ঋণের অর্থের বিনিময়ে সৌদিকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান দিচ্ছে পাকিস্তান, চুক্তি পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা: রয়টার্স

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (ডানে) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫—ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তান ও সৌদি আরব তাদের প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তিতে পরিবর্তন করার বিষয়ে আলোচনা করছে। পাকিস্তানের দুটি সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে। গত বছর দুই দেশ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করার পর এখন তাদের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হচ্ছে।

এর থেকে বোঝা যাচ্ছে, দুই মিত্র দেশ কীভাবে তাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে বাস্তবে রূপ দিতে চাইছে। পাকিস্তান বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সৌদি আরবও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তাদের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব নতুন করে সাজাচ্ছে।

কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসকে নিশানা করে ইসরায়েলের হামলার পর এই যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি সই হয়েছিল। ওই হামলায় পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল কেঁপে উঠেছিল।

একটি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনা মূলত পাকিস্তান ও চীনের যৌথভাবে তৈরি এবং পাকিস্তানে উৎপাদিত ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ যুদ্ধবিমান সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার টেবিলে থাকা নানা বিকল্পের মধ্যে এই যুদ্ধবিমানটিই প্রধান।

সূত্রটি আরও জানায়, এই চুক্তির মোট মূল্য প্রায় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। যার মধ্যে ২০০ কোটি ডলার ঋণের টাকা থেকে সমন্বয় করা হবে এবং বাকি ২০০ কোটি ডলার অতিরিক্ত সরঞ্জাম কেনার জন্য খরচ করা হবে। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় এবং কথা বলার অনুমতি না থাকায় সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। সৌদি আরবের সরকারি তথ্য বিভাগও কোনো মন্তব্য করেনি।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির বিমানবাহিনী প্রধান জহির আহমেদ বাবর সিধু এই সপ্তাহে সৌদি আরবে ছিলেন। সেখানে তিনি সৌদি বিমানবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল তুর্কি বিন বান্দের বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

যুদ্ধে পরীক্ষিত

অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল এবং বিশ্লেষক আমির মাসুদ বলেন, পাকিস্তান বর্তমানে ছয়টি দেশের সঙ্গে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, ইলেকট্রনিক সিস্টেম এবং অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে আলোচনা করছে অথবা চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। তিনি বলেন, এসব দেশের মধ্যে সৌদি আরবও রয়েছে। তবে তিনি আলোচনার বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করতে পারেননি।

আমির মাসুদ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের চাহিদা বেড়ে গেছে। কারণ, ‘এটি যুদ্ধে ব্যবহৃত এবং পরীক্ষিত’। সেই সঙ্গে এটি সাশ্রয়ীও বটে।

পাকিস্তান জানিয়েছে, গত বছরের মে মাসে ভারতের সঙ্গে কয়েক দশকের মধ্যে হওয়া সবচেয়ে বড় লড়াইয়ের সময় এসব বিমান ব্যবহার করা হয়েছিল।

সেপ্টেম্বরে সই হওয়া যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের যেকোনো একটির ওপর আক্রমণ হলে তা উভয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এর মাধ্যমে তাদের কয়েক দশকের পুরোনো নিরাপত্তা সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

পাকিস্তান দীর্ঘকাল ধরে সৌদি আরবকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের মাধ্যমে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের সময় বারবার আর্থিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে।

২০১৮ সালে রিয়াদ পাকিস্তানের জন্য ৬০০ কোটি ডলারের একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, যার মধ্যে ৩০০ কোটি ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছিল এবং ৩০০ কোটি ডলারের তেল বাকিতে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।

এর পর থেকে সৌদি আরব বারবার এই জমার মেয়াদ বাড়িয়েছে। গত বছরও ১২০ কোটি ডলারের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল, যা পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে।

অস্ত্র বিক্রির তৎপরতা

পাকিস্তান সাম্প্রতিক মাসগুলোয় তাদের অস্ত্র রপ্তানি বাড়াতে এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে আয় করতে প্রতিরক্ষা তৎপরতা জোরদার করেছে।

গত মাসে ইসলামাবাদ লিবিয়ার ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’র সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের একটি অস্ত্র চুক্তি করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি পাকিস্তানের ইতিহাসের অন্যতম বড় অস্ত্র বিক্রির চুক্তি, যার মধ্যে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং প্রশিক্ষণ বিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গেও জেএফ-১৭ বিক্রির বিষয়ে আলোচনা করেছে। দেশটি এখন দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তাদের অস্ত্র সরবরাহের পরিধি বাড়াতে চাইছে।

মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, অস্ত্রশিল্পের সাফল্য দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে। জিও নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিমানগুলো পরীক্ষিত এবং আমরা এত বেশি অর্ডার পাচ্ছি যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের হয়তো আর আইএমএফের প্রয়োজন হবে না।’

পাকিস্তান বর্তমানে আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচির অধীনে রয়েছে। ২০২৩ সালে দেউলিয়া হওয়া ঠেকাতে সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় মিত্র আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরেই আইএমএফ এই ঋণ দিতে রাজি হয়েছিল।