ইরানি ড্রোন ঠেকাতে ওড়াতে হচ্ছে যুদ্ধবিমান, ব্যয় সামলাতে খুঁজতে হচ্ছে বিকল্প
চলমান ইরান যুদ্ধে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অত্যাধুনিক সব যুদ্ধবিমান। তবে এগুলো এমন এক শত্রুর মোকাবিলা করছে, যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এই যুদ্ধবিমানগুলো তৈরি করা হয়নি। মূলত ইরান থেকে ধেয়ে আসা নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া ধীরগতির অসংখ্য ড্রোন বা ড্রোনের ঝাঁক ধ্বংস করতেই এসব যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশ্লেষক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর এখন প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধবিমান। যদিও এগুলো বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, তবে দিনরাত যুদ্ধবিমান দিয়ে এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখা আর্থিক দিক থেকে যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি পাইলট ও যুদ্ধবিমানের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজিস’-এর গবেষক ও পেন্টাগনের সাবেক উপদেষ্টা লরেন কান বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই দীর্ঘ মেয়াদে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’
উপসাগরীয় দেশ ও তাদের মিত্ররা এখন এক কঠিন সমস্যার মুখোমুখি। ইরানের ড্রোনগুলো বেশ সস্তা; কিন্তু সেগুলো ধ্বংস করতে যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
মশা মারতে কামান দাগানো পরিস্থিতি
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ইরানের অস্ত্রাগারের প্রধান শক্তি ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনের একেকটির দাম ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। অথচ মাত্র একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এক ঘণ্টা আকাশে ওড়াতেই খরচ হয় ২৫ হাজার ডলারের বেশি।
যুদ্ধবিমান আপনার প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ হতে পারে; কিন্তু ভিত্তি নয়। শত্রু যদি শত শত সস্তা ড্রোন ছোড়ে আর আপনি সেগুলো লাখ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করেন, তবে দীর্ঘ মেয়াদে আপনার এই মডেল কাজ করবে না।
ড্রোন ভূপাতিত করতে যুদ্ধবিমান থেকে যেসব অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিভিন্ন ভিডিও থেকে দেখা গেছে, ড্রোন আটকাতে ‘এআইএম-৯এক্স সাইডউইন্ডার’-এর মতো আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রতিটির খরচ মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার ডলার। এ ছাড়া ১০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের ‘এআইএম-১২০ অ্যামরাম’ ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন প্রযুক্তি (কিট) রয়েছে যা সাধারণ রকেটকে ড্রোনবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রে রূপান্তর করতে পারে। তবে এগুলোর প্রতিটির দাম ২০ হাজার ডলারের বেশি। ২০১৮ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরবের কাছে প্রায় ২৭ হাজার এমন কিট বিক্রির অনুমোদন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিলেও সেগুলো আদৌ সরবরাহ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বিপুল অর্থবিত্ত আর অঢেল সামরিক বাজেটের উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও এই ড্রোনযুদ্ধের আর্থিক সমীকরণ মেলানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসিসের গবেষক স্যামুয়েল বেন্ডেট বলেন, ‘সস্তা একটি হুমকি মোকাবিলার তুলনায় এটি স্পষ্টতই অত্যন্ত ব্যয়বহুল।’ তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিমান কেবল তখনই ব্যবহার করা উচিত, যখন কম খরুচে কোনো বিকল্প থাকবে না। তিনি বলেন, ‘প্রতিরক্ষার কাজে আপনাকে অবশ্যই তুলনামূলক সস্তা সম্পদ ব্যবহার করতে হবে।’
উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধবিমানগুলো এখন ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অস্ত্র হিসেবে বিমানবিধ্বংসী ভারী গুলি ব্যবহারের চেষ্টা করছে। ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটি অনেক সস্তা। তবে এর জন্য যুদ্ধবিমানকে লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছাকাছি যেতে হয় এবং জনবহুল এলাকায় এগুলো ব্যবহারে সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
ইসরায়েল ইরানি ড্রোন ঠেকাতে যুদ্ধবিমান, আয়রন ডোম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করলেও তারা বর্তমানে একটি লেজারভিত্তিক সিস্টেম পরিচালনা করছে। এই প্রযুক্তিতে প্রতিটি ড্রোন ধ্বংস করতে খরচ ‘প্রায় শূন্য’ বললেই চলে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও লেজারভিত্তিক প্রযুক্তিসহ ড্রোনের জন্য বিশেষায়িত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার কথা ভাবছে।
এ ছাড়া প্রতিটি যুদ্ধবিমানে এ ধরনের গুলির পরিমাণও থাকে সীমিত। যেমন একটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মাত্র পাঁচ সেকেন্ড গুলিবর্ষণের পরই এর ম্যাগাজিন খালি হয়ে যায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে ইরান এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি ড্রোন ছুড়েছে। বেশির ভাগই ছোড়া হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে। অবশ্য অধিকাংশ ড্রোন মাঝ আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ফরাসি ও ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানের সহায়তায় এ পর্যন্ত এক হাজার ছয় শর বেশি ড্রোন ধ্বংসের দাবি করেছে। তবে কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোয় আঘাত হেনেছে। কয়েকটি স্থাপনায় ড্রোনগুলো নিখুঁত ও নির্ভুলভাবে আঘাত হেনেছিল।
