ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর সরব পশ্চিমা নেতারা ইরানে হামলার পর চুপ কেন

তেহরানের শাহরান নামক জ্বালানি তেলের ডিপোতে হামলার পর কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। ৮ মার্চ ২০২৬ছবি: রয়টার্স

২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনে পুরোদমে আক্রমণ শুরু করল, তখন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেশ জোরালো ও স্পষ্টভাবে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছিল। বিশ্বনেতারা জানতেন, আইনি হুমকিতে হয়তো ভ্লাদিমির পুতিন দমে যাবেন না, কিংবা রুশ সেনাদের যুদ্ধাপরাধও থেমে থাকবে না। তবু রাশিয়ার সেই আক্রমণকে একটি অবৈধ আগ্রাসন হিসেবে চিহ্নিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার গুরুত্ব তাঁরা ঠিকই বুঝেছিলেন।

অথচ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর একই দেশগুলো এখন বিস্ময়করভাবে নীরব। ইরান যুদ্ধও একটি সুস্পষ্ট আগ্রাসন। স্পেনের পেদ্রো সানচেজ বাদে ইউরোপের আর কোনো নেতাকে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সেভাবে সরব হতে দেখা যায়নি। যদিও নরওয়েসহ কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কথা তুলেছে।

বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ এই যুদ্ধকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এখন মিত্র বা সহযোগীদের ‘উপদেশ’ দেওয়ার সময় নয়।

ইরানে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৭৫ জন, যাদের বেশির ভাগই শিশু। সব তথ্য-প্রমাণ মিলিয়ে এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রই জড়িত ছিল। যুদ্ধের আইন লঙ্ঘন করে এভাবে বেপরোয়া ও পরিকল্পিত হামলা চালানো সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ।

গতকাল শুক্রবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘শত্রুকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ এটি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর হামলার জবাবে লেবাননে ইসরায়েলের হামলাও কোনোভাবেই সমানুপাতিক নয়। সেখানেও ব্যাপক অবকাঠামো ধ্বংস ও বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইরানও যদি যুদ্ধাপরাধ করে থাকে, তবে সেটি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের অপরাধকে কোনোভাবে লঘু করে দেয় না।

মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ড নিয়ে পশ্চিমাদের চটকদার বুলি আর তাদের ‘বেছে বেছে নিন্দা’ জানানোর দ্বিচারিতা এখন বিশ্ববাসীর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ইউক্রেন নিয়ে তাদের আবেগ আর গাজার গণহত্যা নিয়ে উদাসীনতা—এই দুইয়ের বৈপরীত্য মানুষ দেখেছে।

যখন ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক পাচারের নামে নৌকা ডুবিয়ে দেয় কিংবা ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করে, তখন তাদের মিত্ররা মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। প্রতিবার এমন ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্ব আরও কমে যায় এবং ভবিষ্যতে আরও বড় আইন লঙ্ঘনের লাইসেন্স তৈরি হয়।

পশ্চিমা দেশগুলোর এই দ্বিচারিতার পেছনে রয়েছে ভেনেজুয়েলা ও ইরান সরকারের প্রতি তাদের অনীহা, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে চটানোর ভয় এবং ইউক্রেনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এমনকি অনেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অদ্ভুত যুক্তিও মেনে নিচ্ছেন।

ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমি যা ভালো মনে করব তা-ই করব, আমার ওপর কোনো আইন নেই’—তখন সমস্যাটা শুধু তাঁর একার নয়, বরং যাঁরা তাঁর এই কথা মেনে নিচ্ছেন তাঁদেরও। যেমন জার্মানির চ্যান্সেলর প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন যখন কাজ করে না, তখন আমরা আর কীই–বা করতে পারি?’

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. তামের মরিস বলেন, কোন দেশ ভালো আর কোন দেশ খারাপ, তা বিচার করা নয়; বরং বিশ্বে শৃঙ্খলা বজায় রাখা আন্তর্জাতিক আইনের কাজ।

যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করায় জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বা অন্যদের সমালোচনা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু শুধু নিজেদের স্বার্থ বা নীতিকথার খাতিরে প্রতিবাদ করলেই চলবে না। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা কঠিন হতে পারে। কিন্তু তাই বলে একে এক পাশে সরিয়ে রাখা যাবে না।

যাঁরা মুখে আফসোস করেন, বিশ্বে এখন আর কেউ নিয়মকানুন মেনে চলছে না, তাঁরাই যদি আবার পর্দার আড়ালে এই আইন ভাঙার সঙ্গী হন বা চুপ থাকেন, তবে আমাদের সবার কপালে সামনে বড় বিপদ আছে।