পতিবার ইরানের রাজধানী তেহরানে যাচ্ছেন।
ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি দোষারোপের মধ্যেই এই সফরে যাচ্ছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী।
ইরানের প্রতিবেশী দেশ কাতার। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। যুদ্ধরত দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে কাতার। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ক্ষেত্রেও কাতার সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল। সেই যুদ্ধবিরতির ফলে সাময়িকভাবে সংঘাত বন্ধ হয়েছিল।
তবে যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দুই পক্ষের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিরোধের বিষয় হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান।
ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সরু এই জলপথ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক আংশিকভাবে ভেঙে যায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বে সরবরাহ হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার প্রণালিটি দিয়ে প্রতিদিন মাত্র ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। এটি গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরান সফরে কাতারের প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেশের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে দেশটির হাতে এখন পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়ে উপসাগরীয় যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে, সেসব দেশে হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে ইরানের। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা ইরানের আছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তেহরান সফরে কাতারের প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেশের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখাসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে অবাধে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা এবং তা ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা করবেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার অনুকূল পরিবেশ তৈরির উপায় নিয়ে তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন।
যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালিতে অবাধে জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। দেশটি এটিকে চাপ তৈরির পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। জাহাজগুলো থেকে ফি আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। তবে এর বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যেও কয়েক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় আলোচনা চলছে। গত বুধবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক মুখপাত্র দাবি করেন, প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ এবং সেখান থেকে পাওয়া রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়ে ইরান ও ওমান এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যা দুই পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য।
তবে পরে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। দুই দেশ এখনো চুক্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি বলেছেন, জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা স্মারকের অধীন তেহরানের শর্তগুলো ওয়াশিংটর পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
তেহরানের এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।