খরচের পাশাপাশি বাড়ছে ঝুঁকিও
ড্রোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় যুদ্ধবিমানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কেবল আর্থিক কারণেই উদ্বেগের নয়। স্টিমসন সেন্টারের গবেষক কেলি গ্রিকো বলেন, ‘এ ধরনের অভিযান অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাওয়া বিমানবাহিনীর জন্য অত্যন্ত ক্লান্তিকর। আপনি বিমানগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় ব্যবহার করতে পারেন; কিন্তু এক পর্যায়ে এগুলোর বিকল হওয়ার হার বাড়বে এবং বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে।’
এমনকি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের জন্যও ড্রোন ভূপাতিত করা কঠিন হতে পারে। শাহেদ-১৩৬ ড্রোন একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের গড় গতির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ গতিতে ওড়ে। ফলে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ পাইলটদের জন্য লক্ষ্যবস্তু ছাড়িয়ে যাওয়া বা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক বাহিনী ইরানের ড্রোন মোকাবিলায় অপ্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। গ্রিকো বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে; কিন্তু ড্রোনের মতো অপেক্ষাকৃত কম শক্তির হুমকিকে তারা সম্ভবত গুরুত্ব দেয়নি।’
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় ড্রোন অনেক ছোট, ধীরগতির এবং অনেক নিচ দিয়ে ওড়ে। তাই পাখি বা ভবন থেকে ড্রোনকে আলাদা করতে রাডারগুলোকে বিশেষভাবে কাজ করতে হয়। অবশ্য শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের কর্কশ শব্দ শনাক্ত করতে সেন্সর নেটওয়ার্কও ব্যবহার করা হচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ধরে রাখতে যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করছে। কারণ, একেকটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার। অন্য সব ব্যবস্থা ব্যর্থ হলেই কেবল ড্রোন ঠেকাতে এই দামি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো ইউক্রেনের পরামর্শ নিচ্ছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর থেকে এ ধরনের ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেন বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ফ্লাই গ্রুপ’-এর জ্যেষ্ঠ নির্বাহী আনাতোলি খ্রাপচিনস্কি বলেন, ড্রোন ঠেকানোর অন্যতম সাশ্রয়ী উপায় হলো অন্য কোনো বিশেষ ড্রোন দিয়ে সেটিকে প্রতিহত করা।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইউক্রেনের তৈরি এমন ১০ হাজার ইন্টারসেপ্টর ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। এ ছাড়া ড্রোন হুমকি মোকাবিলায় ইউক্রেন একটি বিশেষজ্ঞ দলও সেখানে পাঠিয়েছে।
আনাতোলি বলেন, ‘যুদ্ধবিমান আপনার প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ হতে পারে; কিন্তু ভিত্তি নয়। শত্রু যদি শত শত সস্তা ড্রোন ছোড়ে আর আপনি সেগুলো লাখ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করেন, তবে দীর্ঘ মেয়াদে আপনার এই মডেল কাজ করবে না।’
বিকল্প খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো
ইউক্রেনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর বাহিনীও এখন হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। ড্রোন যে গতি ও উচ্চতায় ওড়ে, হেলিকপ্টারও সাধারণত একই গতি ও উচ্চতায় পরিচালিত হয়। ফলে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা ভারী গুলির সাহায্যে ড্রোন ভূপাতিত করতে এগুলো বেশ কার্যকর।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটাক হেলিকপ্টারগুলো (হামলায় ব্যবহারোপযোগী হেলিকপ্টার) এই কাজে দক্ষ বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে এ অঞ্চলে যুদ্ধবিমানের তুলনায় হেলিকপ্টারের সংখ্যা কম এবং এগুলো তুলনামূলক কম এলাকাজুড়ে নজরদারি চালাতে পারে।
ইউক্রেনে ড্রোনের বিরুদ্ধে বিমানবিধ্বংসী ভারী গুলি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও উপসাগরীয় দেশগুলোতে এর সরবরাহ বেশ সীমিত।
ইসরায়েল ইরানি ড্রোন ঠেকাতে যুদ্ধবিমান, আয়রন ডোম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করলেও তারা বর্তমানে একটি লেজারভিত্তিক সিস্টেম পরিচালনা করছে। এই প্রযুক্তিতে প্রতিটি ড্রোন ধ্বংস করতে খরচ ‘প্রায় শূন্য’ বললেই চলে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও লেজারভিত্তিক প্রযুক্তিসহ ড্রোনের জন্য বিশেষায়িত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার কথা ভাবছে।
অবশ্য সিএসআইএসের গবেষক টম কারাকো মনে করেন, ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার এই ব্যয় বৈষম্যের দিকে খুব বেশি মনোযোগ দেওয়া ভুল হবে। তাঁর মতে, যুদ্ধ সব সময়ই ব্যয়বহুল এবং এখানে ‘ব্যয় বহনের সক্ষমতা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারাকো বলেন, প্রতিবেশীরা কোন পদ্ধতিতে প্রতিরক্ষার কাজটি করছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তেহরানের ড্রোনের মজুত ও সেগুলো উৎক্ষেপণের সক্ষমতা কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা কতটা সফল হচ্ছে।
সিএসআইএসের এই গবেষক বলেন, ‘সবকিছু নির্ভর করছে আপনি কত দ্রুত এই উৎক্ষেপণগুলো বন্ধ করতে পারছেন, তার ওপর। আপনি অনির্দিষ্টকাল ধরে কেবল ড্রোন ঠেকানোর খেলা খেলে যেতে পারেন না।’