ট্রাম্পের চাপ উড়িয়ে ইসলামপন্থী শারার সিরিয়া কি হিজবুল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ার পথে

সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির সঙ্গে বৈঠক করেন লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি। বৈরুত, লেবানন, ২ জুলাই ২০২৬ছবি: রয়টার্স

সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির লেবাননে সরকারি সফরের গুরুত্ব বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এ সফর শুধু তাঁর নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর বৈরুতে আল–শাইবানির এটি দ্বিতীয় সফর। তবে প্রথম সফরের সঙ্গে এবারের সফরের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এবার তিনি লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নাবিহ বেরি আমাল মুভমেন্টের নেতা ও হিজবুল্লাহর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বেশ কিছু বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, হিজবুল্লাহকে ‘শায়েস্তা’ করার দায়িত্ব সিরিয়াকে দেওয়া হতে পারে। এই লেবাননি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে দামেস্কের ওপর চাপও বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।

এ সফরের মধ্য দিয়ে লেবানন সরকার একটি বাড়তি আশ্বাস পেয়েছে। তারা নিশ্চিত হয়েছে যে মার্কিন চাপে পড়ে লেবাননে সামরিক হস্তক্ষেপ করার কোনো উদ্দেশ্য সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের নেই।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো লেবানন রাষ্ট্রকে আবারও সমর্থন জোগানো। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা এবং এমন একটি সমাধান খোঁজা, যা সবাই মেনে নেয়। আমরা লেবানন ও সিরিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক যোগাযোগের পথ খুঁজছি, সামরিক কোনো পথ নয়।
আহমেদ আল–শারা, সিরীয় প্রেসিডেন্ট

অন্যদিকে এ সফরের মাধ্যমে দামেস্ক নিজেদের ওপর থাকা চাপের মাত্রা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি তারা একটি বার্তাও দিয়েছে। সিরিয়া-লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা কমিয়ে হিজবুল্লাহ চাইলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

সফরের সময় শাইবানির সঙ্গে দেখা করেছেন লেবাননের এমন একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে একটি তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, সিরিয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিতে লেবানন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করেই এ সফর আয়োজন করা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘লেবাননকে আশ্বস্ত করতে এ সফর খুব প্রয়োজন ছিল। মার্কিন চাপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা কমাতেও এটি দরকারি ছিল।’

ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে (সিরিয়ার) প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার দেওয়া আশ্বাসের বার্তাটি একটি ইতিবাচক লক্ষণ ছিল। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সফর আরও জোরালো বার্তা দিয়েছে। তা হলো, সিরিয়ার নতুন প্রশাসন লেবানন রাষ্ট্র বা এর সার্বভৌমত্বের জন্য কোনো হুমকি নয়।’

আলোচনায় এলেন বেরি

শাইবানির আগের সফরে লেবাননের স্পিকার আলোচনার আনুষ্ঠানিক সূচিতে ছিলেন না। তবে এবারের সফরে স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে তাঁর বৈঠক ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা।

বাশার আল–আসাদ সরকারের আমল থেকেই দামেস্কের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন বেরি। সিরিয়া যুদ্ধে হিজবুল্লাহর সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। তবে তিনি লেবাননের প্রধান শিয়া রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতা। পাশাপাশি হিজবুল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় মিত্রও। এ অবস্থানই তাঁকে হিজবুল্লাহ ও সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের মধ্যে একজন স্বাভাবিক মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত করেছে।

বেরির এ ভূমিকার কারণেই সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর লেবানন সফরটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। হিজবুল্লাহ প্রসঙ্গে নিজের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ্য বিবৃতিটি দেওয়ার জন্য শাইবানি স্পিকার বেরির কার্যালয়কেই বেছে নিয়েছেন।

হিজবুল্লাহর প্রতি সিরিয়ার অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থে যদি হিজবুল্লাহর সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন হয়, তবে আমরা তা করতে রাজি।’

এর আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল–শারাও একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সংলাপ যদি উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করে, তবে সিরিয়া হিজবুল্লাহসহ লেবাননের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে প্রস্তুত। তাঁর ওই মন্তব্যের পরই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে এই বিবৃতি এল।

দামেস্কের এ প্রকাশ্য বার্তার পাশাপাশি সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষের প্রতি হিজবুল্লাহর নিজেদের সুরও ধীরে ধীরে নরম হচ্ছে।

হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাসেম দামেস্কের সঙ্গে সম্পর্কের একটি ‘নতুন অধ্যায়’ শুরু করার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছেন।

হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নওয়াফ মুসাওয়ি প্রকাশ্যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্টকে ‘ভাই আহমেদ আল-শারা’ বলে সম্বোধন করেছেন। শারা আগে আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। আল-কায়েদার শাখা ‘হায়াত তাহরির আল-শাম’ পরিচালনার সময় তিনি এ নাম ব্যবহার করতেন। তাঁর প্রতি হিজবুল্লাহর আগের যে আচরণ ছিল, সেখান থেকে বর্তমানের ওই সম্বোধন একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন।

হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, পরিস্থিতি এখন এমন একটি পরিণত পর্যায়ে পৌঁছেছে যে (সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে) সরাসরি যোগাযোগে দেরি করার আর কোনো কারণ নেই।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন শুধু উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করার একটি দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

ওই কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রাথমিক একটি বৈঠকের আয়োজনে তুরস্ক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, সিরিয়ার বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে তুরস্কের বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

ওয়াশিংটনের চাপ

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সিরিয়াকে কাজে লাগানোর বিষয়ে ট্রাম্প সম্প্রতি বেশ খোলামেলা মন্তব্য করেছেন। তাঁর এসব মন্তব্যের প্রেক্ষাপটেই এই সফর অনুষ্ঠিত হলো।

গত ৫ জুন এনবিসি নেটওয়ার্কের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রথম এ ধারণা সামনে আনেন। সাক্ষাৎকারটি দুদিন পর সম্প্রচারিত হয়। সেখানে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও নিখুঁত বা ‘সার্জিক্যাল’ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান ট্রাম্প। বলেন, এ ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন সহায়তা করতে পারে অথবা ‘সিরিয়াকে সুপারিশ করতে পারে’।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট শারার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাঁদের এ বিষয়ে সাহায্য করতে পারি অথবা সিরিয়াকে দায়িত্ব নিতে বলতে পারি।’ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট ‘খুশি মনেই এ কাজে এগিয়ে আসবেন’ বলেও দাবি করেন ট্রাম্প।

তবে ট্রাম্পের কথার ধরনটি ছিল বেশ অস্পষ্ট। সিরিয়া আসলে কী ধরনের ভূমিকা নেবে—সামরিক হস্তক্ষেপ, কূটনৈতিক তৎপরতা, নাকি সীমান্তের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টি—তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি।

তবে গত ১৬ জুন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প আরও সরাসরি কথা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ইসরায়েলকে পরামর্শ দিয়েছি, যেন তারা হিজবুল্লাহকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব সিরিয়ার ওপর ছেড়ে দেয়। কারণ, সত্যি বলতে কী, আমার মনে হয় তারা (সিরিয়া) এ কাজটি আরও ভালোভাবে করতে পারবে।’

লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধের সমালোচনাও করেন ট্রাম্প। বলেন, হিজবুল্লাহকে পরাজিত করতে ইসরায়েল অনেক বেশি সময় নিয়েছে। পাশাপাশি তারা বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে এবং আবাসিক ভবন ধ্বংস করেছে।

সিরিয়ার ইসলামপন্থী নতুন শাসকগোষ্ঠী ও লেবাননের এ সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সিরিয়ার কর্মকর্তারা মনে করছেন, ট্রাম্পের চাপে লেবাননে কোনো সামরিক অভিযান চালানো হলে সিরিয়ার ভেতরে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও গভীর হবে। এতে সীমান্ত অঞ্চলগুলো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে এবং দামেস্ক এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, যার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে না।

এর পরের দিন ট্রাম্প নিশ্চিত করেন, হিজবুল্লাহর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট শারার সঙ্গে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করেছেন। তবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট কোনো ব্যবস্থা নিতে রাজি হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান।

ট্রাম্পের এসব ধারাবাহিক মন্তব্যে লেবাননে উদ্বেগ বেড়ে যায়। অনেকেই আশঙ্কা করতে থাকেন, ওয়াশিংটন হয়তো সিরিয়াকে এই সংঘাতে টেনে আনার চেষ্টা করছে। পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব দিক থেকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্র খোলার পাঁয়তারা চলছে বলেও শঙ্কা তৈরি হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা’র সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেখা যাচ্ছে। রিয়াদ, সৌদি আরব। ১৪ মে, ২০২৫
ছবি: রয়টার্স

বেরিকে যা বললেন শাইবানি

মিডল ইস্ট আই জানতে পেরেছে, শাইবানি ও বেরির মধ্যে ৪৫ মিনিটের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এসব শঙ্কা ও উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

এ বৈঠক সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পিকার বেরিকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, দামেস্ক এখন যুক্তরাষ্ট্রের চরম চাপে রয়েছে। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত বরাবর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ করার জন্য এ চাপ দেওয়া হচ্ছে।

সূত্রটি আরও জানায়, এ চাপ মোকাবিলায় দামেস্ককে সাহায্য করতে হিজবুল্লাহ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এ নিয়ে শাইবানি হতাশা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে, বিতর্কিত সীমান্ত এলাকাগুলোতে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ঘাঁটির উপস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন তিনি। এসব এলাকা এখনো সিরিয়ার কার্যকর নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।

