যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে আবার কেন যুদ্ধ শুরু হলো, শান্তিপ্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব পড়বে

ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এ স্থিরচিত্রে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজকে চরে আটকে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ১ জুলাই ২০২৬ছবি: ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সৌজন্যে

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে তেহরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে গত মঙ্গলবার ও গতকাল বুধবার রাতে ইরানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর ব্যাপক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন হামলার পর তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি মনে করেন, ইরানের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক ‘শেষ’ হয়ে গেছে। তিনি আপাতত শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেও ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন, এগুলো ‘সময়ের অপচয়’। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ মেজাজে তিনি ইরানের নেতৃত্বকে ‘আবর্জনা’ বলে উল্লেখ করেন।

ট্রাম্পের এ মন্তব্যের পর বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম গতকাল বুধবার ৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় শেয়ারবাজারে ১ দশমিক ৬ শতাংশ পতন লক্ষ করা গেছে। মুদ্রাবাজারে ডলার শক্তিশালী হয়েছে এবং সরকারি বন্ডের মুনাফা বেড়েছে। কারণ, এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির কথা বিবেচনা করছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগ্রাসন শুরুর প্রথম দিনে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। বর্তমানে এই সর্বোচ্চ নেতার শেষবিদায় ঘিরে কয়েক দিন ধরে নানা আয়োজন চলছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনাও চলছিল। এর মধ্যেই পরপর দুই দিন ইরানে বড় হামলা চালানো হলো। গত এপ্রিলে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি আলোচনায় সম্মত হয়েছিল। সেই সময়ের পর থেকে এটিই সবচেয়ে বড় আক্রমণ।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বলেছে, তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মাধ্যমে এর জবাব দিয়েছে। বুধবার ও আজ বৃহস্পতিবার ভোরে বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, ‘শত্রুর ড্রোন’ হামলায় তাদের একজন সদস্য নিহত হয়েছেন।

উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে তিন সপ্তাহ আগে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ এনেছে। এ চুক্তির মাধ্যমে ৬০ দিনের শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। গত দুই দিনে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো আলোচনার মধ্যেই ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান বলেছে, এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার আস্থার জায়গাটি ভেঙে গেছে।

কী ঘটেছিল

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা মঙ্গল ও বুধবার রাতে ইরানের হরমুজ, বন্দর আব্বাস, সিরিক, চাবাহার, আবু মুসাসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বুধবার তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা গত রাতে ইরানের খুব বিপজ্জনক মানুষকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে হামলা চালিয়েছি। তারা অসুস্থ, তাদের সমস্যা আছে।’

সেন্টকম জানিয়েছে, ইরান তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে—মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী এম/টি আল রেক্কায়াত, সৌদি আরবের পতাকাবাহী এম/টি ওয়েদিয়ান এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এম/টি সাইপ্রাস প্রসপারিটি। জাহাজগুলো ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরান সব জাহাজ চলাচলের জন্য তাদের নির্ধারিত ‘নিরাপদ রুট’ ম্যাপ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছিল। রুটটি অনুসরণ করলে জাহাজগুলোকে ইরানের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে যেতে হবে। এ নির্দেশনায় ওমানের জলসীমার একটি অংশকে ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করে। স্থানীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, জাহাজগুলো ইরানি বাহিনীর দিক পরিবর্তনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল।

ট্যাংকারে ওই হামলার জবাবে সেন্টকম বলেছে, ‘মার্কিন বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক, কোস্টাল রাডার সাইট, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালির কাছে থাকা আইআরজিসির ৬০টির বেশি ছোট নৌকায় হামলা চালিয়েছে। এর উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যের ওপর ইরানের হামলার সক্ষমতা ধ্বংস করা।’

হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সেন্টকম সতর্ক করেছে, ইরান যদি ‘চুক্তিবহির্ভূত’ কাজ চালিয়ে যায়, তবে আরও হামলা চালানো হবে। সমঝোতা স্মারকের শর্ত ছিল, শান্তি আলোচনা চলাকালে অন্তত ৬০ দিন ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করবে।

তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক হোসেন রায়ভারান আল-জাজিরাকে বলেছেন, জাহাজগুলো হয়তো এমন এলাকায় ঢুকে পড়েছিল, যেখানে ইরানি দল মাইন অপসারণের কাজ করছিল। রায়ভারান বলেন, ‘ওমান উপকূলের কাছের এলাকাটিতে মাইন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’

হরমুজ প্রণালিতে তিনটি ট্যাংকারে হামলার জবাবে ইরানে নতুন করে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। ৮ জুলাই প্রকাশিত এ ভিডিও চিত্রে একটি অজ্ঞাত স্থানে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে
ছবি: রয়টার্স

ইরানের কোন কোন স্থানে হামলা হয়েছে

ইরানি সংবাদমাধ্যম দক্ষিণ উপকূলীয় বন্দর শহর সিরিকের বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার জেটিতে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে। স্প্লিন্টারের আঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন, তবে হতাহতের সঠিক সংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়। অবশ্য বুধবার রাতের হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন বলে ইরানের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপ ও বন্দর আব্বাস শহরের কাছেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার আগে মার্কিন নৌবাহিনী বন্দর আব্বাস অবরোধ করে রেখেছিল।

ইরানের আধা সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সি বুধবার জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহর প্রদেশের দুটি সামরিক ঘাঁটিতে শত্রুপক্ষের গোলা আঘাত হেনেছে। প্রদেশের গভর্নরের নিরাপত্তা উপপ্রধান জানান, একটি ঘাঁটি দাস্তি কাউন্টিতে এবং অন্যটি চোগাদাক শহরের কাছে অবস্থিত।

যুক্তরাষ্ট্র আর কী ব্যবস্থা নিয়েছে

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ মঙ্গলবার গভীর রাতে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ইরানের তেলের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার ফলে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় ট্রাম্প ভাসমান তেলের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিলেন।

গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে ইরানকে ৬০ দিনের জন্য অপরিশোধিত তেল বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ ২১ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন ৭ জুলাই থেকে নতুন তেল বিক্রির ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। চলমান বিক্রির অর্থ একটি ‘অবরুদ্ধ সুদবাহী অ্যাকাউন্ট’-এ জমা রাখা হবে।

ইরানের প্রতিক্রিয়া কী

আইআরজিসি বুধবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারাও দুই দিন বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা বাহরাইনের পোর্ট সালমান, পঞ্চম নৌঘাঁটি এবং কুয়েতের আলী সালেম বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘আগ্রাসী হামলা এবং সমঝোতা স্মারকের চরম লঙ্ঘন’-এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, এ হামলা যুদ্ধ সমাপ্তি–সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের ১ নম্বর অনুচ্ছেদের চরম লঙ্ঘন, যেখানে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘জবরদস্তি ও চাঁদাবাজির যুগ শেষ। এসব কোনো কাজে আসবে না। আমরা নতিস্বীকার করব না।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যোগ করেছেন, মার্কিন হামলা শান্তিচুক্তির মৌলিক উপাদানগুলোকে অকার্যকর করে দিয়েছে।

ইরাকের নাজাফে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কফিন বহনকারী গাড়ি ঘিরে শোকাতুর মানুষের ভিড়। ৮ জুলাই ২০২৬, নাজাফ
ছবি: এএফপি

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কী

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতে মার্কিন পদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে বলেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর ওয়াশিংটনের এ প্রতিক্রিয়া যথাযথ ছিল। জিসিসি মহাসচিব জাসেম মোহামেদ আলবুদাইউই বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়ে একে সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।

কুয়েত, ওমান, কাতার, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও এ উত্তেজনা এবং সার্বভৌম অঞ্চলের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। মিসর ওই অঞ্চলে শান্তিরক্ষার জন্য সংযম ও উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানিয়েছে।

এরপর কী ঘটতে পারে

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মুহানাদ সেলুম আল-জাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সংকেত দিচ্ছিল, তাদের হামলা সীমিত ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের মন্তব্য বিষয়টিকে এখন সন্দেহের মুখে ফেলে দিয়েছে।

বিশ্লেষক হারলান উলম্যান যোগ করেন, ‘এটি শান্তি নাকি যুদ্ধের দিকে যাবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আমার ধারণা, উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা কমাতে চাইবে।’