২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে তাদের সমন্বিত হামলা শুরু করে, উপসাগরীয় দেশগুলো তাতে উল্লাস প্রকাশ করেনি। বরং তারা চরম শঙ্কার সঙ্গে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের সামরিক অভিযান পর্যবেক্ষণ করেছে।
বছরের পর বছর ধরে তারা এ মুহূর্তটি ঠেকানোর জন্য বিরাট কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তারা তেহরানের সঙ্গে আলোচনা বজায় রেখেছে, দূতাবাস চালু রেখেছে এবং বারবার এই আশ্বাস দিয়েছে—তাদের ভূখণ্ডকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো ‘লঞ্চপ্যাড’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা এসব প্রতিবেশী দেশের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা কেবল ঐতিহাসিকভাবে কৌশলগত ভুলই নয়, বরং চরম নৈতিক ও আইনি ব্যর্থতা। এই পদক্ষেপ আগামী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সম্পর্কের বিষিয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
প্রকৃত সংযমের নজির
উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) সদস্যদেশগুলো ইরানের শত্রু হিসেবে এ সংকটে জড়ায়নি। বরং বছরের পর বছর ধরে তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দ্বন্দ্বে অত্যন্ত সচেতনভাবে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
২০১৯ সালে সৌদি আরব আলোচনার পথ বেছে নেয় এবং তেহরানের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক
সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হয়। সেই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় হওয়া ঐতিহাসিক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি এবং পুনরায় দূতাবাস চালু। রিয়াদের ভাষ্য ছিল—সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমেই স্থিতিশীলতা সম্ভব। বর্তমান সংকট যখন ঘনীভূত হচ্ছিল, তখনো সৌদি আরব স্পষ্টভাবে তেহরানকে নিশ্চিত করেছিল যে ইরানের ওপর হামলা চালাতে তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না। সৌদি আরব তার কথা রেখেছে, কিন্তু বিনিময়ে সম্মানটুকু তারা পায়নি।
মধ্যস্থতার জন্য বছরের পর বছরে চেষ্টা চালিয়ে গেছে কাতার। তারা হামাস ও ইসরায়েল এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছে। যখন খুব কম দেশই এগিয়ে এসেছিল, তখন দোহা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার আয়োজন করেছিল এবং কূটনৈতিক সমাধানের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছিল।
অন্যদিকে ওমান সেই নিভৃত মধ্যস্থতকারী, যাদের আলোচনার ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধের আগমুহূর্ত পর্যন্ত একটি চুক্তির ক্ষীণ আশা বেঁচে ছিল। বোমা বর্ষণ শুরু হওয়ার আগের দিনও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি শান্তি ‘হাতের নাগালে’ আছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
ইরান নিজেও তাদের (জিসিসিভুক্ত দেশগুলো) আন্তরিকতাকে পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছে। ৫ মার্চ তেহরান প্রকাশ্যে সৌদি আরবের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তেহরানের সেই স্বীকৃতিই এখন ইরানের কর্মকাণ্ডকে আরও বেশি স্ববিরোধী এবং অমার্জনীয় করে তুলেছে।
বিস্ময়ে বাক্রুদ্ধ এই অঞ্চল
উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের এই সদিচ্ছার বিনিময়ে ইরান যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা খোদ যুদ্ধ শুরু করা দেশগুলোর ওপর চালানো হামলার চেয়েও অনেক বেশি ভয়ংকর। পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে ইরান ইসরায়েলের তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে দ্বিগুণের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ২০ গুণ বেশি ড্রোন ছুড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং এলএনজির বড় একটি অংশ প্রতিদিন পরিবাহিত হয়। ইরানি হামলার হুমকিতে এই পথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যা উপসাগরীয় জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে এশিয়া, ইউরোপ এবং এর বাইরের অর্থনীতির সংযোগকারী প্রধান ধমনিকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সৌদি, আমিরাত ও কাতারের রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় এবং বিমাবাজারে ধস নামায়, এই দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থার আশঙ্কা ১৯৮০-এর দশকের ‘ট্যাংকার ওয়ার’-এর স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। (১৯৮৪–১৯৮৮ সালের সংঘাতের সময় ইরান ও ইরাক পারস্য উপসাগরে একে অপরের তেলবাহী জাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করেছিল, যা ট্যাংকার ওয়ার নামে পরিচিত)। এটি বিশ্বকে এমন এক অর্থনৈতিক ধাক্কার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা সামলানোর কোনো পূর্বপ্রস্তুতিই কারও নেই।
অবৈধ, হঠকারী ও অগ্রহণযোগ্য
উপসাগরীয় দেশগুলোর সার্বভৌম ভূখণ্ডে ইরানের এই হামলা কেবল কৌশলগতভাবেই ভুল নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতেও তা অবৈধ। তেহরান এসব হামলাকে বৈধতা দিতে যুক্তি দেখিয়েছে যে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির কারণে ওই দেশগুলো বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়েছে। তবে এই যুক্তি ধোপে টেকে না।
জিসিসিভুক্ত দেশগুলো যুদ্ধের আগমুহূর্ত পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ইরানকে এই নিশ্চয়তা দিয়েছিল যে তাদের ভূখণ্ড ইরানের ওপর হামলার জন্য ব্যবহৃত হবে না। ১ মার্চ জিসিসির বিশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বিবৃতিতে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছিল। পরে ৫ মার্চের জিসিসি-ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও বিষয়টি পুনরায় উল্লেখ করা হয়।
ইরানের সঙ্গে যেকোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্রের চেয়ে কাতারের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগ ছিল। সেই কাতার এসব হামলাকে ‘বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছে।
ফেরার পথ খোঁজা জরুরি
এখনকার সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো সুযোগ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই পদক্ষেপ নেওয়া। কোনো শর্ত ছাড়াই এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে হবে।
এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে সংকটময় পর্যায় ঘনিয়ে আসছে। ইরান ঘোষণা করেছে ‘শত্রু চূড়ান্তভাবে পরাজিত’ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের মিলিশিয়াদের মতো ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়ভাবে অভিযানে অংশ নিচ্ছে। প্রতিটি অতিবাহিত দিন সম্ভাবনার পথকে সংকীর্ণ করে তুলছে।
এখন যা জরুরি তা হলো—ওয়াশিংটন বা তেহরান একা যা করতে পারবে না, সেই ‘অ্যাভিনিউ’ বা ফেরার পথ তৈরিতে একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা।
বছরের পর বছর ধৈর্যশীল ও নিরবচ্ছিন্ন কূটনীতির মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো প্রমাণ করেছে যে ইরানের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কই ছিল তাদের প্রধান পছন্দ। ইরান সেই পছন্দের বিপরীতে জবাব দিয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে। তেহরানের জন্য এটি মনে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে যে আজ তারা যে প্রতিবেশীদের ওপর বোমা ফেলছে, তারাই তাদের মধ্যস্থতার দক্ষতা এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের সবচেয়ে বড় সুযোগ দিতে পারত। ফেরার পথটি এখনই তৈরি করতে হবে, তবে সেই সুযোগের জানালা চিরকাল খোলা থাকবে না।