এরদোয়ানই কি ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় রাজি করিয়েছেন
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা কমাতে আলোচনা করতে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সম্ভাব্য উত্তেজনা এড়াতে তেহরানকে তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে অবশ্যই ছাড় দিতে হবে—তুর্কি কূটনীতিকেরা ইরানকে এমনটাই বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি ভিডিও কনফারেন্সের প্রস্তাব দিয়েছেন। এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের কূটনীতি মার্কিন নেতার পছন্দ হতে পারে। কিন্তু ইরানের সতর্ক কূটনীতিকদের কাছে এটি একেবারেই অপছন্দনীয়। উল্লেখ্য, গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো সরাসরি আলোচনা হয়নি।
এমন এক সময় (গতকাল শুক্রবার) আরাগচির এ সফরে যাওয়ার কথা ছিল। এটি এমন সময় হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুমকিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ইস্যুতে আলোচনার জন্য ইসরায়েল ও সৌদি আরবের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন।
গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘চুক্তি করার সব পথ ইরানের সামনে খোলা আছে। তাদের পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের পথে হাঁটা উচিত নয়। প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) যা প্রত্যাশা করবেন, আমরা তা–ই করতে প্রস্তুত আছি।’
ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করে বলেন, ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তা হবে ভয়ংকর এবং ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আগের সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। তবে গতকাল ট্রাম্প কিছুটা নমনীয় সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
সম্প্রতি ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তা হবে ভয়ংকর এবং ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।
তবে বৃহস্পতিবার রাতে ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প কিছুটা নমনীয় সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমাদের অনেক বড়, খুবই শক্তিশালী জাহাজ ইরানের দিকে এগোচ্ছে। যদি সেগুলো ব্যবহার না করতে হয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।’
অবশ্য ট্রাম্প যতই হুমকি দিন না কেন, এখনো অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে ইরান। দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি ঘোষণা করেছেন, গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান তার রণকৌশলে পরিবর্তন এনেছে এবং এক হাজার জল ও স্থলভিত্তিক ড্রোন তৈরি করেছে।
ইরানি সেনাপ্রধান বলেন, এই ড্রোন ও ইরানের বিশাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার যেকোনো হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে সক্ষম। তবে ইরানের সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
চুক্তি করার সব পথ ইরানের সামনে খোলা আছে। তাদের পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের পথে হাঁটা উচিত নয়। প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) যা প্রত্যাশা করবেন, আমরা তা–ই করতে প্রস্তুত আছি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বুধবার বলেন, প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন সেনাসদস্য ইরানের হাজার হাজার ‘ওয়ান–ওয়ে’ ড্রোন (ইউএভি) ও স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালে রয়েছেন।
এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ইরান সামরিক সংঘাতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে, পাশাপাশি কূটনৈতিক পথও খোলা রাখছে।
এ অবস্থায় ক্রেমলিন উভয় পক্ষকে কূটনীতির সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে তুরস্কই এখন প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইরানের ভেতরে যাঁরা সরকারকে ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাঁদের কণ্ঠ ক্রমেই চাপা পড়ে যাচ্ছে। ইরানি সমাজ এখন চরমভাবে বিভক্ত। এক পক্ষ চায় নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিক। আরেক পক্ষ এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যাতে পুরো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশটিতে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নিহত ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করছেন। তবে দেশটিতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব ও বর্তমানে অবিশ্বাসের পরিবেশ এতটাই চড়া যে নিহত ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে ওয়াশিংটনের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো ইরান পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—উন্নত মানের ইউরেনিয়াম মজুত তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে হস্তান্তর, দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আনা ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা। এই চার শর্তই ইরানের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হবে।
এভিন কারাগারে বন্দী প্রখ্যাত রাজনীতিক মোস্তফা তাজজাদেহ সরকারিভাবে ঘোষিত নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যাকে ‘লজ্জাজনক মিথ্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর লক্ষ্য পরিষ্কার করেননি। কখনো বলছেন, বিক্ষোভকারীদের রক্ষায় ইরানে হামলা চালাবেন, আবার কখনো তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে হুমকি দিচ্ছেন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও বিপ্লবী গার্ডের মতো বাহিনীর ওপর হামলার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে ট্রাম্প এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে তিনি হয়তো পুরো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে অথবা অন্তত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগ নিশ্চিত করতে চান। জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দেওয়ার দাবিও করেছিলেন তিনি। যদিও পরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেই অভিযানের প্রভাব নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন দেয়।
বুধবার কংগ্রেসে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ইরানে সরকার পরিবর্তনের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি শাসনব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছি, যা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় আছে। তাই বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ভাবতে হবে।’
অন্যদিকে ইরানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মির হোসেন মুসাভি বর্তমান সরকারকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে, খেলা শেষ।’ তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপহীন ও শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উত্তরণের লক্ষ্যে একটি সাংবিধানিক গণভোটের দাবি তুলেছেন।
গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান তার রণকৌশলে পরিবর্তন এনেছে এবং এক হাজার জল ও স্থলভিত্তিক ড্রোন তৈরি করেছে। এই ড্রোন ও ইরানের বিশাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার যেকোনো হামলার দাঁতভাঙা জবাব দিতে সক্ষম।
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি সাধারণ সমঝোতার পথ খুঁজতে গত সোমবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন এরদোয়ান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, শুক্রবার সরকারি সফরে তুরস্কে যাচ্ছেন আরাগচি। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও অভিন্ন স্বার্থের নীতির ভিত্তিতে ইরান সম্পর্ক দৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর।’
এদিকে মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন যে ওয়াশিংটনের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো ইরান পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—উন্নত মানের ইউরেনিয়াম মজুত তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে হস্তান্তর, দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আনা ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করা। এই চার শর্তই ইরানের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘ইরানে হামলা চালানো ভুল হবে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু করাও হবে ভুল সিদ্ধান্ত। ইরান তাদের পরমাণু ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।’
হাকান ফিদান স্বীকার করেন যে আলোচনার টেবিলে ইরান বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি তাদের জন্য অবমাননাকর মনে হতে পারে। শুধু নিজের কাছে নয়, নেতৃত্বের কাছেও এটি ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে। তাই আমরা যদি বিষয়টিকে সহনীয় করতে পারি, তবে তা সহায়ক হবে।’
ফিদান আরও যুক্তি দেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে হাজির হতে হবে। তিনি ইরানিদের সঙ্গে এ বিষয়ে অত্যন্ত ‘খোলামেলা’ কথা বলেছেন জানিয়ে বলেন, এ অঞ্চলে আস্থা তৈরি করা ও আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের কীভাবে দেখছে, সেদিকে নজর দেওয়া ইরানের জন্য জরুরি।
বৃহস্পতিবার আঙ্কারায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি টম বারাকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ফিদান।
অন্যদিকে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশ জানিয়েছে, তারা ইরানকে আক্রমণ করার জন্য তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবে না।