ওই সূত্রের তথ্যমতে, শাইবানি স্পিকার বেরিকে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এসব ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ লেবানন সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিলে উত্তেজনা অনেকটাই কমবে। ফলে যারা সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলছে, তাদের মূল যুক্তিটিও ধোপে টিকবে না।

শাইবানি ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্পিকার বেরি প্রাথমিকভাবে দুই পক্ষের মধ্যে একজন পরোক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন।

সূত্রটি শাইবানির বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, ‘সিরিয়া প্রশাসন সুন্নি-শিয়া উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। কারণ, এ অঞ্চল আর রক্তপাত সহ্য করতে পারবে না। আপনারা হারলে আপনাদের সঙ্গে আমরাও হারব। আমরা তা চাই না। আর এটি কোনো কথার কথা নয়।’

শাইবানির এ মন্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। দামেস্ক মনে করে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে কোনো সংঘাতের পরিণতি শুধু লেবানন সীমান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বহুদূর পর্যন্ত ছড়াবে।

সিরিয়ার ইসলামপন্থী নতুন শাসকগোষ্ঠী ও লেবাননের এ সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সিরিয়ার কর্মকর্তারা মনে করছেন, ট্রাম্পের চাপে লেবাননে কোনো সামরিক অভিযান চালানো হলে সিরিয়ার ভেতরে সাম্প্রদায়িক বিভাজন আরও গভীর হবে। এতে সীমান্ত অঞ্চলগুলো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে এবং দামেস্ক এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, যার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে না।

আশ্বাসের পাশাপাশি অনুরোধ

এর আগে ২১ জুন আল মাশহাদ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ বিতর্ক প্রশমনের চেষ্টা করেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আল–শারা। তিনি বলেছিলেন, ট্রাম্পের মন্তব্যগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এমনভাবে বোঝানো হচ্ছে যেন সিরিয়ার সেনাবাহিনী ‘আগামীকাল সকালেই’ লেবাননে প্রবেশ করবে।

শারার ভাষ্যমতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের আলোচনা লেবাননে আগ্রাসনের বিষয়ে ছিল না; বরং সিরিয়া কীভাবে লেবানন–সংকটের একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে অবদান রাখতে পারে, সে বিষয়েই জোর দেওয়া হয়েছিল।

সিরীয় প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো লেবানন রাষ্ট্রকে আবারও সমর্থন জোগানো। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং এমন একটি সমাধান খোঁজা, যা সবাই মেনে নেয়। আমরা লেবানন ও সিরিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক যোগাযোগের পথ খুঁজছি, সামরিক কোনো পথ নয়।’

শারা জানান, হিজবুল্লাহর সঙ্গে দেখা করতে প্রস্তুত দামেস্ক। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় বাশার আল–আসাদকে সমর্থন করে এ গোষ্ঠী সিরীয়দের মনে যে ‘গভীর ক্ষত’ তৈরি করেছিল, তা সত্ত্বেও আলোচনার পথ খোলা রাখছেন তাঁরা।

শাইবানির এ সফর সিরিয়ার সেই আশ্বাসকেই আরও মজবুত করেছে। তবে এর পাশাপাশি একটি অনুরোধও ছিল। দামেস্ক চায়, হিজবুল্লাহ ও লেবানন সরকার সীমান্ত বরাবর এমন কিছু পদক্ষেপ নিক, যা সিরিয়াকে মার্কিন চাপ সামলাতে সাহায্য করবে। দামেস্ক প্রমাণ করতে চায়, সিরিয়ার কোনো সামরিক পদক্ষেপ ছাড়াই বিতর্কিত এলাকাগুলো স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

ফলে সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর লেবানন সফরে হিজবুল্লাহ–ঘনিষ্ঠ বেরিকে যুক্ত করার বিষয়টি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না।

হিজবুল্লাহর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রই শুধু নন বেরি। লেবাননের কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই এ গোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক সরকারগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সক্ষম। তাই সিরিয়া ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সতর্কতার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারেন।

এ সফরের ফলে সিরিয়ার কর্মকর্তা এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে এটি স্পষ্ট যে উভয় পক্ষই একে অপরের থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসছে। তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার স্বার্থে তারা একটি নিয়ন্ত্রিত সংলাপের দিকে এগোচ্ছে।

দামেস্ক জোরপূর্বক এমন কোনো সামরিক ভূমিকায় জড়াতে চায় না, যা তাদের পছন্দ নয়। এ পরিস্থিতি এড়াতে সংলাপই হতে পারে তাদের জন্য সেরা পথ।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহর জন্য এ সংলাপ একটি ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। আঞ্চলিক পরিসরে তাদের বিরুদ্ধে যে ক্রমবর্ধমান অভিযান চলছে, সেখানে সিরিয়ার পূর্ব সীমান্ত যেন তাদের জন্য নতুন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে না ওঠে, তা ঠেকাতে এ যোগাযোগ কাজে লাগতে পারে।

অনুবাদ: মোকাররম হোসেন