হরমুজ প্রণালির যাতায়াত নিয়ে কী বলছে জাহাজ চলাচল ডেটার তথ্য
শিল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হরমুজে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম।
চীন মার্কিন এই অবরোধকে ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছে।
যুদ্ধকালীন বিমা খরচ এখনো চড়া। প্রতি ৪৮ ঘণ্টা অন্তর বিমার শর্তাবলি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ইরানের বন্দরগুলোয় ভেড়ার অপেক্ষায় থাকা জাহাজের ওপর মার্কিন অবরোধের প্রথম পূর্ণ দিন গতকাল মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির যাতায়াতে খুব একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। জাহাজ চলাচল ডেটা অনুযায়ী, গতকাল ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি ট্যাংকারসহ অন্তত আটটি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হওয়ার পর গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধের ঘোষণা দেন।
এই অবরোধ জাহাজমালিক, তেল কোম্পানি এবং যুদ্ধঝুঁকি বিমাকারীদের জন্য আরও বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। গতকাল শিল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতিদিন ১৩০টির বেশি জাহাজ চলাচল করত, এখন যাতায়াত তার সামান্য একটি ভগ্নাংশ মাত্র।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্সে দাবি করেছে, ‘প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনো জাহাজই মার্কিন অবরোধ ডিঙিয়ে যেতে পারেনি।’ তারা আরও যোগ করেছে, মার্কিন বাহিনীর নির্দেশ মেনে ছয়টি জাহাজ পথ পরিবর্তন করে আবার ইরানের বন্দরে ফিরে গেছে।
ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে তিনটি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, সেগুলো ইরানের বন্দরের দিকে যাচ্ছিল না। তাই অবরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
এলএসইজির তথ্য অনুসারে, পানামার পতাকাবাহী মিডিয়াম রেঞ্জের ট্যাংকার ‘পিস গালফ’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়া বন্দরের দিকে যাচ্ছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি সাধারণত ইরানি ‘ন্যাপথা’ (একধরনের রাসায়নিক কাঁচামাল) বহন করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য বন্দরে নিয়ে যায়, যেখান থেকে তা এশিয়ায় রপ্তানি করা হয়।
এর আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা দুটি ট্যাংকার এই সরু জলপথ অতিক্রম করেছে।
কেপলারের তথ্য বলছে, ‘মুরলিকিশান’ নামের একটি ট্যাংকার ১৬ এপ্রিল জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য ইরাকের দিকে যাচ্ছে। জাহাজটি আগে এমকেএ নামে পরিচিত ছিল। এটি রুশ ও ইরানি তেল পরিবহন করেছে।
এলএসইজি ও কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা আরেক জাহাজ ‘রিচ স্টারি’ অবরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথম জাহাজ হিসেবে প্রণালি পার হয়ে পারস্য উপসাগর থেকে বের হতে দেখা গেছে।
ইরানের সঙ্গে লেনদেনের কারণে এই ট্যাংকার এবং এর মালিক প্রতিষ্ঠান ‘সাংহাই জুয়ানরুন শিপিং’ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। মন্তব্যের জন্য এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ‘রিচ স্টারি’ একটি মাঝারি পাল্লার ট্যাংকার, যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল মিথানল বহন করছে। এটি তার সর্বশেষ যাত্রাবিরতির স্থান সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়া থেকে এই মালামাল বোঝাই করেছে।
শিপিং ডেটা দেখাচ্ছে, চীনের মালিকানাধীন এই জাহাজে চীনের ক্রু বা নাবিকেরা রয়েছেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল বলেছে, ইরানের বন্দরগুলোয় মার্কিন অবরোধ ‘বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’। তারা সতর্ক করে দিয়েছে, এটি কেবল উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলবে। তবে চীনের জাহাজগুলো প্রণালি পার হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কিছু উল্লেখ করেনি।
প্রণালিতে অন্যান্য জাহাজের চলাচল
গত সোমবার গ্রিনিচ মান সময় বেলা দুইটায় অবরোধ শুরুর পর থেকে আরও পাঁচটি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে ছিল দুটি রাসায়নিক ও গ্যাস ট্যাংকার, দুটি শুষ্ক পণ্যবাহী জাহাজ এবং ‘ওশান এনার্জি’ নামের একটি কার্গো জাহাজ, যেটি ইরানের বন্দর আব্বাসে নোঙর করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী নাবিকদের উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি নোটিশে বলেছে, মানবিক সহায়তা বা ত্রাণবাহী মালামাল এই অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে।
ইতালির জেনোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্যাব্রিজিও কোটিচিয়া বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিটি জাহাজ থামানোর বা হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের প্রয়োজন নেই। তারা একটি অনিয়মিত বা মাঝেমধ্যে বিরতি দিয়েও অবরোধ চালাতে পারে।’
কোটিচিয়া আরও বলেন, ‘জাহাজগুলোয় আক্রমণ করা হবে না, বরং সেগুলোর পথ ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরে অবস্থান করবে।
শিল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অবরোধ শুরুর পর যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচ নতুন করে না বাড়লেও তা এখনো চড়া রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে অতিরিক্ত কয়েক লাখ ডলার খরচ করতে হচ্ছে। বিমাকারীরা সাধারণত প্রতি ৪৮ ঘণ্টা পরপর এই কাভার বা সুরক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করছেন।
শিপ ব্রোকার সংস্থা ‘বিআরএস’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন আরও দূরে বলে মনে হচ্ছে, বিশেষ করে মার্কিন নৌবাহিনী অবরোধ শুরু করার পর।
বিআরএস আরও যোগ করেছে, আশঙ্কা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে এই প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল খুব সামান্য হবে অথবা একেবারেই হবে না।